জ্ঞানপাপী সম্পাদক, দাসত্ব ও নির্মোহ সাংবাদিকতা– শাহাজাদা এমরান

সময়ের কলাম
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১ মাস আগে

কেস স্টাডি-১ :
আজ থেকে কয়েক বছর আগের কথা। কুমিল্লার একটি পৌরসভায় নির্বাচন। পেশাগত দায়িত্ব পালন করার জন্য আমরা ৭/৮জন সাংবাদিক ঐ পৌরসভায় যাই। বেশ কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করার পর হঠাৎ দেশের একটি বড় গণমাধ্যমের সম্পাদক আমার সাথে থাকে তার প্রতিনিধিকে অশ্লিল ভাষায় গালাগালি শুরু করলেন। উষ্টা,লাথ্থি ইত্যাদি ভাষাও প্রয়োগ করলেন এবং বললেন, আমি যদি তোকে বের করে দেই বাংলাদেশের কোন হাউজ তোকে নিব না। আরো কিছু খোঁটা দিল। এবং বলল, এখন তুই নির্বাচনী এলাকা ত্যাগ কর। ফোন রাখার পরই দেখি আমাদের ঐ সহকর্মীর চোখের পানি কচু পাতার পাানির মতো টলমল করছে। কারণ জানতেই বলল, ভাই চলেন কুমিল্লা। এখানে থাকলে আমার আজই চাকরি চলে যাবে। কাল বিলম্ব না করে দুপুর সাড়ে বারোটার আগেই কুমিল্লা শহরে চলে আসলাম।

এই মুহুর্তে পাঠকের জানার আগ্রহ থাকতে পারে কি কারণে দেশ সেরা সম্পাদক, কলাম লেখক ও টক-শোর আলোচিত মুখ এ ব্যবহার করলেন। কারণটি হলো, ঐ পৌরসভায় সম্পাদক মহোদয় (!) এর একজন মেয়র প্রার্থী আছেন। যিনি গণতন্ত্রকে কঠিন ভাবে গলা টিপে, মানুষের ভোটের অধিকারকে হরণ করে কেন্দ্র দখল করবেন। নির্দিষ্ট প্রতীকে সিল মারবেন। সাংবাদিক থাকলে এই কাজটি করতে পারবেন না। সম্পাদক মহোদয়ের স্থানীয় চামচারা তাকে ফোন করে বলেছেন, ভাই আপনার প্রতিনিধি কুমিল্লা থেকে সাংবাদিক নিয়ে এসেছেন। কেন্দ্র কেন্দ্র ঘুরছেন। আমরা তার জন্য সিল মারতে পারতেছি না। তখন তিনি হুঙ্কার দিয়ে সাংবাদিকতার নীতি আদর্শকে ভুলুুন্ঠিত করে তার প্রতিনিধিকে কেন্দ্র ছাড়া করলেন। যাতে তার লোকেরা কেন্দ্র দখল করে নির্দিষ্ট প্রতীকে সিল মারতে পারে। বড়ই বিস্ময়ের বিষয় হলো, ঐ দিনই দিন গত রাতে একটি বেসরকারি টিভির টক-শোতে তিনি গণতন্ত্রের সবক দিলেন এবং একই সাথে মফস্বল সাংবাদিকতার কিছু দূ:খ দূর্দশা তুলে ধরে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিলেন। ভণ্ড ,শঠ,জ্ঞান পাপি সম্পাদক আর কারে বলে।

কেস স্টাডি-২ :
চলতি সপ্তাহে দেশের মোটামোটি মানের একটি গণমাধ্যমের এক কর্মকর্তা তাদের এক প্রতিনিধিকে নির্দেশ দিলেন তার গ্রামে গিয়ে তার ছেলের জন্ম নিবন্ধের কাজটি করে দেওয়ার জন্য। আত্মসম্মানবোধ নিয়ে বেঁচে থাকা ঐ প্রতিনিধির প্রশ্ন হলো, তিনি আমাকে এভাবে নির্দেশ দিবেন কেন ? তিনি আমাকে অনুরোধ করে বলবেন, ভাই , যদি পারেন আমার এই কাজটি করলে উপকার হবে। তখন  ঐ প্রতিনিধি ঐ কর্মকর্তাকে বললেন,আপনি আমাকে এভাবে বলতে পারেন না। আমাকে অনুরোধ করতে হবে। তখন ঐ কর্মকর্তা তার সম্পাদক সাহেবকে বললেন, আপনার প্রতিনিধি আমার কথা শুনে না। আর চাকুরি কিভাবে থাকে ? সম্পাদক মহোদয়, পরদিন ফোন করে কয়েকটি কথা বলে বললেন, ঠিক আছে আমরা নতুন লোক দেখছি। অথচ, ঐ সম্পাদক প্রায় সাংবাদিকতা নিয়ে কলাম লিখেন,সাংবাদিকতার উৎকর্ষ বিধানে জাতিকে জ্ঞান দান করেন। এখানে আমার প্রশ্ন, কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বাড়ির কাজের সাথে সাংবাদিকতার কোন সম্পর্ক আছে কি না ?

