দীর্ঘায়ু হওয়ার চাবিকাঠি —————– মো.এমদাদুল হক ইয়াছিন  

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২ মাস আগে

অধিকাংশ মানুষ চান দীর্ঘায়ু হতে। দীর্ঘদিন ধরে এই ধরাধামে থেকে কর্তব্য করার সাথে সাথে মানসিক ইচ্ছাগুলিকে পরিপূর্ণতা দিতেই দীর্ঘায়ু হতে চান। মানুষের ইচ্ছার কোনও শেষ নেই। সেই ইচ্ছাগুলিকে পূরণ করার জন্য দীর্ঘায়ূ হতে চান। মানুষ মাত্রই মরণশীল, তবুও কেউ মরতে চান না, যদি না মানসিক বিপর্যস্ত হন। দীর্ঘায়ু হওয়াটা ভালো। বর্তমানে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে গেছে। তবুও সুপ্ত ইচ্ছা হল আরও কিছুদিন যদি সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকা যায় মন্দ কি? মানুষ  হল ভৌতিক বস্তু, যা প্রকৃতির পাঁচতত্ত্ব দিয়ে তৈরী এক আজব কারখানা। এর প্রত্যেকটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিয়ে আলোচনা করলে অবাক হতে হয়, এও সম্ভব ? শুধু তাই নয়, প্রত্যেকটি অরগান সুচারুরূপে তার কাজ করে যাচ্ছে বিরামহীন ভাবে। আবার মন হল আদি ভৌতিক বস্তু, যা দৃশ্যমান নয় অথচ এর ক্রিয়াকলাপ প্রত্যেকটি মানুষের কাছে বোধগম্য বা কখনও কখনও কোনও কোনও কারণে বা ঘটনা হয়ত বোধগম্য হয় না তবুও এই মন নামক অদ্ভুদ এক জিনিস প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয়, আমি আছি। বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলেন, তন আর মন এই দুটো সুস্থ থাকলে অষুধ আর ডাক্তারের দরকার কী?
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, নেতিবাচক ভাব ও ভাবনায় শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়া অতি দ্রুতলয়ে চলতে থাকে এবং ইতিবাচক ভাব ও ভাবনায় শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়া ধীরলয়ে চলতে থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাস যত ধীরলয়ে চলবে ততই আয়ু বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাবে। কারণ হল এই, স্বল্প আয়ু বা দীর্ঘায়ু নির্ভর করে শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়ার উপর, দিন মাস বছরের উপর নয়। আয়ু দীর্ঘ হবে না স্বল্প হবে তা নির্ভর করে শ্বাস-প্রশ্বাসের লয় কেমন ভাবে চলছে তার উপর। এর সাথে রোগও আয়ু ক্ষয় করে দেয়। আমাদের দেশ, সে মধুমেহ হোক। হার্টের অসুখ হোক, ক্যান্সার হোক সর্বক্ষেত্রে দারুণভাবে এগিয়ে রয়েছে। এই ধরনের রোগগুলি মানুষের জীবনকে ছোট করে দেয়। এই সমস্ত রোগ থেকে মুক্ত থাকার জন্য যোগা ও যোগের  সাহায্যে নেওয়া দরকার। আমেরিকার হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী টেলিভিশন  যারা দেখেন তাদের প্রতি ঘন্টায় মৃত্যুর ঝুঁকি আঠার শতাংশের বেশী বৃদ্ধি পাচ্ছে। টেলিভিশন দেখা মানে হার্টের ক্ষতি করা। ক্যান্সারের ঝুঁকি নয় শতাংশ এবং অন্যান্য রোগে মৃত্যুর হার এগার শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। গবেষক