ওপারে ভালো থেকো জালাল- শাহাজাদা এমরান

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৫ দিন আগে

মঙ্গলবার (২২ নভেম্বর)। এক স্বজনের কাজে চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী সাব-রেজিস্টার অফিসে গিয়ে বসেই মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে স্ক্রল করতেই চোখে পড়ে সহকর্মী বাংলা ভিশনের সাংবাদিক সাইয়িদ মাহমুদ পারভেজ ভাইয়ের একটি মন্তব্য। সেখানে লেখা এনটিভির সাংবাদিক আমাদের জালাল উদ্দিন অসুস্থ হয়ে কুমিল্লা নগরীর মুন হাসপাতালে ভর্তি। এরপর খবর নিয়ে জানলাম আশঙ্কাজনক অবস্থায় জালালকে ঢাকা শমরিতা হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। সহকর্মীদের কাছে বিস্তারিত জেনে নিয়ে দোয়া চেয়ে আমিও একটা মন্তব্য দিয়ে বন্ধু জালালের জন্য সবার কাছে দোয়া চাইলাম।

আজ (২৩ নভেম্বর) বুধবার সকালে বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি কুমিল্লার নির্বাহী সদস্য তারিকুল ইসলাম তরুনের সাথে হোটেল সালাউদ্দিনের নাস্তা খেয়ে সমিতির সভাপতি রীমা আপার সঙ্গে কথা বলে মফিজ উদ্দিন সরকার মডেল মাদ্রাসা ও এতিম খানায় বাদ আসর দোয়া মাহফিলের আয়োজন করি। তখনো কল্পনাও করিনি আমাদের প্রিয় সহকর্মী জালাল আর আমাদের মাঝে ফিরে আসবে না। আমার মনে জোর ছিল জালাল সুস্থ হয়ে ফিরবেই। কিন্তু আসলে হায়াত মউত তো একমাত্র আল্লাহর হাতে। তিনি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা থেকে এক চুল পরিমাণ নড়ার কি সাধ্য আছে আমাদের!

মাগরিব নামাজ পড়ে সবেমাত্র অফিসে আমার চেয়ারে বসবো; এমন সময় রীমা আপার ফোন। শাহাজাদা জালালের খবর কি সত্যি? কি বলেন আপা। জালাল নেই। তুমি ফেসবুক দেখ বলেই লাইনটা কেটে দিলেন রীমা আপা। ফেসবুকে যেয়ে দেখি আরেক সহকর্মী বৈশাখী টিভির সাংবাদিক আনোয়ার হোসেনের ওয়ালে ভাসছে আমাদের জালাল আর নেই। মুহুর্তেই সমস্ত শরীর হীম হয়ে গেল। কথা বলতে পারছি না। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। জালাল নেই এ কথা ভাবতেই পারছি না।

এনটিভির সাংবাদিক জালাল। সে এনটিভির কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি থেকে স্টাফ রিপোর্টার পর্যন্ত হয়েছে। আমি যতটুকু জানি সম্ভবত পত্রিকায় তার খুব একটা কাজ করা হয়নি। টিভিতেই শুরু টিভিতে কর্মরত থাকা অবস্থাতেই না ফেরার দেশে চলে গেল। ২০০৮ সালে আমি যখন বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হই তখন জালাল যুগ্ম সম্পাদক হন। মৃত্যু পর্যন্ত সে সমিতির এ পদেই ছিল। এরমধ্যে আরো কয়েকটি সাংবাদিক সংগঠনে সে গিয়েছে কিংবা তাকে নেয়া হয়েছে কিন্তু সাংবাদিক সমিতি কখনো সে ছাড়েনি। আমাকে বলত, দোস্ত, বুঝতো, সবার সাথে আছি। কিন্তু সাংবাদিক সমিতি কিন্তু আমার আত্মার। দেখিও আমাকে সমিতি থেকে বাদ দিও না।
ব্যক্তিগত জীবনে আমি যতটুকু জানি সে একটা কলেজে খন্ডকালীন শিক্ষক ছিল, এবং হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারিও করত। সবার সাথে সমান তাল মিলিয়ে সে চলত। কুমিল্লার অধিকাংশ টেলিভিশন সাংবাদিক গ্রুপভিত্তিক কাজ করে পেশার স্বার্থেই। কিন্তু জালালকে দেখতাম একদম একা। শুধু একা। যে কোন নির্বাচনের প্রোগ্রামে গেলেও সব সাংবাদিকই গ্রুপ ভিত্তিক যায় কিন্তু এক্ষেত্রেও জালাল ছিল ব্যতিক্রম। এখানেও সে একা যেত সাথে তার খুবই ঘনিষ্ট কিন্তু সক্রিয় সাংবাদিক না এমনদের নিয়ে যেত। এ নিয়ে তাকে বহুবার আমি প্রশ্ন করেছি। সে আমাকে জানাত, দোস্ত, আমি নিজেই স্বয়ং সম্পন্ন। নিউজ লেখা, ভিডিও থেকে শুরু করে এডিটিং সবকিছুই আমি পারি। সো আমি একাই চলি।

জালাল নিউজ নিয়ে খুবই কম সময়ে আমাকে ফোন করত। যদি হোমিওপ্যাথিক বা গ্রাম্য চিকিৎসকদের সংগঠনের নিউজ হতো তাহলে ফোন করে বলত, দোস্ত নিউজটা ধরে দিও। তারা আমার কাছে এসেছিল। তার সাথে আমার কবে কখন কিভাবে পরিচয় হয়েছিল এই মুহুর্তে তা বলতে পারব না। তবে এতটুকু আজ হলফ করে বলতে পারি, সাংবাদিক জালাল উদ্দিনের সাথে দীর্ঘ পথ চলায় কখনো কোন বিষয় নিয়ে আমার নূন্যতম কথা কাটাকাটি হয়নি মতবিরোধতো প্রশ্নই আসে না। দেখা সাক্ষাৎ, কথাবার্তা খুব কম হতো। কিন্তু সম্পর্ক ছিল খুবই আন্তরিক। ইংরেজিতে খুবই পারদর্শী ছিল জালাল। তাই প্রায়ই ইংরেজি বলার চেষ্টা করত। তাই আমি দুষ্টামি করে বলতাম, দোস্ত, ইংরেজি কও।

একজন আপাদমস্তক ভদ্রলোক ছিল এনটিভির স্টাফ রিপোর্টার জালাল উদ্দিন। তারমত একজন লিখতে পারা উচ্চ শিক্ষিত ভালো সাংবাদিককে হারিয়ে সত্যিই কুমিল্লার সাংবাদিক অঙ্গণে একটি শূন্যতা সৃষ্টি হলো। কুমিল্লার বাহিরে থাকায় মুন হাসপাতালে থাকা অবস্থায় জালালকে শেষবারের মত দেখতেও পারলাম না। এই দু:খবোধ আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে অনেক দিন। ওপাড়ে ভালো থেকো প্রিয় বন্ধু, প্রিয় সহকর্মী সাংবাদিক জালাল। মহান আল্লাহ যেন তোমার স্ত্রীসহ শিশু সন্তানদেরকে ভালো রাখেন সেই দোয়া করি এবং ওপাড়ে যেন তুমি ভালো থাক এই প্রার্থনাও রইলো আল্লাহর দরবারে।