কবি ফখরুল হুদা হেলাল : কত স্মৃতি কত কথা – শাহাজাদা এমরান

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

না ফেরার দেশে চলে গেলেন কুমিল্লার নগর কবি খ্যাত ফখরুল হুদা হেলাল। এই নগর কুমিল্লায় তিনি একজন বিশিষ্ট সংগঠক ও নাট্যাভিনেতা হিসেবেও পরিচিত। আপাদমস্তক স্বজ্জ্বন এই প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ কমিল্লার সাংস্কৃতিক অঙ্গন।

শুক্রবার (২২ এপ্রিল) সকাল সাতটা দশ মিনিট হবে। হঠাৎ সাংবাদিক ওমর ফারুকী তাপস ভাইয়ের ফোন বেজে উঠল। গেল রাতে শরীরটা খুব খারাপ গিয়েছিল, ঘুমও তেমন হয়নি। তাই রোজার এই সময়ে ফোনটা ধরতে ইচেছ করছিল না। কিন্তু জীবন বন্ধু যখন বলল, দেখ না তাপস ভাই কেন ফোন দিয়েছে। কয়েকটা রিং হওয়ার পরেই রিসিভ করলাম। শাহাজাদা , হেলাল ভাই একটু আগে সিডি প্যাথ হাসপাতালে মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহে রাজেউন বলেই ফোনটা কেটে দিলাম। হঠাৎ গড়িয়ে পড়া পানি গুলোর কারণে চোখটা ঝাপসা হয়ে এলেও স্মৃতি গুলো মুহূর্তেই চোখে ভেসে বেড়াতে লাগল। কত শত স্মৃতি, কত ব্যথা আর কত কথা যে হেলাল ভাইয়ের সাথে আমার তার কোন হিসেব নেই।

লেখক : শাহাজাদা এমরান

অনেকেই হয়তো জানেন না কবি ফখরুল হুদা হেলাল ভাই আমার ভগ্নিপতি ছিলেন। আমার বোন ২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারি হেলাল ভাইকে রেখে না ফেরার দেশে চলে যান। আজ ৮ বছর ৪ মাস পর সহধর্মিনীর পথ যাত্রী হলেন হেলাল ভাই। হেলাল ভাই শুধু যে আমার ভগ্নিপতি ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন আমার কুমিল্লার জীবনের প্রথম ব্যক্তি প্রথমেই যার পরিচয় দিয়েই সামনে এগিয়ে গিয়েছি আমি। আজ এই নগর কুমিল্লায় আমার যে স্বাতন্ত্র্য একটি অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই তার কিছুটা হলেও অংশীদার ফখরুল হুদা হেলাল ভাই।

মনে পড়ছে, ১৯৯৪ সালের শুরুর দিকের স্মৃতি গুলো। তখন আমি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের রাজার বাজার ফুফু আম্মার বাসায় থাকি। ঐ বছরের জানুয়ারির শুরু থেকেই পারভীন আপুর বিয়ের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব আসত। আমার দুইজন ফুফাত ভাইয়ের মধ্যে একজন থাকতেন ঢাকা আর অপরজন কুয়েত। ছেলে হিসেবে বাসায় আমিই। তাই কোন কাজ আসলেই প্রাথমিক খবর নেয়ার কাজটা পড়ে আমার উপর। বেক্সিমকোর কাজে মিয়াবাজার হেলাল ভাই প্রায়ই যেতেন। পারভীন আপার রোকেয়া নামের এক বান্ধবীর জামাতার ফার্মেসি ছিল মিয়াবাজার মসজিদ সংলগ্ন মার্কেটে। ভদ্র লোকের নামটা এই মুহূর্তে মনে নেই। খুব সুন্দর এবং হ্যান্ডসাম ছিলেন দেখতে। নজর কাড়ত এক নজর দেখলেই। আর পারভীন আপার অফিস প্রথমে প্রশিকা ও পরে পেইজ ছিল এই মার্কেটেরই দোতালায়। বান্ধবীর জামাতার মাধ্যমে পারভীন আপু হেলাল ভাইয়ের বিয়ের প্রস্তাব পায়। আপু আমাকে বলল, আগামী মঙ্গলবার বেলা ১১টায় হেলাল সাহেব নামের ঐ ভদ্র লোক এই ফার্মেসিতে আসবে। তুমি ঔষধ কিনার কথা বলে সেখানে গিয়ে তাকে ভালো করে দেখবে। তোমার পছন্দ হলে আমাকে জানাবা। দুর্ভাগ্য আমার সেই দিন আর হেলাল ভাই মিয়াবাজার আসেনি আর আমারও দেখা হয়নি। এর পরের সপ্তাহে শিমুন দা ঢাকা থেকে বাসায় আসে। এবার হেলাল ভাইকে জানানো হলো মেয়ের দুই ভাই আপনাকে আনুষ্ঠানিক দেখবে। পরদিন মিয়া বাজারের মুজিব হোটেলে আমি আর শিমুন দা উপস্থিত হই। ঘটকসহ হেলাল ভাই কিছুক্ষণ পরেই এসে হাজির। এসেই আমাদের দুই ভাইয়ের সাথে হ্যান্ডশেক করে গরম পরোটা আর গরুর মাংশের অর্ডার দিল। আমরা সবাই এক সাথে নাস্তা করলাম। ঐ দিনই প্রথম হেলাল ভাইয়ের সাথে পরিচয় হলো। এরপর একই বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি আপুর সাথে হেলাল ভাইয়ের আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ে হয়।

