গণমাধ্যমের কন্ঠরোধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করবেন না – শাহাজাদা এমরান

মন্তব্য প্রতিবেদন
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

সব সরকারের আমলেই দেশের যে কোন পেশাজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী শারীরিক,মানুষিক লাঞ্চিত,নির্যাতিত,নিগৃহিত,বঞ্চিত ও শোষিত হয়ে আসছেন গণমাধ্যমের কর্মীরা। রাষ্ট্র যাদেরকে চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

কথায় কথায় সাংবাদিকদের উপর হামলা, মামলা, নিপিড়ীন বর্তমানে চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সর্বশেষ নির্যাতনের শিকার হলো আমাদের সহকর্মী বেসরকারি সংবাদভিত্তিক স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ এর রিপোর্টার ও ক্যামেরা পার্সন। গত ৫ সেপ্টেম্বর পেশাগত দায়িত্ব পালন করার সময় করের টাকায় পরিচালিত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা তাদের উপর হামলা চালিয়েছে। আর এর নেতৃত্ব দিয়েছে শিক্ষিত দূর্বৃত্ত্ব বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক আবদুর রশীদ।

কি অপরাধ করেছেন এই দুই সাংবাাদিক ? যার জন্য তাদেরকে মেরে হাসপাতালে পাঠাতে হলো, ভেঙ্গে ফেলা হলো তাদের ব্যবহৃত ক্যামেরা, ভোমসহ আনুসাঙ্গিক যন্ত্রপাতি। হ্যাঁ, সাংবাদিক বন্ধুগণ অনেক বড় অন্যায় , অপরাধ ও অপকর্ম করেছেন । সেই অপকর্মটি হলো, সরকার বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সূর্যের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করার জন্য সকাল ৮টা থেকে অফিস শুরুর নির্দেশনা দিয়েছে । সদাশয় সরকার বাহাদুরের মাঠ পর্যায়ের সৈনিকেরা এই নির্দেশনা মানছে কিনা তা সরেজমিনে দেখতে গিয়েছেন পেশাদার দুই সাংবাদিক। কারণ, যে কোন রাষ্ট্রের জন সাধারনের সেবা করার অঙ্গিকার করা , বেতনভুক্ত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে কি-না তা দেখার জন্য যে পেশাটি রয়েছে তার নাম সাংবাদিকতা। যা যুগ যুগ ধরে আন্তজার্তিক পর্যায়েও স্বীকৃত। সাংবাদিকরা যদি তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করেন তাহলে তো দুর্নীতিবাজ , স্বজনপ্রীতিবাজ এবং অপকর্মকারীরা সুযোগ পেয়ে যাবে , যা খুশি তা করার। তখন আর সেগুলো দেখার কেউ থাকবে না ।

ফলে পেশাগত দায়িত্ব পালন করার জন্য এটিএন নিউজের দুই সাংবাদিক সেদিন রাজশাহি বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) অফিসে যান। আগেই সাংবাদিককের কাছে তথ্য ছিল এই অফিসের সবাই দেরি করে আসেন । সাংবাদিকদ্বয় অফিসে এসে দেখেন সকাল ৮টা বাজার অনেক পরেও অফিসে কোন কর্মকর্তা নেই। তাই তারা ৫ সেপ্টেম্বর) সোমবার )বরেন্দ্র ভবন থেকে এ দৃশ্যই সরাসরি সম্প্রচার করছিল এটিএন নিউজে। এ কারণে চ্যানেলটির দুই সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।

সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ , সে সময় বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক আবদুর রশীদ অফিসে এসেই এটিএন নিউজের সাংবাদিকদের বলেন, ‘কার অনুমতি নিয়ে এখানে ভিডিও করা হচ্ছে?’ এটিএন নিউজে লাইভ চলাকালেই তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।

প্রিয় পাঠক , আপনাদের কাছে আমার বিনীত প্রশ্ন, তিনি অফিসে সময় মত আসেন না দেরিতে আসেন এটা যদি অনুমতি নিয়ে লাইভ করতে হয় আপনারাই বলেন, তাহলে কি সরকার তথা জাতি সঠিক তথ্য জানতে পারবে । আপনি যদি চোরকে বলেন, ভাই চোর, তুমি যখন আমার বাসায় চুরি করবা , তখন আমাকে বলিও আমি ভিডিও করব । তাহলে চোর কি আর চুরি করতে আসবে ?

