কুমিল্লায় অনুমোদনহীন রেলক্রসিং ১৫০, প্রতিটি ‘মরণ ফাঁদ’

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১ মাস আগে

কুমিল্লা জেলার উপর দিয়ে রেললাইন পড়েছে ১২০ কিলোমিটার । এই রেললাইনে ২০০টি রয়েছে রেলক্রসিং। এর মধ্যে অনুমোদনবিহীন রয়েছে ১৫০টি। প্রতিটি অবৈধ ক্রসিংই এক একটি মরণ ফাঁদ। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তথ্যে অনুমোদনহীন ও অবৈধ রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা প্রায় দেড়শ হলেও স্থানীয়রা বলছেন- বাস্তবে এই সংখ্যা দ্বিগুনেরও বেশি হবে। এসব অবৈধ রেলক্রসিংগুলো ‘মরণ ফাঁদ’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে মানুষের কাছে।

জেলার লাকসাম রেলওয়ে থানার আওতাধীন এলাকাতেই রেলপথের মধ্যে গত সাড়ে ৫ বছরে দুর্ঘটনায় ৩৩৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে পুলিশ। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসেই এই সংখ্যা ৪৭ জন। এসব দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যা ৫ শতাধিক বলে জানা গেছে। এসব দুর্ঘটনার বেশিরভাগই অনুমোদনহীন রেলক্রসিংয়ের মধ্যে ঘটেছে বলে জানা গেছে।

পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের প্রবেশদ্বার বলা হয় কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে জংশনকে। জেলার ১২০ কিলোমিটার রেলপথ পড়েছে- ঢাকা-লাকসাম-চট্টগ্রাম, লাকসাম-নোয়াখালী ও লাকসাম-চাঁদপুর রুটে। এই বিশাল রেলপথ এলাকায় থাকা অবৈধ রেলক্রসিংগুলোতে প্রায়ই ঘটছে প্রাণহানি। এরপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে মানুষকে। অবৈধ এসব রেলক্রসিংয়ে গেট নির্মাণ ও গেটম্যান নিয়োগের দাবি দীর্ঘদিনের হলেও এই সমস্যা সমাধানে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তেমন কোন উদ্যোগ নেই বলে দাবি স্থানীয়দের। তবে এরই মধ্যে বেশ কিছু স্থানে গেট নির্মাণ ও গেটম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে।

কুমিল্লা রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী লিয়াকত আলী মজুমদার বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে লাকসাম থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ডাবল লাইন নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। লাকসাম থেকে আখাউড়া ৭২ কিলোমিটার রেলপথে বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা ১৪টি, অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা ৬৪টি। এরমধ্যে ২০টি লেভেল ক্রসিং নতুন করে বৈধ করা হচ্ছে। এ ছাড়া লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথে ২০টি বৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে এবং অবৈধ ৩৭টির মধ্যে ১৪টি নতুন করে নির্মাণ করে বৈধ করা হচ্ছে। আর লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথে বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা ২২টি এবং অবৈধ ৪২টির মধ্যে নতুন করে গেট নির্মাণ করা হচ্ছে ১৬টিতে।
গত ৯ মার্চ ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল পথের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর এলাকায় স্কুলে যাওয়ার পথে ট্রেনে কাটা পড়ে ৩ শিশু শিক্ষার্থী নিহত হয়। ওই তিন কন্যা শিশু বিজয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
বিজয়পুর এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে লিয়াকত আলী মজুমদার আরও জানান, কুমিল্লা জেলায় রেলপথ রয়েছে প্রায় ১২০ কিলোমিটার। দুর্ঘটনা সামনে প্রতিটি রেলক্রসিংয়ে ১০০ ফুট করে ফ্যান্সিং (কাঁটাতারের বেড়া) করা হবে। বিজয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এলাকায় ৫০০ ফুট ফ্যান্সিং করা হবে।
লাকসাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার জসিম উদ্দিন বলেন, লাকসাম রেলওয়ে থানার আওতাধীন এলাকাটি হলো- ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গঙ্গাসাগর রেলস্টেশন থেকে ফেনীর ফাজিলপুর,
লাকসাম-নোয়াখালী রুট এবং লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথে লাকসামের চিতোষীর আগ পর্যন্ত। এর মধ্যে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা লালমাই, সদর দক্ষিণ, নাঙ্গলকোটসহ কুমিল্লা জেলা এলাকা।
জসিম উদ্দিন জানান, ট্রেন দুর্ঘটনায় আমাদের এলাকায় ২০১৭ সালে ৭৪ জন, ২০১৮ সালে ৬৮, ২০১৯ সালে ৬৬, ২০২০ সালে ৩৭, ২০২১ সালে ৪২ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা ৪৭ জন। সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণেই ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যায় অনেকে। এছাড়া রেললাইনের ওপর দিয়ে যাওয়া সড়ক পথের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ রেলক্রসিংয়ে যান চলাচলে অসাবধানতার কারণে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের সাথে ট্রেনের সংঘর্ষেও প্রাণহানি ঘটে। আমরা চেষ্টা করছি এসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে।

কুমিল্লা রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী লিয়াকত আলী মজুমদার বলেন, পর্যায়ক্রমে আমরা গুরুত্বপূর্ণ সকল রেলক্রসিংগুলোতে গেটি নির্মাণ এবং গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া। রেললাইনে যেহেতু সবসময় ১৪৪ ধারা বলবত থাকে, সেক্ষেত্রে জনসাধারণকেই সচেতন হতে হবে। মানুষ চলাচলে সচেতন হলেও ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমে আসবে।