পাঞ্জাবীদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে ৩৫০জন যুবককে প্রশিক্ষণ দেই

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অণুগল্প - ২৮
শাহাজাদা এমরান।।
প্রকাশ: ২ সপ্তাহ আগে

যুদ্ধের যাত্রা যখন শুরু :
১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ রাতে আমি বঙ্গভবনের গেইটে ডিউটিতে ছিলেন। রাত ৮টায় বঙ্গভবনে প্রথমে প্রবেশ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ও পরে পাকিস্তান পিপলস পার্টির সভাপতি জুলফিকার আলী ভুট্টো। এখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। রাত ৯টার কিছু পরে বঙ্গবন্ধুকে একটি আর্মির গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় সোজা তেজগাঁও বিমানবন্দরে। এখান থেকেই তাকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বঙ্গভবন থেকে বের হন জুলফিকার আলী ভুট্টো। বঙ্গবন্ধুকে যখন বঙ্গভবন থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ঠিক তার পেছনে পেছনে কয়েকটি গুলির আওয়াজ হয়। বঙ্গভবন থেকে ভিআইপিরা যাওয়ার পর ডিউটি থেকে আমরাও চলে আসি।
২৫ মার্চ রাতে কনট্রোল রুমে হঠাৎ আমাদের এক বাঙালি অফিসার ওয়ালেসের মাধ্যমে বার্তা দিয়ে বলেন, আপনারা আজ সাবধানে থাকবেন। যে কোন মুহূর্তে আর্মিরা আক্রমণ করতে পারে। কনট্রোল রুমে তখন ১ প্লাটুন আর্মি,১ প্লাটুন ইপিআর ও ৩ প্লাটুন পুলিশ ছিল। আমি ছিলাম পুলিশের এক প্লাটুনের দায়িত্বে। ইতিমধ্যে আর্মির এক অফিসার এসে বলেন,তোমরা সবাই অস্ত্র জমা দিয়ে ওপরে এসো। উপরে ছিল আর্মির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তার কথায় ইপিআরের সবাই অস্ত্র জমা দিলেও আমরা পুলিশের কেউ অস্ত্র জমা দেইনি। আমরা বলেছি,আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়া আমরা অস্ত্র জমা দেব না। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের এক পুলিশ কর্মকর্তা ওপর থেকে নিচে নেমে এসে বলেন, তোমরা যে যেভাবে পার এখান থেকে দ্রুত সটকে পড়। নতুবা বিপদ হবে। এ কথা শুনে আমরা দুই প্লাটুন পুলিশ রাজার বাগ পুলিশ লাইনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। এরই মধ্যে দেখি আমাদের না পেয়ে আর্মি রাস্তায় এলোপাতাড়ি গোলাগুলি শুরু করেছে। আমরা শান্তিনগর এসে দেখি আর্মিরা রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ চালিয়েছে। তখন আমরা সেখানে না গিয়ে যার যার মতো করে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে রাত পৌনে ১২টায় নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাই। এ দিন সমস্ত রাতে গোলাগুলি চলে । সেনাবাহিনী বিভিন্ন ব্যারাকে আগুন দেয়। রাতেই তারা রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স দখল করে নেয়। এতে অসংখ্য হতাহত হয়। ২৬ মার্চ কারফিউ জারি করা হয়।আমরা পোশাক পরিবর্তন করে ভোরে সদর ঘাট চলে আসি। কিন্তু এখানে এসেও দেখি গুলির আওয়াজ। আমাদের সামনেই ৩জন পোশাকধারী পুলিশের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখি। এভাবে দুই দিন অনেক কষ্ট করে বাড়িতে আসি ২৭ মার্চ সন্ধ্যায়।

প্রশিক্ষণ যখন শুরু :
যুদ্ধের একটা পর্যায়ে এসে আমাকে অম্পিনগর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন আমাদের ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন ভারতীয় সেনা কর্নেল মজুমদার। একেবারে নভেম্বর মাস পর্যন্ত এই অম্পিনগর ক্যাম্পে আমি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। নভেম্বর মাসের শেষ দিকে আখাউড়ার একটি সম্মুখ যুদ্ধে আমি অংশ নেই। এই যুদ্ধে আমাদের কমান্ডার ছিলেন নায়েব সুবেদার মোহাম্মদ হোসেন।

