কর্ণফুলী বাঁচাও কারখানায় ইটিপি বসাও আর পরিবেশ রক্ষা কর

অধ্যাপক ডা: মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১ মাস আগে

কর্ণফুলী নদীর মোহনায় দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম অবস্থিত। নদীটির দৈর্ঘ্য ৩২০ কিলোমিটার। এটি বাংলাদেশ ও ভারতের একটি আন্ত:সীমান্ত নদী। ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড়ে এর উৎপত্তি। নদীটি পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার কাছে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। লুকিয়ারচর কর্ণফুলীর মোহনায় সৃষ্টি হয় ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে আর জলদিয় চ্যানেলটির উৎপত্তি ১৮৭৭ সালে। জলদিয়া চ্যানেলটি আড়াই মাইল দীর্ঘ এবং দেড় মাইল প্রসস্ত। জলদিয়া চ্যানেলটি পতেঙ্গা চ্যানেল থেকে প্রায় দেড় হাজার ফুট দুরত্বে চলে যায় ১৯০১ থেকে ১৯১৭ সালে। হালদা নদীর সঙ্গে কর্নফুলী সংযোগে আছে বিশাল চর যা হালদা চর নামে খ্যাত। নদীর প্রবাহের কিছু অংশ নাজির চর ঘেষে, কিছু অংশ বালু চ্যানেলের মধ্যে এবং কিছু মূল স্রোত হিসাবে প্রবাহিত হচ্ছে। বালুর ঘাট রেলসেতু ১৯৩০ এ নির্মাণের আগে নদীর মূল প্রবাহ প্রধানত কুলাগাঁও এর দিকে বাম তীর ঘেঁষে প্রবাহিত হত। কালুরঘাট সেতু হওয়ার পর সেতু ডানদিকের আরও একটি প্রবাহের মুখ তৈরী হয়। ফলে নদীর মাঝপথে তৈরি হয় বিশাল একটি চর, যা কলাগাঁও চর নামে পরিচিত। চট্টগ্রামে লোকসংস্কৃতিতে ও গানে এ নদীর প্রভাব অনেক। যে কর্নফুলী দিয়ে গর্ববোধ করি আমরা আজ সেই নদীটি কিছু দখলদারের হাতে বিপন্ন। কর্ণফুলী হারাতে বসেছে তার আসল রূপ। এ পরিপ্রেক্ষিতে শত মানববন্ধন ও শত আন্দোলনের ফলে জেলা প্রশাসন অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে চুড়ান্ত নৌটিশ দিয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশনার ২ বছর পর এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অবৈধ উচ্ছেদের নোটিশ দেয়ার পরও নদী দখল থামছে না। উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় কর্ণফুলীর নাব্যতা ও জৌলুস ফেরাতে ২০১৯ এ অর্ধেক স্থাপনা উচ্ছেদের নোটিশ করা হলেও পরবর্তীতে অদৃশ্য কারনে তা বন্ধ হয়ে যায়। আর এ সুযোগে দখলবাজরা নতুন নতুন স্থাপনা তুলে বসে। এভাবে কর্ণফুলী দখলদারদের হাতে চলে গেলে বিলীন হয়ে যাবে এ নদী। কর্ণফুলী বাঁচলে বাঁচবে চট্টগ্রাম, তাই কর্তৃপক্ষের কাছে সবার দাবী তুরাগের হাইকোর্ট রায় সরণ করে কর্ণফুলী তথা চট্টগ্রামবাসীকে রক্ষা করুন।
শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বা এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপন ও নিয়মিত চালু রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক কারখানা ইটিপি, সার্বক্ষনিক চালু না রাখিয়া বর্জ্য সরাসরি পরিবেশে ছেড়ে দেয় বা পাইপ দিয়ে পার্শ্ববর্তী নদী বা খালে ছেড়ে দেয়। পরিবেশ অধিদপ্তর বিষয়টি জানলেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে না। নামকাওয়াস্তে জরিমানা করে দায় সারে। কারখানার পার্শ্বের জনসাধারণ সার্বক্ষনিক ইটিপি চালু রাখার দাবী করে আসলেও দূষিত পানির অভিযোগ করে। শিল্পনগরী ইটিপি বেশির ভাগ সময়ই চালু রাখার দাবী করে। কিন্তু দেখা যায় যেখানে চারটি ইটিপির দরকার সেখানে রয়েছে তিনটি বা দুটি। সেগুলোও সব সময় চালু থাকে না। শিল্প উন্নয়নের কারনে দেশজুড়ে একের পর এক শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠছে। বহু কলকারখানা নিয়ে একেকটা শিল্পনগরী। কিন্তু কলকারখানা পরিবেশের উপর কতটা প্রভাব ফেলছে সেটা নিয়ে কারও কোন মাথা ব্যাথা নাই। শিল্পকারখানার বর্জ্যে এদেশের নদী, খাল, বিল সবই ভয়াবহভাবে দূষিত হচ্ছে। এ নিয়ে আইন থাকলেও সেগুলো প্রয়োগের কোন বালাই নেই। যার কারনে আমরা রাসায়নিক বর্জ্যে হাওর এলাকাও দূষিত হতে দেখেছি। মৌলভী বাজারের সদর উপজেলার গিয়াসনগর ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটেছে। সেখানে বিসিক শিল্পনগরীর রাসায়নিক মিশ্রিত তরল বর্জ্য গিয়ে মিশছে পাশের হাওরে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রতিনিধিদল এলাকাটি পরিদর্শনে গিয়ে এর সত্যতা পায়। ১৯৮৭ সনে ১৫ একর জমির উপর বিসিক শিল্পনগরীটি চালু হয়। দীর্ঘদিন ধরে সেখানকার রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত বর্জ্যে মাটি দূষণের কারণে ধানের ফলন কমে গেছে। পানি দূষণের কারণে মাছ কমে গেছে। এমনকি দূষিত পানি পানে গরু বাছুর মারা যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শিল্পনগরী কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসন অবগত আছেন । কিন্তু দীর্ঘদিনেও কোন সমাধান নাই। এভাবেই কি সেখানে পরিবেশ দূষণ ও জনজীবন বিপর্যস্থ হতে থাকবে?
