আইন অমান্য করে গাড়ি চালকদের রদবদল, হয়রানির অভিযোগ

মহিউদ্দিন মাহি ।।
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

সড়ক পরিবহণ আইন অনুযায়ী হালকা যানবাহনের (কার/জীপ/মাইক্রোবাস) লাইসেন্সধারী চালকদের ভারী যানবাহন (বাস/ট্রাক/কাভার্ডভ্যান) চালাতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ে ভারী যানবাহনের লাইসেন্সধারী চালকদের হালকা যানবাহন চালাতে দিয়ে হালকা যানবাহনের লাইসেন্সধারী ব্যক্তিদেরকে ভারী যানবাহন চালাতে বাধ্য করছে প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিদেরকে নিজেদের পছন্দমতো গাড়ি চালাতে দিতে অন্যদের প্রতি অন্যায় আচরণ করছে তারা। এক্ষেত্রে আইনের বাধ্যবাধকতাও মানছেন না তাঁরা। রোববার হালকা লাইসেন্সধারী এক চালক ভারী গাড়ি চালাতে অপারগতা প্রকাশ করে রেজিস্ট্রার বরাবর চিঠি দেওয়ার পর খোঁজ নিয়ে এসব বিষয় জানা গেছে।
সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ এর দ্বিতীয় অধ্যায়ের (ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান, ইত্যাদি) ৪ (২) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যে শ্রেণি বা ক্যাটাগরির মোটরযান চালনার লাইসেন্স প্রাপ্ত হইয়াছেন, সেই শ্রেণি বা ক্যাটাগরি ব্যতীত অন্য কোনো শ্রেণি বা ক্যাটাগরির মোটরযান চালাইতে পারিবেন না। তবে শর্ত থাকে যে, ভারী ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী কোনো ব্যক্তি হালকা ও মধ্যম শ্রেণি বা ক্যাটাগরির মোটরযান চালাইতে পারিবেন।
হালকা যানবাহনের লাইসেন্সধারী হওয়ার পরও ভারী যানবাহন চালাতে বাধ্য করায় ভারী গাড়ি চালাতে অপরাগতা প্রকাশ করে রেজিস্ট্রার বরাবর চিঠি দেওয়া চালকের নাম আহাম্মদ আলী। ২০১১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত হালকা গাড়ি (কার/জীপ/মাইক্রোবাস) চালক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে আবেদন করেন তিনি। আবেদনের পর ওই পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে এতদিন হালকা গাড়ি চালিয়ে আসছিলেন তিনি। সবশেষ তিনি হালকা যানবাহন (ডিনদের জন্য নির্ধারিত গাড়ি) গাড়ি চালাচ্ছিলেন। চলতি মাসের ২২ তারিখ কোনোরকম অভিযোগ ছাড়াই রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মো. আমিরুল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশের মাধ্যমে তাঁকে কর্মচারীদের বাস (ভারী যানবাহন) চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে তিনি ভারী যানবাহন চালানোর কোনো প্রশিক্ষণ নেননি। এমনকি লাইসেন্স অনুযায়ী তাঁর ভারী গাড়ি চালানোর অনুমতিও নেই।
চিঠিতে আহাম্মদ আলী বলেন, হালকা গাড়ির লাইসেন্সধারী হয়ে নিয়োগের পর থেকে তিনি হালকা যানবাহনই চালিয়ে আসছিলেন তিনি। সম্প্রতি তাঁকে ভারী গাড়ি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। যা সম্পূর্ণ আইন বিরুদ্ধ এবং এতে দুর্ঘটনারও ঝুকিঁ বেশি। ফলে ভারী গাড়ি চালাতে অপরাগত প্রকাশ করে নিয়োগপ্রাপ্ত পদ হালকা যানবাহন চালানোর সুযোগ করে দিতে আবেদন করেন তিনি।
হালকা যানবাহন চালনার লাইসেন্সধারী চালক আহাম্মদ আলী বলেন, এখানে আমি হালকা গাড়ির চালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছি। কিন্তু এখন আমাকে বলা হচ্ছে বাস (ভারী যানবাহন) চালাতে। আমি কোনোদিন বাসের ড্রাইভিং সিটে বসি নাই। আমার লাইসেন্সও হালকা গাড়ির। এখন আমাকে জোরপূর্বক ভারী গাড়ি চালাতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে আমি স্বপন স্যারকে (পরিবহণ উপদেষ্টা) বলেছি। ওনি বলেন, কিসে নিয়োগ পেয়েছি সেটা বিষয় না। আমাকে ভারী গাড়িই চালাতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে পরিবহণ উপদেষ্টা ড. স্বপন চন্দ্র মজুমদারের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেও কোনো মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহনের উপপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘কোনো চালক যদি ৪ (২) ধারা লঙ্ঘন করেন, তাহলে আইন অনুযায়ী তিনি অনধিক ৬ মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। আর যদি কোনো প্রতিষ্ঠান কাউকে বাধ্য করে তাহলে এটি আরও ব্যপক আকারের অপরাধ।’ এক্ষেত্রে দণ্ডিত কে হবেন, ব্যক্তি নাকি প্রতিষ্ঠান- এমন প্রশ্নে এটি আদালতের বিষয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, প্রতিষ্ঠান কখনও এ দায় পারে না। চালককে বাধ্য করলে প্রতিষ্ঠানই দণ্ডিত হবে।
