একটি কাগুজে জন্মদিন, পুত্রের কাছে পিতার হার এবং সামাজিক বাস্তবতা

সময়ের কড়চা
শাহাজাদা এমরান।।
প্রকাশ: ৪ সপ্তাহ আগে

৫ মে আমার জন্মদিন ছিল। সত্যি কথা বললে বলতে হবে এটি আমার কাগুজে জন্মদিন। আরেকটু দৃঢ় ভাবে বললে বলতে হবে, নারায়নগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার বৈদ্যের বাজার ইউপির ৬৪নং খংসারদী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নুরুল ইসলাম স্যারের ১৯৮৭ সালের ৫ জানুয়ারি মাসের দেওয়া জন্মদিন এটি। কারণ, আমার এখনো কানে বাজছে, আমরা যারা পঞ্চম শ্রেণি পাস করেছি, তাদের ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করার জন্য স্যার আমাদের ১৮জন ছাত্রছাত্রীকে বৈদ্যের বাজার এন এ এম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে নিয়ে যান। আমাদের প্রাইমারি স্কুল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের হাই স্কুলে হেঁটে যেতে হতো। স্যার নানান রকম আদেশ উপদেশ দিতে দিতে এবং আমরা যেন স্কুলে কোন উশৃঙ্খল কাজ না করি সেই জন্য এক জুজুর ভয় দেখিয়ে স্কুল ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছিলেন।

সেদিনই প্রথম হাই স্কুলের বারান্দায় যাই। সকল বন্ধুরা ছিলাম বেশ রোমাঞ্ছিত। হাই স্কুলের স্যারেরা কেমন, কিভাবে পড়াবে, পড়া না পারলে হাই স্কুলের স্যারদের জালি বেতের প্রহার কেমন, স্কুলের সিনিয়ররা আমাদের সাথে ব্যবহার কেমন করবে ইত্যাদি নিয়ে আলাপ করছি। এমন সময় স্যার আমাদের ১৮জনের জন্য ১৮টি ফরম এনে একটি ক্লাস রুমে ঢোকালেন। টেবিল, চেয়ার নিয়ে বসে বললেন, আমি তোমাদের ফরম পূরণ করছি। যার নাম বলব সে আগে আসবা। আমি পঞ্চম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েছি। তাই স্যার প্রথমেই বললেন, ফার্ষ্টবয় এমরান এসো। নাম ঠিকানা সবই বললাম। এক পর্যায়ে স্যার বলল, কোন সালের কত তারিখে জন্ম, বল। নিচু স্বরে বললাম, স্যার এটাতো জানি না। আমি জানি না বলার সাথে সাথে আমার অন্য বন্ধুরাও বলে উঠল, স্যার, আমাদের জন্ম তারিখও জানা নেই। তখন স্যার হাসতে হাসতে বললেন, তোদের ১৮ জনের জন্মের যেই সাল আর তারিখ আজ আমি দিমুু , মনে রাখবি এটা কিন্তু সার্টিফিকেটে থাকবে এবং আজীবন আমাকে মনে রাখবি। এটা বলেই স্যার আঙ্গুলের কড়া ঘুনে বললেন, এমরান, তোমাকে দিলাম জন্ম সাল ১৯৭৭ আর জন্ম তারিখ ৫ মে। এভাবেই স্যার অপর বন্ধুদেরও জন্মের সাল এবং তারিখ লিখে দিলেন।

পরে বাড়ি এসে মাকে বললাম, মা, আমার জন্ম কত তারিখে। মা আমায় জানাল, তোদের তিন ভাই ও দুই বোনের জন্ম তারিখ তোর আব্বা লিখে রাখছিল। কিন্তু যেই কাগজে লিখেছিল সেই কাগজটা হারিয়ে ফেলেছি। জন্ম সাল বলতে গিয়ে মা জানাল, তোরা ভাই বোনেরা সবার বয়সের ব্যবধানই প্রায় তিন বছর। গন্ডগোলের বছর (১৯৭১ সাল) টিপুর (আমার মেজ ভাই) জন্ম । এর তিন বছর পর তুই। তার মানে ১৯৭৪ এ। সেই হিসেবে আমার বর্তমানে প্রচলিত জন্ম তারিখ এবং সাল দুটোই নুরুল ইসলাম স্যারের সৌজন্যে পাওয়া।