মহান আল্লাহ্ যদি আমাকে সুস্থ ভাবে বাঁচিয়ে রাখে তাহলে আগামী ২১ অক্টোবর আমার গণমাধ্যমে কাজ করার ২৮ বছর পূর্ণ হবে। এই সময়ে কত শত শত হুমকি ধমকি খেয়েছি শুধুমাত্র সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সংবাদ পরিবেশন করার জন্য।

২০১২ সালে একজন সাবেক হুইপ-এমপি , কুমিল্লার জাদরেল এক রাজনীতিক নেতা আমার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা একটি জিডি করেন এবং নানা ভাবে আমাকে হয়রানি করেন। আমার অপরাধ ছিল, তার সাক্ষাতকার নিতে গিয়ে তিনি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যে কথা বলেছেন, আমি দৈনিক আমাদের কুমিল্লার হেড লাইনে সেটি কেন দিয়েছি। তার বক্তব্য, আমি এ কথা বলিনি। আমি যখন তার রেকর্ডকৃত বক্তব্যটি তাকে পাঠালাম তখন তিনি সরাসরি বললেন এটি সুপার এডিট করা বক্তব্য। গত এক মাস ধরে (৬ সেপ্টেম্বর২০২২ মঙ্গলবারও) প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হুমকি ধমকি যেন আমার নিত্য সঙ্গি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার অপরাধ, কুমিল্লার অন্য পত্রিকায় লেখে না, আমি কেন দৈনিক আমাদের কুমিল্লা ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল কুমিল্লার জমিন এ লেখি। আরে ভাই, আমি তো আপনার পেছনে লেগে থেকে দূর্নীতির অনুসন্ধানী ( যদিও করা দরকার এবং এমন সংবাদ অনেক আছে) সংবাদ করছি না। কিন্তু প্রকাশ্য দিবালোকে যা ঘটবে তা চোখে দেখে এড়িয়ে যাওয়ার ব্যক্তি তো আমি না। এখন সবাই ময়লা আবর্জনা খাবে বলে আমাকেও কি তা খেতে হবে । অন্য সবাই সাদাকে কালো আর কালোকে সাদা বলবে দেখে আমি কি নতজানু হয়ে তাই করব ? আমি স্পষ্ট বলে দিয়েছি, ব্যক্তি জীবনে হয়তো আমি খুব সাহসী ন্ া। কিন্তু যে পেশা দিয়ে নিজের এবং পরিবারের জীবন জীবিকা নির্বাহ করি সেই পেশাকে সমুন্নত রাখার জন্য বন্ধুকের গুলিও আমাকে সত্য ও ন্যয়ের পথ থেকে বিচ্যুত করার ক্ষমতা রাখে না। হুমকি ধমকি দিয়ে আমাকে পরাস্ত করার চিন্তা বাদ দিয়ে ভালোবাসার পথে এগুতে হবে।

গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে সারা দেশের গণমাধ্যম কর্মীদের ওয়ালে হাইকোর্টের একটি বক্তব্য বেশ ভাইরাল হয়ে আছে। ফেসবুক ওয়ালে পোষ্ট করা বেশ কয়েকজন সহকর্মীদের কাছে জানতে চেয়েও জানতে পারিনি এই বক্তব্যটি আদৌ হাইকোর্ট দিয়েছে কি না। কিন্তু মাননীয় হাইকোর্ট দিক বা না দিক, কথা গুলো গণমাধ্যম কর্মীদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। হাইকোর্টের নামে প্রচার হওয়া বক্তব্যটি এমন, ‘সাংবাদিকরা সংবাদ খুঁজবে, সংবাদ অনুসন্ধ্যানে সরকারী বেসরকারী যে কোন স্থানে যে কোন সময় যাবে। সাংবাদিকদের কাজে বাধা দেওয়া যাবে না’ ।

