প্রশাসন নির্বিকার – সদর দক্ষিণের দূর্লভপুরে বাহাদুরের নেতৃত্বে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে ফসলি জমির মাটি

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২ মাস আগে

#  ধানের জমিকে মাটিখেকোরা পরিণত করেছে পুকুরে

#  মাটি লুটের সময় অবস্থায় নেয় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা

#  বাধা দিলে হত্যার হুমকি

আবদুর রহমান।।
কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলায় ফসলি জমির মাটি ‘ডাকাতি’ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। মাটি লুট করে নেওয়ার সময় ফসলি জমির আশ-পাশে অবস্থান নেয় একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। আর তাদের পাহারায় রাত ১১টা থেকে ভোর পর্যন্ত ফসলি জমির মাটি লুট করে মাটিখেকোরা। এ সময়ের মধ্যে জমির মালিকদের কেউ তাদের বাধা দিলে দেওয়া হয় হত্যার হুমকি। এভাবেই মাটিখেকোরা জমির মাটি লুট করে সেখানে বানাচ্ছে পুকুর |

উপজেলার পশ্চিম জোড়কানন ইউনিয়নের দুর্ল্লভপুর গ্রামের ফসলি মাঠে এভাবেই লুট হয়ে যাচ্ছে কৃষি জমির উর্বর মাটি। বেপরোয়া মাটিখেকোদের যেন কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ- বিষয়টি তারা প্রশাসনকে বারবার জানালেও এ ঘটনায় এখনো তেমন কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যার কারণে জমির মালিকদের কোন প্রকার জিজ্ঞাসা না করেই কেটে নেওয়া হচ্ছে মাটি। সর্বশেষ রোববার রাতভর দুর্ল্লভপুর গ্রামের ফসলি মাঠে ‘লালমাই ফুটওয়্যার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ৪৬ শতক জমির মাটি ‘ডাকাতির’ ঘটনা ঘটেছে।

এ নিয়ে গত ২৫ এপ্রিল সোমবার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন লালমাই ফুটওয়্যারের সহকারী মহা ব্যবস্থাপক ( প্রশাসন) একএম সানাউল হক। তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেন যে, সদর দক্ষিণ উপজেলার দূর্লভপুরের মাঠে জমি থেকে বাহাদুর,মো. মিজান ও মো. ফারুকসহ ২০/২৫ জনের একটি মাটি দস্যু গ্রুপ প্রতিষ্ঠানের ৪৬ শতক জমির মাটি কেটে নিয়ে যায়।তারা বাধা দিলে অস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাসীরা হামলা করে।

সোমবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দুর্ল্লভপুরের মাঠে ফসলি জমির কোন অস্তিত্ব নেই। ওই মাঠের ৯৫ শতাংশের বেশি জমির মাটি এরই মধ্যে লোপাট করে নিয়েছে মাটিখেকোরা। সবচেয়ে বেশি মাটি লোপাট করা হয়েছে এফআইসিএল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের। শুধুমাত্র ফসলি জমি-ই নয়, মাঠের মধ্যখান দিয়ে বয়ে যাওয়া বোয়ালজোর খালের পাড়সহ ভেতর থেকেও মাটি লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব যেন দেখার কেউ নেই!
স্থানীয় এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত দুর্ল্লভপুরে কোন মানুষের বসতি নেই। পুরো গ্রামটিই ফসলের জমি। আগে এখানে ব্যাপক চাষাবাদ হতো। কিন্ত এখন এখানে কৃষি জমির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে মাটিখেকোরা এতোটাই বেপরোয়া হয়ে পড়েছে যে- তারা মাটি কেটে নিতে কারও অনুমতি নেওয়ার কথাও ভাবেন না। বলা চলে অস্ত্রের মুখে মানুষকে জিম্মি করে ফসলি জমির মাটি ডাকাতি হচ্ছে দিনেরাতে।

স্থানীয় লালবাগ গ্রামের দরিদ্র কৃষক আবদুল গণি মিয়া প্রতিদিন সকালে জমিতে এসে চোখের পানি ফেলেন আর আল্লাহর কাছে মোনাজাত করেন তার কৃষি জমি কেটে একেবারে সাবার করার জন্য।

