কীটনাশক পরিবেশের জন্য হুমকি

অধ্যাপক ডাঃ মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১০ মাস আগে

আমাদের কৃষি উৎপাদনে যত্রতত্র কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। বৎসরে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে বলে এক গবেষনায় দেখা যায়। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুসারে এর এক চতুর্থাংশ বৃষ্টির মাধ্যমে আশেপাশের উন্মুক্ত জলাভূমিতে প্রবেশ করে। এতে জলাভূমি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মাছসহ অনেক জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। এই দূষিত পরিবেশে অনেক মাছের প্রজনন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা লোপ পায়। সাধারণতঃ অনেক কীটনাশক আমাদের দেশে ব্যবহার হয় যার মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হচ্ছে অর্গানোফসফেট, পাইরিথ্রয়েড, কার্বোমেট ও অর্গোনোক্লোরিন।
অর্গানোক্লোরিন জাতীয় কীটনাশকগুলি হচ্ছে ডাই-এলড্রিন, এলড্রিন, ক্লোরডেন ও ডি ডি টি গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। এ সকল কীটনাশকের প্রভাবে প্রানীর মাংসপেশী সংকোচিত হয়, স্নায়ুতন্ত্রের ক্রিয়াকর্ম ব্যাহত হয়। দেখা যাচ্ছে, ব্যাপক শিল্পায়ন, নগরায়ন, সেই সাথে ব্যাপক জনসংখ্যার চাপে গোটা বিশে^র পরিবেশটাই ক্রমান্বয়ে দূষণের কবলে পড়ছে। পরিবেশ দূষণকারী বস্তুগুলোর মধ্যে কীটনাশক অন্যতম। এক গবেষণায় দেখা গেছে কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক মাটি, পানি, মাছ, শস্য, বায়ু এমনকি মাতৃদুগ্ধও দূষিত হয়ে থাকে। বিশে^ খাদ্যের চাহিদাবৃদ্ধিতে বিজ্ঞানীরা নিত্যনতুন উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। এতে করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, জনগণের খাদ্যাভাবও মিটছে। পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানোর স্বার্থে রাসায়নিক ও কীটনাশকের ব্যবহারও বেড়েই চলছে। অত্যন্ত দুঃখজনক হচ্ছে কীটনাশকের নির্বিচার ব্যবহার অনেকক্ষেত্রেই পরিবেশের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কার্বোমেট জাতীয় কীটনাশক হচ্ছে মিপসিন, পাদান, কার্বোরিল ও কার্পোফুরান গ্রুপের অন্তর্ভূক্ত। এই সকল কীটনাশক প্রাণীর রক্তের এনজাইমেটিক ক্রিয়াকলাপের বাধার সৃষ্টি করে।
পাইরিথ্রয়েড জাতীয় কীটনাশক ডেসিস, সিমবুল, সুমাইডিন ইত্যাদি গ্রুপের অন্তর্গত। এই শ্রেণির কীটনাশক খুবই ধ্বংসাত্মক। এই গ্রুপের প্রায় সবকটিই পানিতে প্রয়োগের সাথে সাথে মাছ মরতে শুরু করে। বিশ^স্ত সূত্রে জানা যায় ২০টিরও বেশি পাইরিথ্রয়েড আমাদের দেশে ব্যবহৃত হয়।
অর্গানোফসফেট জাতীয় কীটনাশক বাসুডিন, ম্যালথিয়ন, সুমিথিয়ন, ডায়াজিনন, নগস, ডাইমেক্রন ইত্যাদি এই গ্রুপের অন্তর্ভূক্ত। এই জাতীয় কীটনাশকের বিক্রিয়ায় প্রানীর রক্তের এনজাইমের কার্যকারিতা নিশ্চল হয়ে যায়।
কীটনাশক বায়ু থেকে শ^াস-প্রশ^াসের মাধ্যমে প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে। ইহা বিভিন্ন প্রানীর মতই মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গ যেমন- ফুসফুস, পাকস্থলী, মস্তিষ্ক, যকৃত, বৃক্ক ইত্যাদিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে।
বহু কীটনাশকের কার্যকারিতা দীর্ঘদিন মাটিতে অক্ষুন্ন থাকে। অনেকগুলি ব্যবহারের জন্য বসবাসরত অন্যান্য উপকারী ক্ষুদ্রকায় জীবও মারা যায়।
কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশকের প্রায় ২৫ শতাংশ মূলতঃ চারিপাশের্^র জলাশয়ে মিশে যায়। এছাড়াও কীটনাশক তৈরীর কারখানা এবং স্প্রে করার যন্ত্রপাতি ধৌত করার কারণে জলজ পরিবেশ দূষিত হয়। এই দূষণ মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রানী যেমন ফাইটোপ্লাংটনকেও দূষিত করে।

মাছের উপর কীটনাশকের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার এক সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রায় সকল কীটনাশকই মাছের জন্য ক্ষতিকারক। তবে পাইরিথ্রয়েড ও অর্গোনোক্লোরিন গ্রুপে বেশির ভাগ মাছের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই গ্রুপের বিষাক্ত কীটনাশক নীচু এলাকার ধানের জমিতে প্রয়োগের সাথে সাথে ঐ স্থানসহ পাশর্^বর্তী এলাকার জলমহলে মাছের তাৎক্ষনিক মৃত্যু ঘটে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৬০ শতাংশ কীটনাশক চরম বিষাক্ত, ৩০% কম বিষাক্ত এবং ১০% বিষাক্ত নয়। কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব প্রানীর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। এর বিষক্রিয়ায় মাছের ডিম্বাশয় ও শুক্রাশয়ের কার্যকারিতা অনেক অংশে লোপ পায়। ফলে যথাযথভাবে ডিম্বানু ও শুক্রানু মাছ উৎপন্ন করতে পারে না। আমাদের দেশে সারা বর্ষায়ই বিভিন্ন মাছ ডিম দিয়ে থাকে। আমরা সর্বদা দেখে এসেছি পুটি, কৈ, শিং, মাগুর, টাকি, শোল, গজার, বাইং ইত্যাদি মাছ স্বল্প পানিতে ধানের জমিতে ডিম নিঃস্বরণ করে ও পোনা লালন পালন করে। ইদানীং এসব ধানের জমিতে নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জমির পানি বিষাক্ত হওয়ার কারণে মাছের প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র হিসাবে এসব স্থান মাছের জন্য অত্যন্ত বিপদসংকুল ও অনুপোযোগী।
ডি ডি টি, ক্লোরেডেন, হেপ্টাক্লোর ইত্যাদি ও বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নিষিদ্ধ অনেক কীটনাশকও দেশের কোন কোন স্থানে ব্যবহার করতে দেখা যায়। অনাদীকাল থেকেই মৎস্য সম্পদ প্রাকৃতিকভাবে আহরিত হচ্ছে, অনেক কৃষি জমিতে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে অধিক হারে কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক কীটনাশক পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। কিন্তু কৃষকের অজ্ঞতার কারণেও সেটি সর্বক্ষেত্রে হয়ে উঠছে না। ক্ষতির মাত্রা একদম কম এরকম কীটনাশক কি একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না? Ñএটা আজ জাতির সামনে বিরাট প্রশ্ন। মাছ ও পরিবেশ রক্ষায় একটু সামাল দিতে পারে এরকম সহনীয় কীটনাশক কি আমরা কৃষকের হাতে তুলে দিতে পারি না। সরকার ও দেশবাসী একত্রে এ চিন্তা মাথায় নিয়ে যত শীঘ্রই এর সমাধান বের করে আনা জাতীয় আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