আগস্ট মাসের দিকে আমি কুমিল্লা শহরের শুভপুর লজিং চলে আসি।

কুমিল্লা এসে হেলাল ভাইকে আমি নতুন ভাবে আবিস্কার করি। বিশেষ করে ১৯৯৪ সালের ২১ অক্টোবর যখন আমরা বন্ধুরা মিলে কুমিল্লা বিতর্ক পরিষদ করি তখন। যেখানেই যাই যদি বলি ফখরুল হুদা হেলাল ভাই আমার দুলাভাই। তখন হাসি দিয়ে বলত অহ্ তাই নাকি। হেলাল ভাই বিয়ে করেছে নাকি। খুব ভালো করেছে। লক্ষ্য করতাম একটু পরিস্কার ক্লিন ইমেজ ছিল তখন হেলাল ভাইয়ের। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর বেক্সিমকোতে চাকরিতে জয়েন করার পর কুমিল্লার সামাজিক সাংস্কৃতিক জগতে তার দীর্ঘ একটা বিরতি যে ছিল এটা আমি ভালোভাবে লক্ষ্য করেছি। অনেকে বলত, হেলালকে তো দীর্ঘ দিন ধরে দেখি না , কেউ বলত শুনছি হেলাল ভাই বিয়ে করেছে ইত্যাদি। কিন্তু সবাই হেলাল ভাইয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। অসুস্থ থেকে সুস্থ জীবনে ফিরে এসে সংসার জীবনটাকে খুবই ইতিবাচক ভাবে দেখছে। হেলাল ভাইয়ের যে একটা বর্ণাঢ্য অতীত ছিল তা আমি মানুষের কাছে শুনে শুনে ঠাকুরপাড়া রজনীগন্ধ্যা বাসায় গিয়ে হেলাল ভাইকে বলতাম। তিনি মিট মিট করে হাঁসতেন। আবার আমি যার কথা বলতাম পরক্ষণেই তার সাথে দেখা করে এসে বলে আসতেন শাহাজাদা কিন্তু আমার শ্যালক।

কুমিল্লা শহরে তৎকালীন সময়ের আমাদের প্রজন্মের কাছে হেলাল ভাই ছিলেন বিশেষ কিছু। তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি ছিলেন একেবারেই অপরিচিত। অথচ তরুণরা সবাই তার নাম জানত ও শ্রদ্ধা করত। আমার অনেক বন্ধু বা সহকর্মীরা বলত,হেলাল ভাইয়ের কথা অনেক শুনেছি একদিন পরিচয় করিয়ে দিও। তেমনি একদিন সাংবাদিক আবুল কাশেম হৃদয় কান্দিরপাড় আমাকে পেয়ে বলল, শাহাজাদা, হেলাল ভাইয়ের নাম তো অনেক শুনি। এই শহরের একজন বিশিষ্ট কবি। একদিন আমাকে পরিচয় করিয়ে দিও। তখন হেলাল ভাই থাকতেন পুরাতন চৌধুরী পাড়ার অরুনিমা বাসায়। হেলাল ভাইয়ের সাথে কথা বলে পরদিনই হৃদয়কে তার বাসায় নিয়ে পরিচয় করে দেই। এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে ।