আমার জন্ম তারিখটি শিক্ষাসনদ এবং এনআইডি কর্তৃক জাতীয় স্বীকৃত হয়ে ফেসবুক এখন সামাজিকীকরণ করে ফেলেছে। আমি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা সন্তান। মুন্সিগঞ্জ জেলার নদী বেষ্টিত গজারিয়া উপজেলার একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম বলতে যা বুঝায় সেই টেঙ্গারচর গ্রামে আমার জন্ম। যদিও বর্তমানে আধুনিক সকল সুযোগ সুবিধাই বিদ্যমান রয়েছে গ্রামটিতে। জন্মের পর ধীরে ধীরে যখন বেড়ে উঠছি তখন থেকে দেখে আসছি শুধু আমাদের পরিবার না, অন্য পরিবারেও জন্মদিন কাউকে পালন করতে দেখিনি বা শুনিওনি। তবে আমাদের এলাকায় একটা জমজমাট কালচার ছিল। ছেলেরা ছেলেরা দোস্ত আর মেয়েরা মেয়েরা সই এর বন্ধনে আবদ্ধ হতো। এই দোস্ত এবং সইয়ের পরিবার গুলো একে অপরকে আমন্ত্রণ জানাতো। এই আত্মীয়টি ছিল খুবই গাঢ়। এখানে রক্ত না থাকলেও আবেগ কাজ করতো।

বলছিলাম, জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকী পালন করতে আমাাদের পরিবার গুলোকে কখনো দেখিনি। তাই পারিবারিক উত্তরাধীকার সূত্রে প্রাপ্ত হই বা নিজস্ব ইথিকসের দৃঢ়তার জন্যই হোক এই দুটি দিবস কখনো আমার কাছে বছরের বাকি ৩৬৩ দিনের চেয়ে মোটেই আলাদা মনে হয় না। বরং কেউ করলে আমার কাছে কিছুটা বাড়াবাড়িই মনে হয়।
২০০২ সালে যখন খুঁজে পেলাম জীবন বন্ধুকে। পরখ করে দেখলাম সেও আমার মতই। কিন্তু ২০০৫ সালে আবির আর ২০০৯ সালে দিবার জন্মের পর মাত্র ২/৩ বার আবেগের বশে তাদের নিয়ে কেক কেটেছিলাম। কিন্তু আবির-দিবা কিছুটা বড় হওয়ার পর তাদের অনাগ্রহের কারণেই তাদেরও আর জন্মদিন পালন করা হয় না। আমি জীবনে প্রথম জন্মদিনের কেক কাটি ২০১৯ সালে , যখন আমি এপেক্স ক্লাব অব কুমিল্ল¬ার সভাপতি ছিলাম। এপেক্সিয়ান বন্ধুরা সবাই মিলে কেক, বেলুন নিয়ে আমার অফিসে এসে কেক কেটে ছিল।
কাগুজে হোক আর আসল হোক সামাজিক যোগাযোগের কল্যাণে সবাই জেনে যায় ৫ মে আমার জন্মদিন। তাই নিজ গণমাধ্যমের সহকর্মীদের চাপ সত্ত্বেও বিষয়টি কখনো আলোতে আনতে দেইনি। ফেসবুক পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এবার আমাদের কুমিল্লা পরিবার এবং আমার ছেলে শাহজালাল সরকার আবির আমার জন্ম দিনটাকে এমন একটা আবেগের জায়গায় নিয়ে গিয়েছে যা দেখে নিজেই আপ্লুত।
আমাদের কুমিল্ল¬া পরিবারের সদস্য সৈয়দ আহমেদ লাভলু, মো. হাসান, তারিকুল ইসলাম তরুণ পরিবারের অন্যান্য সাংবাদিক বন্ধুদেরকে (যারা আসতে পেরেছে) সংগঠিত করে কেক কাটা, ফুল দেওয়া, মিষ্টি খাওয়া, সবার অনুভুতি গ্রহণ, সর্বশেষ নগর উদ্যান সংলগ্ন ‘দিঘির চাপ এ আড়ম্বরপূর্ণ রাতের ভোজনের ব্যবস্থা করে আমাকে একদিকে যেমন চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে অপরদিকে, এ আয়োজনে বেশ সম্মানিত করে আমাকে গৌরবের জায়গায় অভিসিক্ত করেছে।

পরে রাত সাড়ে বারটায় লাভলু ভাই, হাসান, পুতুল ও আবিরসহ আমাকে নিয়ে বের হয় ঢাকা চট্রগ্রাম মহাসড়কে। গাড়িতে বেজে উঠে জন্মদিনের গান। ঠোঁটও মিলায় তারা। রাত পৌঁনে ২টায় চান্দিনা গিয়ে চা খাওয়ায়ে আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষ করে তারা।