সমুদ্র ও পরিবেশ সংরক্ষণ, দূষণরোধ, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় জীব বৈচিত্রর সংরক্ষণ, সমুদ্র সম্পদ আহরন এবং পরিবেশ উন্নয়নে টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করনে সরকার ইতিবাচক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ন ও সম্পদের অতি ব্যবহারের ফলে প্রকৃতি ও পরিবেশ আজ অনেকটাই বিপর্যস্ত। মানবসৃষ্ট কারনে পরিবেশ দূষণ মোকাবেলা ও পরিবেশ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেয়া দরকার। আমাদের এই গ্রহকে সুরক্ষার জন্য প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখার স্বার্থে বিশ্ববাসীকে সোচ্চার হতে হবে। একইসঙ্গে আমাদের দেশের পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। দু:খজনক হলো, দেশের পরিবেশ সুরক্ষায় মানুষ উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছে। প্রতিদিন যে সংখ্যক পলি ব্যাগের বর্জ্য জমা হয়-এটি বিবেচনায় নিলেই স্পষ্ট দেশবাসী পরিবেশ রক্ষায় কতটা উদাসীন। সাথে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এতটাই চরমে উঠেছে যে, সরিষার ভূত তাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে প্রতি বর্ষাতেই জলাবদ্ধতার কারনে রাজধানীবাসীকে অবর্ননীয় দূর্ভোগ পোহাতে হবে।
অতীব লক্ষণীয়, পরিবেশ দূষনে মানুষের দূর্ভোগ বেড়েই চলেছে। নানাহ দূষনের কারনে বদলে যাচ্চে প্রকৃতিক পরিবেশ। এসকল কারনে নানাবিধ প্রাকৃতিক দূর্যোগের সম্মুখিন হচ্ছে মানুষ। দূষণের কারনে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক মানুষ মারা যাচ্ছে পৃথিবীতে। একই সঙ্গে অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটছে। ঝুঁকিতে আছে আরও অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিলুপ্তি । আমরা যদি আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাই, তাহলে এমন কোনো কাজ করা যাবে না যার কারনে প্রকৃতি বিরুপ আচরন করে। দু:খজনক হলেও সত্য শিল্পোন্নত দেশগুলোর কারনে দ্রুত বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে। ফলে বিশ্বে বাড়ছে ঝড়, খরা, বন্যাসহ নানারকম দূর্যোগ। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারনে সামুদ্রিক ঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে। এতে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় কম উন্নত দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ভৌগোলিক অবস্থানগত কারনে সামুদ্রিক ঝড়, বন্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের দেশ অতিমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। যদিও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে আমাদের ভূমিকা গৌন। এ উপলক্ষে এক বানীতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ অর্জনে সরকার প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। সাধারণ মানুষ মনে করে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের টেকসই উন্নয়ন ব্যহত হতে পারে।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ কার্বন ডাই অক্সাইড নি:সরন মাত্রা সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নেও সক্ষমতায় ৬.৭৩ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় প্রাপ্তি স্বাপেক্ষ আরও ১৫.১২ শতাংশ নির্ধারন করা হয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সমন্বিত অভিযোজন কৌশল ও করনীয় নির্ধারনকল্পে “জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা” প্রণয়নের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। ২০০৯ সালে প্রনীত “বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন, কৌশল ও পরিকল্পনা” হাল নাগাদকরন কার্যক্রম চলমান আছে। এছাড়া শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে দেশে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত সব প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ বান্ধব করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ৮,৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানের বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ দশটি প্রকল্পের মধ্যে ৪টি বাতিল করা হয়েছে ও বাকী ৬টির মধ্যে সমীক্ষার ভিত্তিতে নবায়নযোগ্য অথবা গ্যাসিভিত্তিক করা হবে। আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আমাদের ৪০ শতাংশ জ্বালানীর সংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছি। আমরা দেশবাসী কয়লা বিদ্যুতের স্থাপনার বিরোধী এবং পরিবেশবাদীরা তাহা সমর্থন করে। তাই অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশকে জলবায়ুর ঝুঁকি থেকে টেকসই ও জলবায়ু সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সরকার “মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা” বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। যা মূলত: জলবায়ু অর্থায়নের জন্য একটি কৌশলগত বিনিয়োগ কাঠামো।

সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ

সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা অঞ্চল