যদি ধরেই নেই, মাননীয় হাইকোট এই কথাটি বলেছেন, তাহলে বলব, জাতি হিসেবে আমরা কত দূর্ভাগ্যজনক পেশায় আছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের কর্ম সম্পাদনের জন্য হাইকোর্টকে এগিয়ে আসতে হলো। অথচ, গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা বলতে বলতে আমাদের ক্ষমতাসীনদের মুখে ফেনা উঠে যায়। কিন্তু, আমরা যারা পত্রিকা চালাই আমরা জানি প্রতিদিন পত্রিকা মেকাপ করার সময় , একটা সত্য ও সুন্দর নিউজের উপর কতবার সেল্প সেন্সরশীপের কাঁচি চালাই।

আমি শুধু বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সরকারের কথা বলব না, আমাদের দেশে প্রতিটি রাজনৈতিক দল যখানি যে ক্ষমতায় আসে তখন তারা মনে করে দেশের গণমাধ্যম তাদের পক্ষে কথা বলতে হবে। গঠনমুলক সমালোচনা করলেও মনে করে ঐ গণমাধ্যম তাদের শত্রু। নূন্যতম গঠনমূলক সমালোচনাও তারা সহ্য করে না। অথচ, একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকে রাখার জন্য স্বাধীন গণমাধ্যমের কোন বিকল্প নেই।

মন্ত্রী,এমপি , মেয়র,উপজেলা ও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেম্বার থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের নেতা এমনকি পাতি নেতারাও সাংবাদিকদের নীতিবাক্য শোনাতে চাই। ভাই, আমি স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ^াসী। আমি চাই আমার এলাকায় মুক্ত গণমাধ্যম বিকশিত হোক। অথচ , সংবাদটি যদি তার প্রত্যক্ষ না হোক পরোক্ষ ভাবেও যদি তার বিরুদ্ধে যায় , তাহলেই মুহুর্তের মধ্যেই সাংবাদিক হয়ে যায় হলুদ সাংবাদিক। কখনো ঐ সাংবাদিকের পেছনে লেলিয়ে দেওয়া হয় প্রশাসনের এক শ্রেনীর দলবাজ কর্মকর্তাদের, কখনোবা দলীয় ক্যাডারদের। তাদের বক্তব্য এমন, সাংবাদিক ! আরে মার, যত খুশি মার , সাংবাদিক মারলে কিছু হয় না। যদিও এই মুক্ত গণমাধ্যমের প্রতিবন্ধক নেতারা যখন আবার বিরোধী
দলে যাবেন তখন সাংবাদিক এবং গণমাধ্যম হয়ে যায় তাদের পরম আত্মার আত্মীয়।

বর্তমান সরকার প্রথমে ৫৭ ধারা ও পরবর্তী পর্যায়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ৩২ ধারাতো সাংবাদিকদের কন্ঠ রোধ করার জন্য ঝুলিয়ে রাখছেই। দেশের সকল পর্যায়ের গণমাধ্যম ব্যক্তিরা এই ৩২ ধারা রহিত করতে আবেদন নিবেদন করলেও আমাদের মাননীয় আইনমন্ত্রীর কর্ণগোচরে আজো মনে হয় পৌঁছেনি।
সবশেষে আওয়ামীলীগ বিএনপি, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারিসহ সবাইকেই একটি কথা বলতে চাই, মনে রাখবেন , গণমাধ্যমের কন্ঠরোধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করে এই পর্যন্ত কোন স্বৈরশাষকই টিকতে পারেনি , এখনো কেউ পারবে না , ভবিষ্যতেও না। গণমাধ্যম কর্মীদের হুমকি ধমকি না দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে আস্থায় নেয়ার চেষ্টা করুন। অতএব , সাধু সাবধান ।

লেখক : সাংবাদিক,সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক। ০১৭১১-৩৮৮৩০৮,

sahajadaamran@yahoo.com.