সন্তানের কাছে বাবার পরাজয় : সন্তানের কাছে বাবার পরাজয় যে কতটা গৌরবের ও রাজসিক গর্বের হতে পারে এটা তারাই বুঝবে যারা এই পর্যায়ে পড়েছে। আমি সব সময় আবিরকে জড়িয়ে ধরতে চাই। আদর করতে চাই সেই ছোট বেলার মতো। কিন্তু আবির তা পছন্দ করে না। বলে, আব্বু এটা আমার ভালো লাগে না। তখন আমি জীবন বন্ধুকে বলি, আবির মনে হয় আমাকে বেশি ভালোবাসে না। কিন্তু জাহেরা সব সময় বলতো, আবির তোমাকে আমার থেকেও বেশি ভালোবাসে। চলতি এসএসসি পরীক্ষার্থী হিসেবে আমার আবির প্রায় অনেক টাকা বকশিস পেয়েছে স্বজনদের কাছ থেকে। যার অর্ধেকটা সে ঈদের সময় আমার, তার মা ও তার ছোট বোনের জন্য খরচ করেছে। বাকিটা রেখে দিয়েছিল।
৫ মে বুধবার সকালেই একটি নিউজ করার জন্য সাংবাদিক তরুণকে নিয়ে দেবিদ্বারের ধামতীতে যাই। ধামতী যাওয়ার পরই আবির ফোন করে জানায়, আব্বু অফিসের কাজ ছাড়া আজ তোমার প্রোগ্রাম কি? সব জেনে অনুরোধের আর্তি বেজে উঠে আবিরের কোমল কন্ঠে। আজ রাতে তুমি আমাদের একটু সময় দেবে বাসার বাহিরে। কারণ জানতে চাইলে বলতে নারাজ। রাত ১১টায় সময় দিলাম। নগর উদ্যান সংলগ্ন দিঘীর চাপ এ রাত ১০টায় আমাদের কুমিল্ল¬া পরিবারের আয়োজন চলছিল। এমন সময় আবির তার ছোট খালুকে নিয়ে হাজির। এসেই বলল, আব্বু দ্রুত কর প্লিজ। রাত ১১টায় রাজগঞ্জ হিলটন টাওয়ারের রেইন ড্রপে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে তো আমার চোখ চড়ক গাছ। আবিরের আয়োজনের এত বড় বিস্ময় আমার জন্য অপেক্ষা করবে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। গিয়ে দেখি, সে শুধু আমাদের পরিবার না, তার ছোট খালার পরিবারকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আমার সাথে ছিল তিন সহকর্মীও। তার পুরো আয়োজনের বর্ণনা দিয়ে লেখার কলেবড় বৃদ্ধি না করে শুধু এক কথায় বলব, অসাধারণ। মনের অজান্তে চোখের পানি ঝরে পড়তে চাইলেও রোধ করার কিছুটা বৃথা চেষ্টা করলাম। কারণ, একজন বাবার প্রতি সদ্য এসএসসি পরীক্ষা দিতে থাকা এক সন্তানের এর চেয়ে বড় ভালোবাসার বহি:প্রকাশ আর কি হতে পারে।

অনুধাবন করলাম, বকশিসের অবশিষ্ট টাকা গুলোও আজ তার শেষ হয়ে যাবে। তারপরেও বললাম, আব্বু, সহযোগিতা করবো। আবির শুধু মুচকি হাসলো। তার সোনা ঝরা হাসিতে ফুটে উঠল বিজয়ের হাসি। ভালোবাসা দিয়ে বাবাকে পরাজিত করার গৌরবময় হাসি।

আলহামদুলিল¬াহ বলে আমিও মনে মনে বললাম, বাবা, এভাবেই তোমার কাছে প্রতিনিয়ত পরাজিত হয়ে গৌরাম্বিত হতে চাই আমি। মহান আল্ল¬াহ যেন সে সুযোগ সব সময় আমাকে দেন।

আসলে জন্ম কিংবা বিবাহবার্ষিকী আমাদের দেশে আমরা যেভাবে ঘটা করে পালন করি, আমাদের দেশের সমাজ বাস্তবতায় এমনটা না হলেই আমার কাছে ঢের ভালো। আমরা কি পারি না, নিজেদের আনন্দটাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে এই সকল অনুষ্ঠানের খরচ গুলো কমভাগ্যবান মানুষের মাঝে ব্যয় করতে।

এটাও বাস্তবতা যে, বেঁচে থাকতে হলে অন্যকে যেমন আনন্দ দেওয়া দরকার, সহযোগিতা করা দরকার, সহমর্মিতা প্রকাশ করা দরকার, ঠিক তেমনি নিজেদের জন্যও একই ব্যবস্থা থাকা দরকার। এই দুই দরকারকে সমন্বিত করে একটি মধ্যপন্থা কি আমরা বের করতে পারি না ? যেটাতে আমাদেরও সামাজিকিকরণ রক্ষা হবে আবার এই সামাজিকিকরণটাকে কিছুটা কাটছাট করে অবশিষ্টটাকে দিয়ে কমভাগ্যবানদের কল্যাণে ব্যয় করে তাদের মুখে হাসি ফুটানো যায় কিনা ভেবে দেখতে হবে আমাদের।

লেখক : সাংবাদিক,সংগঠক ও মুুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক। ০১৭১১-৩৮৮৩০৮।