২২ সেপ্টেম্বর ইস্যুকৃত একই অফিস আদেশে আহাম্মদ আলীসহ মোট চারজনকে ভিন্ন গাড়ি চালকের পদে বদলী করা হয়। আহাম্মদ আলী ছাড়া বাকি তিনজনকে হালকা গাড়ি চালাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদিও এরমধ্যে দু’জনই ভারী যানবাহনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং তাঁদের নিয়োগও হয়েছিল ওই পদে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থে তাঁদের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিদেরকে পছন্দমতো গাড়িতে বদলি করছেন। এক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় ঘটলেও তোয়াক্কা করছেন না তাঁরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হালকা যানবাহনের লাইসেন্সপ্রাপ্তদের ভারী গাড়ি চালাতে নির্দেশনা দিলেও ভারী যানবাহনের চালক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত অন্তত আটজন হালকা বা মধ্যম যানবাহন চালক পদে কর্মরত আছেন। এদের মধ্যে আছেন প্রক্টর ও রিকুইজিশন গাড়ি চালকও। আবার রেজিস্ট্রারের গাড়ি চালাতেন হালকা যানবাহনের লাইসেন্সধারী শাহিনুর রহমান। প্রায় পাঁচ মাস শূন্য থাকার পর সম্প্রতি রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পেয়েছেন মো. আমিরুল ইসলাম। এ পদে নিয়োগের পরই রেজিস্ট্রারের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে বাস সহকারী শিপনকে।
আবার বিগত পাঁচজন উপাচার্যের গাড়ি চালক ছিলেন নজরুল ইসলাম। তবে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি ৭ম উপাচার্য হিসেবে কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ে যোগদানের দিনই উপাচার্যের গাড়ি চালকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। এ পদে পূর্বনির্ধারিত চালক থাকলেও মো. গিয়াস উদ্দিনকে ছ’মাসের জন্য অস্থায়ীভাবে উপাচার্যের গাড়ি চালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে নিয়োগের ছ’মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও দিব্বি উপাচার্যের গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। যদিও বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে এ ধরনের নিয়োগকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
পূর্বনির্ধারিত চালক থাকার পরই যোগদানের দিনই কোনো অভিযোগ ব্যতীত তাঁকে সরিয়ে নিজের গাড়ির চালক হিসেবে উপাচার্যের নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়ায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অধ্যাপক বলেন, উপাচার্য হিসেবে যোগদানের সাথে সাথেই কোনো বাচবিচার না করে বিশ^বিদ্যালয়ের চালক বাদ দিয়ে তিনি (উপাচার্য) নিজের পছন্দমতো ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছেন। বিশ^বিদ্যালয়ে কি উপাচার্যের গাড়ি চালানোর মতো কেই নেই? উপাচার্য আসার সাথে সাথেই তিনি চালক নিয়ে এসে আত্মীকরণের উদাহরণ তৈরি করেছেন।
গাড়ি চালকদের এমন রদবদল নিয়ে কথা হয় অন্তত সাতজন গাড়ি চালকের সাথে। তাঁরা বলেন, আগের প্রশাসনের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তির গাড়ি যারা চালিয়েছেন, তাঁদেরকে হয়রানি করতেই এমন রদবদল আনা হয়েছে। আগের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার ও প্রক্টরসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পদে নিয়োজিত ব্যক্তিদের গাড়ি চালককে বেচে বেচে হয়রানি করা হচ্ছে। যারাই আগের প্রশাসনের কাছে ছিলেন, তাঁদেরকে বিভিন্ন জায়গায় বদলি করে নিজেদের পছন্দনীয় চালকদের নিয়োগ দিচ্ছে বর্তমান প্রশাসন।
হালকা গাড়ির লাইসেন্সধারীদের দিয়ে ভারী গাড়ি চালানো হলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে আশঙ্কা করে তাঁরা বলেন, এখানে অনেকে হালকা গাড়ির চালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে। তাঁরা মাইক্রো, কার, জিপই চালিয়ে আসছিল এতদিন। এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস চালাতে হচ্ছে। আমরা ছোট চাকুরি করি, প্রশাসন যেটি করে সেটি মেনে নিতে হয়।
রদবদলের বিষয়ে একজন চালক বলেন, হালকা গাড়ি চালাতে কষ্ট কম হয়। তাই, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সুপারিশ নিয়ে অনেক ভারি গাড়ির চালকই হালকা গাড়ি চালান।
এসব বিষয়ে কথা বলতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈনের মুঠোফোনে গত রবি ও সোমবার দু’দিন কল দিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তাঁর কার্যালয়ে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ন কবির বলেন, ’হালকা গাড়ির চালককে দিয়ে ভারী গাড়ি চালানো কোনোভাবেই উচিৎ নয়। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে এর দায়ভার কে নেবে? আইনের বাইরে গিয়ে আমাদের কিছু করার সুযোগ নেই। যে চালকের যে গাড়ি চালানোর লাইসেন্স থাকবে সে সেই গাড়ি চালাবে।’