কেস স্টাডি-৩ :
সদ্য কুমিল্লার আরেকজন সাংবাদিকের চাকুরি চলে গেল কিংবা একেবারেই যাওয়ার পথে। এই প্রতিবেদক ঐ সহকর্মীর কাছে জানতে চাইলেন, চাকুরিচ্যুতির বিষয়ে অফিস আপনাকে কোন চিঠি কিংবা শোকজ করেছে কি না। জবাবে তিনি না বললেন। অথচ, এই সম্পাদক মহোদয় সারা বিশ্বের সাংবাদিক বা সম্পাদকদের জ্ঞান বিতরণ করেন মুক্ত হস্তে।

আমি সাংবাদিকতার চাকুরিকে কচু পাতার পানির সাথে তুলনা করি সব সময়। আপনারা দেখবেন, পানিটা যখনি কচু পাতায় পরে, কি সুন্দর দেখতে । স্বচ্ছ,শোভাময় টলমল করে। কিন্তু ক্ষনিকের মধ্যেই আবার তা পড়ে যায়। অর্থাৎ কচু পাতার মধ্যে পড়া পানির কোন স্থায়িত্ব নেই। তার চেয়ে আরো বড় অনিশ্চিত হচ্ছে সাংবাদিকতার পেশা। বাহির থেকে অনেকেই সাংবাদিকদের অনেক ভাবে বিশ্লেষন করেন, অনেক গসিব রচনা করেন,বলেনও। আসলে সাংবাদিকরাও কিন্তু এই দেশেরই মানুষ। দেশের অন্যান্য পেশার মধ্যে যেমন ভালো ,খারাপ দুটো আছে সাংবাদিকরাও তার ব্যতিক্রম নন। এজন্য আপনি বা আপনারা কতিপয় নীতিচুত্য ব্যক্তির কারণে গোটা সাংবাদিক সমাজকেই দায়ি করতে পারেন না।
আপনারা জানেন না যে, বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াভহ ক্ষণস্থায়ী ও অনিশ্চিত পেশা হলো সাংবাদিকতা। গ্রামের গরিবের বউ যেমন সবার ভাউজ হয়ে যায় , ঠিক তেমনি সাংবাদিকদের উপরও সবাই গুটি চালান। বিশেষ করে দেশের মফস্বল সাংবাদিকদের অবস্থা এ ক্ষেতে আরো শোচনীয়। একজন পেশাদার মফস্বল সাংবাদিককে কত কিছু যে সামাল দিতে হয় তা এক মাত্র উপরওয়ালাই ভালো জানেন। ক্ষেত্র বিশেষ গণমাধ্যমের মালিকের কথা , অফিসের সম্পাদক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের বিভাগীয় সম্পাদক এমনকি কর্মকর্তা ,কর্মচারি , স্থানীয় ভাবে রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব,ক্ষমতাসীন দলের হোমরা চোমরা,পেশী শক্তিওয়ালা , প্রশাসনসহ নানা শ্রেণী ও পেশার মানুষের কথা শুনতে হয়। পান থেকে চুন খসলেই টপ টু বটম নিরীহ ও ঐ সাংবাদিককেই ধরবে। দেশের খুব কমই গণমাধ্যম আছে যারা সমস্যা হলে মফস্বল সাংবাদিকের পাশে দাঁড়াবে। তার পত্রিকার একটি সংবাদের জন্য অনেক সময় শ্রোতের বিপরীতে গিয়েও কাজ করতে হয়। কিন্তু দিন শেষে যখন ঐ সাংবাদিক বিপদে পড়েন তখন কিন্তু দাায়িত্ব নিতে চান না সিদ্ধান্ত দাতারা। আবার মফস্বল সাংবাদিকদের আরেকটি সমস্যা হলো, নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব,গ্রুপিং । আর এই দ্বন্দ্ব,গ্রুপিংয়ের পুরো সুযোগটি কাজে লাগায় স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ক্ষেত্রবিশেষ প্রশাসন। রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসন নিজেদের হীন স্বার্থ চারিতার্থ করার জন্য সাংবাদিকদের মধ্যে গ্রুপিংয়ের সেতু বন্ধন হয়ে কাজ করেন, এমন নজির আমাাদের দেশে অসংখ্য।

কিন্তু বেচারা সাংবাদিকের যখন চাকুরিটি চলে যায় তখন আর কেউ ফিরেও তাকায় না। বরং ঐ গণমাধ্যমে যিনি নতুন নিয়োগ পান তাকে নিয়েই চলে তাদের মধুর চন্দ্রিমা। সুতরাং এ ক্ষেত্রে আমাাদের সাংবাদিকদেরকেই নিজেদের পেশাগত স্বার্থেই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং সকল লোভ লালসা ত্যাগ করে নিজের রুুটি রুজির এই প্রতিষ্ঠানটির মান মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে হবে।

আর বড় বড় মিডিয়ার দেশখ্যাতময় সম্পাাদকদের বলি,দয়া করে আপনারা মফস্বল সাংবাদিকতার উন্নয়ন বা সাংবাাদিকদের পেশাগত দিক নিয়ে জ্ঞান দিবেন না। জ্ঞান বিতরণ পরে করেন, আপনি আগে ঠিক হন। সবার আগে আপনি নিজের বিবেকের কাছে নিজে জবাবদিহী করেন। নিজের পঁচে যাওয়া বিবেকটাকে সুস্থ করুন। পরে মানবিক কাজে ব্যয় করুন।

আমাদের দেশে অনেকে বলেন, এখন হুজুরদের ওয়াজে তাসির হয় না। কারণ, হুজুররা ঘরে মাকে মেরে ওয়াজে এসে মাতৃ সেবার ওয়াজ করেন। যার কারণে মুসল্লীদের ঐ ওয়াজ শুনে আমল হয় না। ঠিক, আমাদের সম্পাদকরাও তেমন। তারা নিজেরা প্রতি নিয়ত নিজেদের সাংবাদিকদের উপর মানুষিক নির্যাতন করেন, সামান্য অজুহাতে চাকুরি খেয়ে ফেলেন । আবার কথিত এই সম্পাদকেরা যখন আদর্শ সাংবাদিক হওয়ার জ্ঞান দেন, সাংবাদিকতার নীতি ও রীতি নিয়ে কথা বলেন তখন আর তাদের কথা সাংবাদিকরা আমলে নেন না। কারণ, পবিত্র হাদিস শরীফেই আছে, ঐ কথা তুমি বলিও না , যেই কথা তুমি নিজে কর না।
সুতরাং , শুধু কুমিল্লা নয়, সারা দেশের সাংবাদিকদের বলি, আপনারা আর নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতে জড়াবেন না প্লিজ। নিজেদের ভুল গুলো টেবিলে বসে শুধরিয়ে নিন । নিজেদের পেশাগত দ্বন্দ্বের সংঘাতের সুযোগ তৃতীয় পক্ষকে দিবেন না । যতটুকু সম্ভব নিজেরা নিরপেক্ষ ও নির্মোহ সাংবাদিকতা করুন। একে অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ুন। ভালো মিডিয়ায় যাওয়ার সুস্থ প্রতিযোগিতা অবশ্যই প্রতিনিয়ত করবেন কিন্তু কাউকে ল্যাং মেরে নয়।

মহান আল্লাহ্ আমাদের বিবেক সত্যিকার অর্থে জাতির বিবেকে পরিণত করুন এবং তারও আগেও আমাদের সম্পাদকদের বিবেক সাংবাদিকদের কল্যানে কাজ করার তৌফিক দিন- এই কামনা করছি।

লেখক : সাংবাদিক,সংগঠক,কলামিষ্ট ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক। ০১৭১১-৩৮৮৩০৮ , sahajadaamran@yahoo.com