যুদ্ধের অনুপম গল্প :
২৮ মার্চ সকালে ঘুম থেকে উঠেই জানতে পারি দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জে পাকবাহিনীর হাতে অসংখ্য নিরীহ মানুষ নিহত হয়। এ কথা শুনে আমি আর আমার চাচাতো ভাই আর্মির সিগন্যাল ম্যান আমির খান জাফরগঞ্জে যাই। গিয়ে দেখি হানাদার বাহিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়া দিক থেকে আসতে আসতে৭/৮ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে মসজিদে আশ্রয় নিয়েছে। এলাকার মানুষ চর্তুদিকে তাদের ঘিরে রেখেছে। তখন আমি,আমির খান ও বুড়িচং থানার এক পুলিশ কনস্টেবল মিলে এলাকাবাসীকে সংগঠিত করে মসজিদে আক্রমণ করি। আমরা মসজিদের ছাদ ফুটো করে মরিচের গুঁড়া,কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেই। এক পর্যায়ে তারা বাধ্য হয়ে আধা মরার মত বারান্দায় বের হয়ে এলে আমরা তাদের আক্রমণ করে মেরে ফেলি। এখানে তারা ৭/৮জন ছিল। এরপর তাদের কাছ থেকে অস্ত্রগুলো নিয়ে আমি আর আমির খান ব্রাহ্মণপাড়া নিজ বাড়িতে এসে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলি। আমরা হানাদার বাহিনীর অস্ত্র দিয়ে ১৫দিন প্রায় সাড়ে তিনশ যুবককে প্রশিক্ষণ দেই।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সেলিম খান আরো বলেন, আমরা হানাদার বাহিনীর অস্ত্র দিয়ে ১৫দিন প্রায় সাড়ে তিনশ যুবককে প্রশিক্ষণ দেই। স্থানীয় রাজাকারদের মাধ্যমে হানাদার বাহিনী আমাদের ক্যাম্পের কথা জেনে গেলে আমরা এই সাড়ে তিনশ যুবক নিয়ে ভারতে যাই। সেখানে আমরা ২নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টার মেলাঘরে উঠি। মেলাঘরে উঠার আগে আমরা কয়েকদিন জঙ্গলেও ছিলাম খেয়ে না খেয়ে। পড়ে আমাদের এমপি আমির হোসেন সাহেবের সহযোগিতায় আমরা ক্যাম্পে সুযোগ পাই। কিছু দিন থাকার পর ক্যাপ্টেন হুমায়ুনকে প্রধান করে আমাদের একটি কোম্পানি গঠন করা হয়।

প্রথম যুদ্ধের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের প্রথম যুদ্ধ হয় ফেনীর ছাগলনাইয়ায়। এপ্রিলের শেষ দিকে অথবা মে মাসের প্রথম দিকে হবে। এখানে রেজু মিয়া নামে একটি ব্রিজ আছে। ব্রিজের উত্তর দিকে ছিলাম আমরা আর তারা ছিল দক্ষিণ দিকে। এখানে এত বড় একটি সম্মুখ যুদ্ধ হবে আমরা ভাবতেও পারিনি। আমাদের সাথে মুজাহিদের একটি টিমও ছিল। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া যুদ্ধ বিকালে গিয়ে শেষ হয়। এই যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর ১৫ থেকে ২০ জন নিহত আর আমাদের ৩ জন মুজাহিদ শহীদ হয়।পরে তাদের পরাজিত করে আমরা এখানে একটি ডিফেন্স গড়ে তুলি।
এই পরাজয় ভুলতে পারেনি হানাদার বাহিনী। কিছুদিন পর তারা আরো শক্তিশালী হয়ে আমাদের ওপর আক্রমণ করে। তখন আমরা পিছু হঠতে বাধ্য হই। কারণ, আগেই আমরা জানতে পেরেছিলাম, আমাদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সৈনিক নিয়ে তারা আক্রমণ করতে এসেছে।
পরিচয় :
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: সেলিম খান । পিতা দেলোয়ার আলী খান,মাতা আছমাতুন নেছা। ১৯৪৪ সালের জুন মাসের ১ তারিখে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার কল্পবাস গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিন ভাই ও ২ বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তান পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন।