বাজার ব্যবস্থায় লাভালাভের প্রতিযোগিতা মূখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে

আলী আকবর মাসুম
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৮ মাস আগে

দেশের অর্থনীতিক ব্যবস্থার রীতি-নীতির বিপরীতে কয়েক ভাবে বৈষম্য ও সামাজিক বিরোধ যেমন বেড়েছে, তেমনি একথাও সত্যি বাংলাদেশ স্বল্প আয়ের দেশ থেকে স্বল্পন্নোত দেশে উন্নীত হয়েছে আরো অনেক আগেই । সার্বিক ভাবে এমন উন্নতি কতটুকু ‘মানসম্মত’ ভাবে হয়েছে এমন প্রশ্ন থাকলেও বলতে হয়, আমাদের দেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ বা উন্নয়নশীল দেশের অবস্থান থেকে দারিদ্র্যমুক্ত ও একটি উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জনের লক্ষে পথ চলতে শুরু করেছে। এমন ধারাবাহিক অগ্রসরতার মধ্যদিয়েই এই দেশ বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গে উন্নতসব দেশের কাছেও আগ্রহের গুরুত্বপূর্ন জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে । ফলে এখন শুধু দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ছাড়াও উন্নতির অন্যান্য প্রতিটি বিষয়ও প্রায় একই সমান গুরুত্বের অংশে পরিনত হয়েছে। আর সেসব দিকগুলো সঠিক মাত্রায় এগিয়ে নেওয়া ও তার সত্যিকার উন্নতির জন্য দেশের স্থিতিশীলতার পাশাপাশি গণতন্ত্র ও সুশাসন সবার আগে নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো কারনে বা কোনো দিক থেকে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই বললেই চলে । এক্ষেত্রে সমাজ, রাজনীতি ও দেশের শাসন ব্যবস্থায় একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মানুষের মাঝে মনুষ্যত্ব ও মানবিকতার চর্চা এবং মানবাধিকারের সার্বিক অবস্থার যতটা উন্নতি করা যাবে তারমধ্য দিয়ে দেশে গনতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথও ততটাই প্রসস্থ হবে । এরকম এক একটি ক্ষেত্রে স্বাধীনতার এত বছরের মধ্যে দেশ ও দেশের মানুষ যেভাবে যতটা আগ্রহী ও অগ্রসর হয়েছে তার প্রেক্ষিতে বলা যায় আশা, প্রত্যাশার সঙ্গে প্রচেষ্টার একটি ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে । অর্থাৎ দেশের রাজনীতি ও রাজনীতিক দল ছাড়াও নাগরিক বা নাগরিক সমাজের একটি শিক্ষিত ও সচেতন অংশ দেশে গণতন্ত্র, সুশাসন এবং মানবাধিকারের ধারণাকে পরিশুদ্ধ ভাবে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষে চিন্তা ও মতের কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও এসবের উন্নতিও একভাবে না একভাবে প্রায় সবাই চান । তারপরও বলতে দ্বিধা নেই, ব্যক্তি বা শ্রেণি স্বার্থ কেন্দ্রীক পুঁজি ও শিল্প-কারখানার বিকাশ ও আর্থিক উন্নতির পথ-পন্থার সুযোগ বজায় থাকায় দেশ, মানুষের মৌলিক এবং গুণগত উন্নতির মূখ্য বিষয় গুলো নানা বাধা ও প্রতিকূল অবস্থার মাঝে রয়েছে । ন্যায্য অর্থনীতিক ব্যবস্থা কার্যকরের পরিবর্তে তার গতি- প্রকৃতি নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের অনেকটাই শ্রেণি স্বার্থকে কেন্দ্র করে হচ্ছে বলে বেশির ভাগ মানুষই নানাভাবে তার শিকারে পরিণত হচ্ছেন। তাসত্ত্বেও সম্মিলিত রাজনীতিক অঙ্গীকার ও সবার একক আত্মকেন্দ্রিকতা পরিহার ও অংশগ্রহণ মূলক ভূমিকা নিশ্চিত হলে এদেশ এবং দেশের মানুষও হয়তো একদিন প্রমাণ করতে পারবে যে, আমরা উন্নতির নিয়মের ধারায় উন্নত দেশে পরিণত হতে সক্ষম । কিন্ত তার জন্য প্রথমত রাজনীতি, সরকার, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার সহ দেশের উন্নয়ন ও সকল মানুষের ন্যায্যতা নিশ্চিতে অভিন্ন নীতি এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা খুব দরকার। ফিরে আসা উচিত ন্যায় ভিত্তিক অর্থনীতি ও উন্নতির সঠিক নিয়মের ধারায়। কোনো কোনো নাগরিক সংগঠন অথবা সমাজ ও রাজনীতিক বিশ্লেষকদের ভাবনা ও কথা থেকেও এসবের গুরুত্ব আরো বেশি স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পায় ।
দেশ ও দেশের অনেক মানুষের আর্থিক উন্নতির বাস্তবতার প্রেক্ষিতে বলা যায়, দেশের অর্থনীতিক নীতি ও বাজার ব্যবস্থার অনেকটাই আমাদের দেশে সরকারের দৃষ্টিভংঙ্গি ও নীতিগত অবস্থানকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়ে থাকে । দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রাতিষ্ঠানিক এবং প্রশাসনিক সহায়তায় এক্ষেত্রে তা কার্যকর ও বাস্তবায়নে তার দায়িত্ব পালন করে যায়। এপ্রেক্ষিতে ‘মুক্তবাজার’ অর্থনীতির দিক থেকে শুধু দেশের বাজার ব্যবস্থা বা পরিস্থিতির বিষয়কে একটি উদাহরণ হিসেবে দেখলে বলার সুযোগ নেই যে, বাজার ব্যবস্থা বা অর্থনীতিক নীতির ক্ষেত্রে নিয়মের অভিন্নতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিতের নিশ্চয়তা রয়েছে । তারমধ্যে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতেও বলা যায়, খাদ্য পণ্য বা নিত্যপণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে নিয়ম, নীতির প্রতিফলন বা তা রক্ষার বাধ্যবাধকতা বলে কিছু আছে । স্বাভাবিক নিয়মে বাজার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় না থাকায় ভেজাল, নিম্মমানের পণ্য অথবা বিক্রয়ের ইচ্ছামাফিক দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ভোক্তাগণ অথবা কিনতেও পারছেন না অনেকে । সংবাদপত্রে প্রকাশিত এসংক্রান্ত তথ্য ও বিশ্লেষণেও বার বার উঠে এসেছে উচ্চ মূল্যস্ফিতির স্থিতি সহ বাজার পরিস্থিতি ও মানুষের আক্ষেপের কথা । এমন অনিয়ম ও নৈরাজ্যকর অবস্থায় যখন দেশের দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিরা বলেন, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের কষ্ট হচ্ছে, কিংবা মানুষের আয় বেড়েছে বলে দাম বাড়লেও কিনতে পারছেন, তখন আসলে অক্ষমতা বা দারিদ্র্যতার প্রতি করুণা প্রকাশ এবং ন্যায়-ন্যায্যতার আবশ্যকতাকে একভাবে অস্বীকার বা উপেক্ষা করা হয় । অন্যদিকে আইন ও নিয়মের সর্বজনীনতার বাইরে দেশের বার্ষিক বাজেটকে ‘ব্যবসা বা›দ্ধব’ বাজেট বলে অভিহিত করার উদ্দেশ্যের মধ্যে কর্পোরেট ও সিন্ডিকেট ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের পক্ষে উদারতা এবং পক্ষপাতিত্বের একতরফা নীতিও প্রকাশ পায় । এদিক থেকে দেখলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও প্রাকৃতিক গ্যাসের অনেক সংকটের মাঝেও শিল্পকারখানার এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ও পর্যাপ্ত ঋণ সুবিধা দেওয়া সত্ত্বেও তার অপচয়, চুরি বৃদ্বি সহ পরিবেশের দূষণ যেমন বাড়ছে, তেমনি কর্মসংস্থানের শান্তনা ছাড়া সাধারণ শ্রমজীবীদের ন্যায্য মজুরি নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যার কোনো সমাধানও হচ্ছে না । সহজে অবাধ দ্রুত লেনদেনের প্রলভন দিয়ে ‘ক্যাশ, বাকি, পকেট’ নামের মতো একাধিক মাধ্যমে অস্বচ্ছ, অপ্রদর্শিত ও অবৈধ লেনদেন যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, আবার অতিরিক্ত সংখ্যক ব্যাংক ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টাকা পাচার ও ধনীক শ্রেণির স্বার্থ কেন্দ্রীক কার্যক্রমের বাইরে অন্যান্য নাগরিকদের চাহিদা পূরণে কোনো সুবিধাও বাড়ছে না । আবার এক ব্যক্তির একাধিক ব্যাংকের মালিকানা সহ প্রতিষ্ঠিত আবাসন ও ওষুধের মতো ব্যবসা যার-সাধারণ খাদ্য পণ্যের ব্যবসাও তাঁরই, কিংবা শিল্পকারখানার মালিক ও পুঁজিপতি যিনি- টিভি চ্যানেল বা সংবাদ মাধ্যমও হয়ে যাচ্ছে তাঁর । লাভালাভের হিসাবের মুখে পড়ে দেশের সর্বত্র অনেক বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও কেবল ঋণ কার্যক্রম ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে । ই-কর্মাস ব্যবসার ক্ষেত্রেও প্রলোভন, আর্থিক প্রতারণা ও মানুষের শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের পরও তার পরিসর কেবলই বাড়ছে । মোবাইল ফোন গ্রাহকদের অজান্তে প্রতিদিন অতিরিক্ত এক, দুই টাকা করে কেটে নিয়ে মাসে কোটি কোটি টাকা পাচারের কথা শুনা গেলেও-এসব না জানার, না বুঝার কৌশল নিয়ে আছেন সংশ্লিষ্টরা । এরকম কোনো না কোনো ভাবে দেশের অর্থনীতির এমন গতি-প্রকৃতি ন্যায্যতার চরম লংঘন সত্ত্বেও যখন তার সবকিছু স্বাভাবিক চিন্তা-কর্মে পরিণত হয়ে যায়, তখন মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে একরকম লুটেরা অর্থনীতিক ধারা ও লুটেরা শ্রেণির ব্যক্তিদের স্বার্থই বেশি প্রাধান্য পায় । একইসঙ্গে বড়-ছোট দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ ও ব্যাপক বিস্তারে সমাজের বেশির ভাগ মানুষও অন্যায্যতা ও নানা ভাবে বৈষম্য ও শোষনের শিকার হতে হতে একটি ভারসাম্য মূলক এবং ন্যায় ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা থেকেও অনেকটা বঞ্চিত হন । এ প্রসঙ্গে বলা যায়, দশ ভাগ ধনী যেমন দেশের মোট আয়ের প্রায় অর্ধেক অর্থ ও তারসঙ্গে সম্পদের মালিক হচ্ছেন, তখন উচ্চ আয় বৈষম্যের দ্বারপ্রান্তেও এসে দাঁড়িয়েছে দেশ । গত জুলাই ২০২৩ এ জাতিসংঘের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষ জীবন-জীবিকার টানাপোড়েন সহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছে । আর এমন সবকিছুর জন্য এক কথায় বললে-প্রকৃত অর্থে দেশের ভেতরে গণতন্ত্র ও সুশাসনের অভাব যখন প্রকট হয়ে ওঠে তখন সুবিধাবাদি শক্তির প্রভাবে সরকারের ভূমিকাও অনেকটা ক্ষমতা কেন্দ্রীক স্বার্থের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে । বলা যায়, রাজনীতি ও সরকার ব্যবস্থার এমন দুর্বলতার সুযোগে বাজার ও অর্থনীতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নিয়ম, নীতির বাইরে আর্থিক লাভালাভের প্রতিযোগিতা একমাত্র মূখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে । ফলে মানুষের খাদ্য, পুষ্টির অভাবের মতো প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও চিকিৎসার চাহিদা পূরণের দাবিও মানসম্মত ও যৌক্তিক ব্যয়ের পরিবর্তে অনেকটাই ব্যবসার পণ্যে বিবেচিত হচ্ছে বলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুশিক্ষা, সুস্বাস্থ্য এবং লোভ, লালসার উর্ধ্বে মানবিক সুগঠনের দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে নানা ভাবে । এরকম বাস্তবতায় অনেক মানুষের ধর্মীয় শিক্ষা, বিশ্বাস ও গুনাবলীও গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে আদর্শিক জীবনের অনুসরণ থেকে ।

-আলী আকবর মাসুম, মানবাধিকার বিষয়ক পরামর্শক, কুমিল্লা।