স্থানীয় এলাকার কৃষক আবদুস সাত্তার বলেন, আমার বয়স এখন ৭০ বছর। জীবনে অনেক কিছু ডাকাতি হতে দেখেছি। তবে এভাবে কৃষি জমির মাটি ডাকাতি হতে দেখিনি। মাটিখেকোরা খুবই বেপরোয়া। তাদের বাধা দিলে কৃষকদের উপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। এফআইসিএল কোম্পানির মালিক এখন পলাতক বা জেলে রয়েছেন। এ সুযোগে তাদের অন্তত ৫০০ শতক জমির মাটি লোপাট করে নিয়েছে তারা।

লালমাই ফুটওয়্যারের নৈশ প্রহরী অহিদুর রহমান বলেন, দুর্ল্লভপুরে আমাদের কোম্পানির কৃষি প্রজেক্ট রয়েছে। প্রজেক্টের পাশে দুইভাগে ছিলো ওই ৪৬ শতক কৃষি জমি। রোববার রাত ১১টার দিকে পশ্চিম জোড়কানন ইউনিয়নের গঙ্গাঁনগর সুর্বণপুর গ্রামের তাজুল ইসলামের ছেলে বাহাদুর ইসলামের নেতৃত্ব একদল লোক আমাদের কোম্পানির মালিকানাধীন জমির মাটি লুট করেছে। বাহাদুরের সহযোগী হিসেবে সেখানে ছিলো পাশের ভাটপাড়া গ্রামের মোকারম আলীর ছেলে মো.মিজান ও ফারুক। তারা ভেকু দিয়ে মাটি কেটে জমিতে পুকুরের মতো গর্ত করেছে। এরপর এসব মাটি ড্রামট্রাকে করে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেছে।

অহিদুর রহমান আরও বলেন, আমি তাদের বাধা দিতে গেলে তারা আমাকে হত্যার হুমকি দিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে বলে। এ সময় তারা আমাকে অস্ত্রের ভয় দেখায়। পরে আমি বিষয়টি মালিক পক্ষের লোকদের জানাই।

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক মো.জসিম উদ্দিন বলেন, গত প্রায় ২০ দিন আগেও বাহাদুর ইসলামের নেতৃত্বে আমাদের একটি জমির ১০ শতক কেটে পুকুর বানানো হয়েছে। পরে আমরা এনিয়ে যোগাযোগ করলে বাহাদুর বলেছে- ভুলে আমাদের জমি কেটে ফেলেছে, আর এমন হবে না। এরই রোববার রাতে আমাদের পুরো জমির মাটি লুটে নিয়েছে তারা। আমরা এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবো।

উপজেলার পশ্চিম জোড়কানন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসমত উল্লাহ হাসু বলেন, তারা দিনেরাতে কৃষি জমির মাটি ডাকাতি করছে। কাউকে পাত্তা দেয় না মাটিখেকোরা। আমিও দীর্ঘদিন ধরে এসবের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছি। আমার দাবি হলো- প্রশাসন যেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত বাহাদুর ইসলাম। তিনি বলেন, আমি গত এক সপ্তাহের মধ্যে এখানে কোন মাটি কাটিনি। এর আগে একজনের কাছ থেকে কিনে কিছু মাটি এনেছি। আমি ছাড়াও এখানে মাটি কাটার কয়েকটি গ্রুপ আছে। এসব কাজ অন্য কেউ করতে পারে। আমার বিরুদ্ধে করা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার কোন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রুপ নেই।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শুভাশিষ ঘোষ বলেন, আমরা কিছুদিন আগেও ওই এলাকায় এসব মাটিখেকোদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছি। তবে জমির মালিকদের কেউ অভিযোগ না করায় তাদের বিরুদ্ধে তখন মামলা হয়নি। এখন যাদের মাটি কেটে নিয়েছে- আমি তাদের থানায় নিয়মিত মামলা করার পরামর্শ দিচ্ছি। এছাড়া আমরাও শিগগিরই এসবের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান পরিচালনা করবো।