অস্বীকার করব না, আমার কোন প্রয়োজন ছিল না এমন সব জায়গায়ও আমি অপ্রাসঙ্গিক ভাবে হলেও হেলাল ভাইয়ের নাম বলেছি,পরিচয় দিয়েছি। এতে করে দুইটি লাভ হতো বলে আমার মনে হতো। এক, হেলাল ভাইয়ের দীর্ঘ গ্যাপটা কিছুটা হলেও পূরণ হতো আর আমি যে হেলাল ভাইয়ের আত্মীয় এটাও বুঝিয়ে দিতাম।
এরপর অনেক ইতিহাস। পদ্মা মেঘনা যমুনা দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে। আমাদের শ্যালক – দুলাভাইয়ের সম্পর্কের মধ্যেও অনেক ছন্দপতন ঘটেছে। আবার একত্রিত হয়েছি। জাহেরাকে জীবন বন্ধু করার বিষয়ে হেলাল ভাইয়েরও অনেক অবদান আছে। ১৯৯৯ সালে সিডিপ্যাথে যখন আমার অপারেশন হয় তখন হেলাল ভাই নানা ভাবে যে ভূমিকা রেখেছে তা ভুলার নয়।

১৯৯৪ সাল থেকে ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল ( হেলাল ভাইয়ের মৃত্যুর সময় পর্যন্ত) পর্যন্ত আমার দেখা এই সময়টি যদি আমি বিবেচনায় নেই তাহলে বলব, কুমিল্লার এ যাবত কালের ইতিহাসে অন্যতম সেরা কবি ফখরুল হুদা হেলাল। যিনি কবিতাকে হৃদয় দিয়ে ধারণ করতেন, সন্তানের মত লালন করতেন। কবিতাই হয়ে উঠেছে তার জীবনের একমাত্র অনুসঙ্গ হিসেবে। একজন প্রখ্যাত সংগঠক ও প্রতিষ্ঠিত নাট্য শিল্পী হওয়ার পরেও কবি পরিচয়টাই তাকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়।

প্রত্যেকটি মানুষই দোষে গুণে পরিপূর্ণ। কবি হেলাল ভাইও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু হেলাল ভাইয়ের একটি বৈশিষ্ট্য কুমিল্লার আর কারো মধ্যে এখনো দেখিনি। এই বৈশিষ্ট্যটি হলো তিনি মানুষকে ভালো বাসতেন অকৃপণ ভাবে। এমপি থেকে শুরু করে রিক্সাওয়ালা পর্যন্ত যার সাথেই তিনি মিশেছেন তাকেই বড় আপন করে নিয়েছেন। তার যে কোন প্রয়োজনে কিছু দিয়ে না হোক সশরীরে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। নিয়মিত ভাবে নিজের পয়সা খরচ করে ফোন করে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করেছেন। তিনি কয়েক দিন পর পরই ফোন করে বলতেন হ্যালো, শাহাজাদা কেমন আছ, জাহেরা কেমন আছে,বাচ্চারা কেমন আছে- এই তিনটি কথা বলেই ফোনটি কেটে দিতেন। এভাবে শুধু আমাকে না আমি বিশ^াস করি হেলাল ভাই এভাবে খোঁজ খবর নিতেন এমন তালিকা দেড় শতাধিক হবে। শুক্রবার তার নামাজে জানাযার সময় স্বয়ং কুমিল্লা সদর আসনের এমপি আ ক ম বাহার উদ্দিন বাহার ভাইও একই কথা বলেছেন। এই একটি বৈশিষ্ট্য থাকা মানুষ এই নগর কুমিল্লায় বর্তমানে খুবই বিরল। হঠাৎ হঠাৎ করে এমন ভাবে খোঁজ নেওয়া সংগঠক কুমিল্লায় আর কবে পাব একমাত্র ভবিষ্যতই তা বলতে পারবে।

অনেক আবেগী মানুষ ছিলেন হেলাল ভাই। আবার অল্পতে রেগেও যেতেন। তবে তার রাগটা বেশীক্ষণ স্থায়ী হতো না। মনের দিক থেকে অনেক সংবেদনশীল মানুষ ছিলেন। যত দিন আপু বেঁচে ছিলেন, সংসার ছিল ততদিন মানুষকে প্রাণ ভরে খাওয়াতে পছন্দ করতেন। পারভীন আপু বেঁচে থাকতে হেলাল ভাইয়ের বাসায় যাননি তার পরিচিত এমন মানুষ খুব কমই ছিল। তিনি রাস্তা থেকে ধরে বাসায় নিয়ে যেতেন। বাসায় কিছু আছে কিনা তা চিন্তা করতেন না। বলতেন, পারভীন যা আছে তাই দাও।

