দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন স্থগিত: ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে নির্মানাধীন প্যান্ডেল:

অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

সৈয়দ খলিলুর রহমান বাবুল, দেবিদ্বার : জাতীয় সংসদের মেম্বারস ক্লাবে এমপি-উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মারামারিকে কেন্দ্র করে দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন স্থগিত করেছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। রোববার চট্রগ্রাম বিভাগীয় দায়ীত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এমপির সাথে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে কুমিল্লা উত্তর জেলা সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক সহ নেতৃবৃন্দদের এক জরুরী বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা যায়। আগামী ২১ জুলাই পূর্ব নির্ধারিত তারিখে সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি ছিলো প্রায় শেষ পর্যয়ে। সম্মেলন স্থগিত করায় নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে দেবিদ্বার সদরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। দীর্ঘ ২৬ বছর পর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নেতা-কর্মীরা চাঙ্গা হয়ে উঠলেও শুরু থেকেই বিরাজমান দ্বন্দ্বের কারনে সম্মেলন বাস্তবায়ন নিয়ে ছিলো অনিশ্চয়তা।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, আগামী ২১ জুলাই দেবিদ্বার উপজেলা সম্মেলনের তারিখ নির্ধারিত করা হয়েছিলো। ওই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে গত শনিবার (১৬ জুলাই) জাতীয় সংসদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় পার্লাম্যান্ট মেম্বারস ক্লাবে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় উপজেলা সম্মেলনের পূর্বে বাকি থাকা এলাহাবাদ ও গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়নের আ’লীগের কমিটি ঘোষণার ব্যাপারে সকলে সম্মতি প্রকাশ করেন। এ সময় কুমিল্লা (উঃ) জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক হাজী রোশন আলী মাষ্টার গুনাইঘর উত্তর ও এলাহাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের কমিটি ঘোষণা করে। ওই সময় কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল কমিটি মানিনা বলে ঘোষণা দেয়। পাশে বসা দেবিদ্বার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ কুমিল্লা উত্তর জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আবুল কালাম আজাদ বলেন, কমিটি সুন্দর হয়েছে। তখন এমপি সাহেব উপজেলা চেয়ারম্যানকে ঘুসি-কিল মারতে মারতে মেঝেতে ফেলে দেয়। চেয়ারম্যান সাহেব উঠেও এমপির ওপর চড়াও হন।
এসময় পাশে থাকা জেলা সভাপতি ম. রুহুল আমিন দাড়িয়ে থেকে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন। পরে বৈঠক ছেড়ে জেলা ও উপজেলার নেতৃবৃ›ন্দ বেড়িয়ে গেলে জেলা সভাপতি ম. রুহুল আমিন তাদের পেছনে পেছনে এসে সবাইকে পুন:রায় বৈঠকে সমবেত হওয়ার আহবান জানাতে গেলে ম.রুহুল আমিনের সাথে নেতাদের ধাক্কা ধাক্কি হয়। রোববার বিকেল সাড়ে ৩টায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আওয়ামীলীগ কুমিল্লা উত্তর জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক ও আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আলহাজ¦ মোঃ হুমায়ুন কবির।
এ ঘটনায় রোববার চট্রগ্রাম বিভাগীয় দায়ীত্বপ্রাপ্ত আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এমপির সাথে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে কুমিল্লা উত্তর জেলা সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এক জরুরী বৈঠক হয়। বৈঠকে আগামী ২১ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলন স্থগিত ঘোষণা করে ২১ জুলাই ঢাকা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সভা ডাকা হয়। সম্মেলন স্থগিত করায় নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে দেবিদ্বার সদরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
এ দিকে খোঁজ নিয়ে জানাযায়, দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামীলীগের আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বে ২৬ বছরেও সম্মেলন করা সম্ভভ হয়নি। দেশ স্বাধীনের পর মাত্র ৩টি পূর্ণঙ্গ কমিটি দিয়ে দল পরিচালিত হয়ে আসছে। এক সময় বার বার সম্মেলন করার প্রস্তুতি নিলেও (মামা-ভাগ্নের গ্রুপিং) অর্থাৎ সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও বর্তমান কুমিল্লা (উঃ) জেলা আ’লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি এবিএম গোলাম মোস্তফা এবং ওনার ভাগ্নে সাবেক উপ-মন্ত্রী, এমপি ও বর্তমান আ’লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য এএফএম ফখরুল মুন্সীর দলীয় আধিপত্তের দ্বন্দ্বে সম্মেলন হয়নি। পুরাতন কমিটি বিলুপ্ত করে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির মাধ্যমে একাধিকবার সম্মেলনের তারিখ করে এবং বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করেও সম্মেলন করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে সাবেক উপ-মন্ত্রী, এমপি ও বর্তমান আ’লীগ কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য এএফএম ফখরুল মুন্সীর ছেলে স্থানীয় এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী এবিএম গোলাম মোস্তাফা, সাধারন সম্পাদক সম্পাদক রোশন আলী মাস্টার, সাংগঠনিক সম্পাদক ও দেবিদ্বার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ চারটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। যার কারণে তিন বছরের উপজেলা কমিটি চলছে এখন ২৬ বছর ধরে। নেতৃত্বে আসতে পারছে না অনেক সম্ভাবনাময়ী তরুণ। ক্ষমতাসীন দল হওয়া সত্ত্বেও এখানে নেই কোন দলীয় কার্যালয়। এই উপজেলায় সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ২ আগস্ট। সেই সম্মেলনে মো. জয়নুল আবেদীনকে সভাপতি ও একেএম মনিরুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক করে ৫১ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়।

এই চলমান ২৬ বছরের ৫১ সদস্যের কমিটির মধ্যে সভাপতি, সহ-সভাপতি, দপ্তর সম্পাদক সহ মারা গেছেন ১৪ জন, দল ত্যাগ করে বিএনপিতে যোগদান করেছেন ২জন, আ’লীগ উপজেলা কমিটির সম্পাদক ও সদস্য ২৮ জনকে কেউ চেনেননা ওরা সবাই নিস্ক্রীয় ও প্রবাসী। বাকীদের মধ্যে ৪/৫ জন সক্রিয় রয়েছেন। বর্তমানে এই কমিটি নামে থাকলেও কার্যত কোন কাজে নেই। এ নিয়ে খোদ ক্ষমতাসীন দলেই ক্ষোভ বিক্ষোভের অন্ত নেই।
দেবিদ্বার থানার ওসি কমল কৃষ্ণ ধর জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে দেবিদ্বার সদরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া গতকালের ঘটনায় কোন পক্ষই থানায় অভিযোগ করে নাই।
এ বিষয়ে দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মাস্টার জানান, এ ঘটনার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত সম্মেলন স্থগিত করার কেন্দ্রীয় নির্দেশনা পেয়েছি।
এ ব্যাপারে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক আলহাজ্ব রোশন আলী মাস্টার জানান, ২১ তারিখে সম্মেলন হচ্ছেনা। জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে এমপি ও চেয়ারম্যানের মাঝে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুরাহা শেষে সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সম্মেলন স্থগিতের সত্যতা নিশ্চিত করে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ম. রুহুল আমীন জানান, দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের ২১ তারিখের সম্মেলন স্থগিত রেখে ওই দিন সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সভা আহবান করা হয়েছে। ওই সভায় পরবর্তী করনীয় নির্ধারন করা হবে।