ডেভিড ডাস্টন বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে টিভির সামনে বসে থাকলে শরীরে সুগার ও চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়। তিনি বলেন, টিভির ক্ষেত্রে একটি বক্তব্যই প্রযোজ্য এবং তা হল-বন্ধ কর সুইচ, উঠে দাড়াও এবং হাটা শুরু কর (যদি সুস্থ থাকতে চাও)। যুক্তরাষ্ট্রে গবেষকরা জানিয়েছেন কম লবণ খান, আয়ু বাড়ান। কম করে তিন গ্রাম লবণ কম খেলে স্ট্রোক ও হৃদরোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। ক্যালিফোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাঃ কাস্টেন বিসিনস উমিঙ্গোও তার সহকর্মীরা জানিয়েছেন ধূমপান পঞ্চাশ শতাংশ কমালে যে উপকার পাওয়া যায় এতেও সেই উপকার পাওয়া যায়। মোটা হওয়ার প্রবণতাও কমে যায়। স্টামফোর্ড স্কুল অব মেডিসিন থেকে একটি সমীক্ষায় ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে এতে বলা হয়েছে। যারা জগিং (দ্রুত হাঁটা) করেন, তারা দীর্ঘায়ু হন এবং হৃদরোগ ও স্নায়ুজ রোগ, সংক্রমণ এবং ক্যানসারজনিত মৃত্যু কম ঘটেছে গবেষকরা কয়েকটি রানিংক্লাবের বিশাল অংশের মানুষের তথ্য সংগ্রহ করেন। এদের সকলের বয়স ছিল পঞ্চাশ এবং তদুর্ধ। এই তথ্য বলছে যে যারা জগিং করে না তাদের মৃত্যুর হার চৌত্রিশ শতাংশ বেড়ে গেছে। আর যারা করেন তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে মাত্র পনের শতাংশের। নেশা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা দরকার। ‘নেশা কর এবং আমার সাথে মর”। নেশা আয়ু ক্ষয় করে, মৃত্যুর পরওয়ানা নিয়ে আসে। তাই নেশায় নয় নেশায় সে মদ হউক আর পান, সিগারেট, খৈনি হোক সব বর্জন করা দরকার। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত “নার্সেস হেলদি স্ট্যাডির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষকরা সমীক্ষা করে জানিয়েছেন, দীর্ঘায়ুর জন্য কখনো ধূমপান না করা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া (সব্জী, ফল খাওয়া) এবং ওজন সীমিত রাখার জন্য প্রচেষ্টা রাখা দরকার। বাক্সংযম অর্থাৎ সাইলেন্সে থাকার যারা  অভ্যাসে অভ্যাসী  তারাও দীর্ঘায়ু হতে পারবেন।
শাকাহারী খাদ্য, সংযম জীবন দীর্ঘায়ু হতে সাহায্য করে। আয়ু বাড়াতে স্বেচ্ছাসেবী হোন, একটি নতুন গবেষণার  রিপোর্ট বলছে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যারা বিভিন্ন সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন তাদের মধ্যে অকাল মৃত্যুর হার কম। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার এই অভিনব সমীক্ষা পয়ষট্টির বেশী বয়সী মানুষদের নিয়ে করা হয়। দেখা যাচ্ছে যারা টাকার বিনিময়ে কিছু করেন, তাদের চেয়ে যারা স্বেচ্ছাসেবা দানা করেন তারা শারিরীক ও মানসিক দিক বেশী সুস্থ থাকেন তা বটেই, তারা দীর্ঘায়ু হন।
আয়ু বাড়াতে গান করুন, গান শুনলে হবে না, গান গাইতে হবে তাহলে শরীর তরতাজ থাকবে। গবেষনায় জানা গেছে গান গাইলে শরীর চর্চার মতোই ভালো ফল দেয়। এটা একধরনের অ্যারোবিক এ্যক্সারসাইজ। এর ফলে শরীরে বেশি অক্সিজেন প্রবেশ করে। তাছাড়া সুরতরঙ্গ যা শরীর থেকে উত্থিত হয়, গান গাইবার সময় তা নার্ভ সিস্টেমের ওপরও ভালো কাজ করে। তাই মানসিক উপসর্গ অবসাদ প্রভৃতির পক্ষেও কার্যকর। সুতরাং গান করুন, সবাইকে নিয়ে বা নিভৃতে। গান গেয়ে ভালো থাকুন, দীর্ঘায়ু হন।
মেডিটেশন দীর্ঘায়ু হতে  সাহায্য করে, প্রথমে দেখা দরকার মেডিটেশনে কি কি উপকার হয় এবং এই উপকারগুলি কী ভাবে দীর্ঘায়ু হতে সাহায্য করে। ০১) মেডিটেশন হল মনের ব্যায়াম। যার দ্বারা টেনশন, ডিপ্রেশন ও দুঃচিন্তার মতো ভয়ানক ক্ষতিকারক মানসিক রোগগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
০২)  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ৮০-৮৫ ভাগ রোগের কারণ হল মন। রোগকে নিয়ন্ত্রন করেতে হলে মনকে শক্তিশালী করা দরকার। তার জন্য মেডিটেশন হল একমাত্র পথ যা মনকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। ০৩) ভয়, আতঙ্ক, ক্রোধ ভয়ানক ক্ষতিকারক যা জীবন কে যে কোন সময়ে সমাপ্তি এনে দিতে পারে। মেডিটেশন এই সব ভয়, আতঙ্ক, ক্রোধকে জয় করতে সাহায্য করে। ০৪) মেডিটেশন করলে মন শান্ত ও অন্তর্মুখী হয়ে যায় ফলে বহু রোগ নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং সুস্থতা হাতের মুঠোর এসে যায়। দীর্ঘায়ু হওয়ার জন্য যা বিশেষ দরকার। ০৫) মেডিটেশন করলে উত্তেজনা কমে যায় ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়া অতি মৃদুগতিতে চলতে থাকে যা দীর্ঘায়ু হতে সাহায্য করে। ০৬) মেডিটেশনে,  হার্টবিট-পালসরেট-সিসটোলিক বিপি ও ডাইএসটোলিক বিপি নরম্যান থাকে ফলে দীর্ঘায়ু হতে সাহায্য করে। ০৭) মেডিটেশন গভীর নিদ্রার সহযোগী। নিদ্রা ভালো না হলে অহেতুক অষুধ নিতে হয় এবং মানসিক ও শারীরিক অসন্তলনের কারণ হয়ে দেখা দেয়। ফলে অসুস্থ হয়ে জীবন কাটাতে হয়। সেইক্ষেত্রে মেডিটেশন ডেলটা স্টেজ এনে দিতে সাহায্য করে। ফলে কর্মক্ষমতা যেমন বেড়ে যায়, সুস্থতাও নিয়মিত ধর্ম হয়ে দেখা দেয় তেমনি দীর্ঘায়ু হতে সাহায্য করে। ০৮) মেডিটেশন শারীরিক বিক্রিয়া কে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। ফলে ব্যাভিচারিতা, অনৈতিকতা ইত্যাদি সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকা যায়। যার নীট্ ফল সুস্থ জীবন ও দীর্ঘায়ু। ০৯) নেশামুক্ত জীবনের চাবিকাঠি হল মেডিটেশন। মেডিটেশন নেশামুক্ত হতে বা নেশা থেকে মুক্ত থাকতে সাহায্য করে। নেশা মুক্ত জীবন দীর্ঘায়ু হওয়ার চাবিকাঠি। ১০) এইডস ও ক্যান্সার হল মানুষ ঘাতক রোগ। এই রোগের মধ্যে এইডসকে সহজেই দুরস্ত করে রাখা যায় আর ক্যান্সার যেহেতু সঠিক অ্যান্সার নেই সেইহেতু এই ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করার জন্য চিকিৎসার সাথে সাথে  মেডিটেশনও অভ্যাস করা দরকার। এই মেডিটেশন করলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে সফলতা পাওয়া যায়। মনের শক্তিতে অনেক কিছু জয় করা যায়। ১১) মেডিটেশন কথাটা এসেছে লাটিন শব্দ মেডেটরি থেকে যার অর্থ হল সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ। আরোগ্য লাভ মানে দীর্ঘায়ুর পথে এগোনো। ১২) মেডিটেশন ভোগের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। ভোগ বাড়লে রোগ বাড়ে। ভোগকে কমানোর জন্য মেডিটেশন হল অন্যতম পথ। ১৩) মেডিটেশন ভাব ও ভাবনাকে ইতিবাচকতায় নিয়ে আসে। উৎসাহ উদ্দীপনাকে বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করে যা দীর্ঘায়ু হওয়ার পক্ষে অন্যতম চাবিকাঠি। ১৪) আনন্দে খুশীতে থাকলে দীর্ঘায়ু হওয়া যায়। রোজ হাসুন, মন খোলে হাসুন। হাসি-খুশির মতো এমন ভিটামিন আর পাওয়া যায় না (বাজারে)। হাসি-খুশীতে থাকতে হলে মেডিটেশন ধন্বতরি-র মতো কাজ করে। ১৫) মনের এমন কিছু ক্রিয়া বিক্রিয়া আছে যা বৈদ্য, ডাক্তার, প্যাথোলজি জানতে বা জানাতে পারেনা। যিনি মেডিটেশন করেন তিনি অনুভব করতে পারেন এই ক্রিয়া বিক্রিয়াকে। অনুভব হলেই সমাধান করা যায়। মনকে জয় করা যায়। মনকে জয় করা মানে দীর্ঘায়ুর পথে এগিয়ে যাওয়া।
অবশেষে দীর্ঘায়ু হওয়ার পথ জানানো যায় কিন্তু দীর্ঘায়ু কাউকে দেওয়া যায় না। নিজেকেই অর্জন করতে হয়। নিখরচায় এতো ভালো ব্যবস্থাগুলি ব্যবহার করে দেখতে অসুবিধা কোথায়? অসুবিধা হল উদ্যোগের অভাব।্ওই যে কথায় বলে, পুকুরে নামবো, সাঁতার কাটবো তবুও চুল ভিজাবো না, এমন অবস্থা চলছে চলবে।
রোজ সকাল-বিকাল নিয়ম করে যোগাযোগের অভ্যাস করা দরকার এবং উপরের গবেষনা লব্ধ ব্যবস্থাগুলিকেও যতটা সম্ভব পালন করা দরকার।
দীর্ঘায়ু হওয়া কোন অভিশাপ নয় বরং সুস্থ দেহে সুস্থ মনে দীর্ঘ আয়ু পাওয়া আশীবার্দ স্বরূপ নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য ও দেশের জন্যও বটে।
সারাজীবনতো নিয়েই গেলাম, এখন (প্রবীণ বয়সে) দেওয়ার সময়। তাই বাঁচতে হবে, বেশীদিন বাঁচতে হবে দেওয়ার জন্য (নেওয়ার জন্য নয়)।
সব কথার শেষ কথা মাদার টেরেসার এই স্বর্নিম উক্তি যা আমাদের সবার জন্য দীর্ঘায়ু হওয়ার অন্তিম চাবিকাঠি,
“আমরা ওষুধ দিয়ে শারীরিক রোগ
ভালো করতে পারি,
কিন্তু একাকিত্ব, হতাশাও
নিরাশাকে
ভালো করতে পারে কেবলমাত্র
ভালোবাসা।
পৃথিবীতে অনেক লোক এক
টুকরো
রুটির জন্য মরে,
কিন্তু একটু ভালোবাসার অভাবে
আরও অনেক লোক মারা যায়।”
ভালোবাসুন নিজেকে, পরিবার পরিজনকে, সব মানুষকে, প্রাণীদেরকে, প্রকৃতিকে এবং সৃষ্টিকর্তাকে। সুস্থ থাকুন, আনন্দে থাকুন, দীর্ঘায়ু হউন ও দীর্ঘায়ু হওয়ার প্রেরণা দিয়ে মহৎ কাজ করুন। (আমার এই লেখাটি ময়নামতি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সাবেক অধ্যক্ষ, বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ কবি ডা. তৃপ্তীশ চন্দ্র  ঘোষকে উৎসর্গ করলাম)।
লেখকঃ পিপি, রোটার‌্যাক্ট ক্লাব অব কুমিল্লা।
মোবাইলঃ ০১৮১৩-৫৯০৩০৪