হেলাল ভাইয়ের একটি সুখের সংসার ছিল। ছিল চমৎকার একটি বাসা। ভাড়া বাসা হলেও বাসাটি মনের মত করে গুছিয়ে রাখতেন আপু। আর সেই নান্দনিক বাসার রাজা ছিলেন কবি ফখরুল হুদা হেলাল। যেখানে প্রতিনিয়ত সুখের আলো কথা বলত। ২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারি ঐ বাসার রাণী পারভীন আপু গত হলে এর রাজা ফখরুল হুদা হেলালও হয়ে যান গৃহহীন। চোখের সামনে তছনছ হয়ে যায় তার সুখের সংসার। হয়তো সন্তান থাকলে এমনটি নাও হতে পারত। কখনো তেলিকোনা, কখনো ঠাকুরপাড়া আবার কখনো বাদুরতলা বিভিন্ন ভাবে ছন্নছাড়া জীবন কেটেছে তার। পরিবার ,সংসার না থাকলে একটি মানুষের জীবন যে কিভাবে কাটে হেলাল ভাই-ই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। তবে এ কথা ঠিক অনুজ হলেও বদরুল হুদা জেনু ভাই এই সময়ে হেলাল ভাইকে যেভাবে আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন তা কোন ভাবেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। প্রতিনিয়ত নিয়ম ভাঙ্গা হেলাল ভাইকে নিয়মের মধ্যে রাখতে বেশ যুদ্ধই করতে হয়েছে জেনু ভাইকে। স্বজন হিসেবে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। আবার হেলাল ভাইয়ের কাছে জীবনের প্রথম এবং শেষ ছিল তার অনুজ বদরুল হুদা জেনু ভাই।

গত বছর দুই এক ধরে হেলাল ভাই মাঝে মাঝে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতে আমাকে ফোন করতেন। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে আমার এই সময়ে বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে কোন অনুষ্ঠানেই যাওয়া হয়নি। এই না যেতে পারার ব্যর্থতা আমাকে আজ ভীষণ কাঁদাচ্ছে।

তিনি আমাকে গত দুই সপ্তাহের মধ্যে বেশ কয়েকবার ফোন করে বলেছেন, শাহাজাদা , আমাকে নিয়ে হালিমসহ কয়েকজন মিলে একটা সংকলন বের করতে চায়। আমি তোমার থেকে একটি লেখা নিতে বলেছি। তোমার সাথে কথা হলে তুমি একটা লেখা দিও।

প্রিয় হেলাল ভাই, আজ আপনার নামাজে জানাযা শেষে হালিম ভাই সেই লেখাটি আমার কাছে চেয়েছে। আমি হালিম ভাইকে বলেছি, আমি অবশ্যই লেখা দিব। তবে দু:খ যে আপনি সংকলনটি দেখে যেতে পারলেন না আর আমার লেখাটাও পড়ে যেতে পারলেন না।

লেখাটি শেষ করতে চাই হেলাল ভাইয়ের আমাকে বলা একটি কথা দিয়ে। আপু বেঁচে থাকতে তিনি আমাকে প্রায়ই বলতেন, আমাকে চিনবা না । মরলে চিনবা। হ্যাঁ, ভাই, আপনি সঠিক বলেছেন। আজ আপনার নামাজে জানাযায় যেভাবে কুমিল্লার বিভিন্ন পেশার বিশিষ্টজনদের প্রধান্য দেখেছি , তাতেই বুঝা যায় আপনিই কুমিল্লার মানুষকে কত বড় ভালোবাসতেন। কুমিল্লার মানুষও আপনাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসত।

আপনি ওপারে ভালো থাকুন প্রিয় হেলাল ভাই। মহান আল্লাহ আপনাকে পবিত্র মাসে পবিত্র দিনে তাঁর করে নিয়েছেন আপনাকে ভালোবাসে বলেই হয়তো। আপনার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
লেখক : সাংবাদিক, সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক।