বিক্রি হচ্ছে গোমতী!

দখল বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে লিখিত স্ট্যাম্পে শতক ৬০ হাজার থেকে লাখ টাকা পানি উন্নয়ন বোর্ড নিশ্চুপ , আড়ালে প্রভাবশালীরা
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

ভারত থেকে প্রবেশ করে কুমিল্লার বুক চিরে মেঘনায় মিলিত হওয়া গোমতীকে গিলে খাচ্ছে প্রভাবশালীরা। নদীর চর কেটে মাটি-বালু উত্তোলনের পর এবার বিক্রি চলছে নদীর বাঁধ ও চরের জমি। সামান্য স্ট্যাম্পে প্রভাবশালীরা এসব জমি বিক্রিতে খুঁজে নিচ্ছে দরিদ্র, অসহায় ও সহজ, সরল মানুষদের। এতে প্রভাবশালীরা লাভবান হলেও জমি কিনে বসতি শুরু করা মানুষগুলো রয়েছেন অনিশ্চয়তায়। এদিকে এসব বসতির কারণে নদী তার লাবণ্যতা হারাচ্ছে।
শতক ষাট হাজার। এ হিসেবে ৩ শতক এক লাখ ৮০ হাজার টাকায় কিনেছেন লাইলী আক্তার। স্থানীয় এক প্রভাবশালী শামীম মিয়া স্ট্যাম্পে লিখিত আকারে শহরতলীর চানপুর বেইলি ব্রিজের তিন-চারশ’ গজ দূরের এ জমিটি বুঝিয়ে দেন লাইলীকে।
লাইলী আক্তার জানান, জেলার মুরাদনগরের হোগলার চর থেকে এখানে এসে বসতি শুরু করেন। এর আগে শহরে ভাড়া নিয়ে থাকতেন। আয় কম হওয়ায় ছেলে-মেয়ের নিয়ে বাসা ভাড়া দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্বামী ভ্যান চালক। মেয়ে কুমিল্লার একটি কারখানার নারী শ্রমিক। কিছু সঞ্চয়ের টাকা ছিল। সেই টাকা দিয়ে সামান্য স্ট্যাম্পে লিখিত আকারে শতক ৬০ হাজার টাকায় ৩ শতক জমি নিয়ে বসতি শুরু করেন। পরে জানতে পারেন এটি সরকারি সম্পত্তি। সব হারিয়ে তিনি এখন অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
শুধু লাইলী নয়। তার মতো দরিদ্র, খেটে খাওয়া এবং দিনমজুর শ্রেণীর এ মানুষরা যখন একটি স্থায়ী বসতি খুঁজেন। ধীরে ধীরে জমানো সঞ্চয়ের বিনিময়ে পরিবার পরিজন নিয়ে একটু সুখে নিশ্চিন্ত বসবাসের। ঠিক তখন নদীর চর ও বাঁধ দখলদার শ্রেণির কিছু প্রভাবশালী ওই সহজ, সরল মানুষদের জমানো সঞ্চয় লুপে নিয়ে সরকারি জমি বুঝিয়ে দিচ্ছেন সামান্য স্ট্যাম্পে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর চর কেটে মাটি-বালু উত্তোলন, নদী রক্ষা বাঁধে দোকান-পাট নির্মাণ এবং চর দখল করে ঘর-বাড়ি নির্মাণে দখলের হিড়িক চলছে। দখলদারিত্বের পাশাপাশি প্রভাবশালীরা এখন বিক্রি করছেন চরের জমি। শতক হিসেবে স্ট্যাম্পে এসব জমি কিনে কেউ টিনশেডের ঘর, কেউ আবার কাঁচা-পাকা ঘর আর কেউ ইটের ওপরে টিন দিয়ে সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করছেন। কুমিল্লার সদর উপজেলার আলেখারচর আমতলী ব্রিজ থেকে টিক্কারচর ব্রিজ পর্যন্ত নদীর দুই পাশের বাঁধের ভেতরে এমন ৫ শতাধিক পরিবার রয়েছে। অবৈধভাবে নদীর জমি কেনাবেচায় প্রভাবশালীরা লাভবান হলেও জমি কিনে বসতি শুরু করা মানুষগুলো রয়েছেন অনিশ্চয়তায়।
আরেক বসতি কামাল হোসেন পাকা ঘর নির্মাণ করছেন স্থায়ী ভাবে। তিনি জানান, তার বাড়ি দাউদকান্দির গৌরিপুর। ২০১৬ সালে নদীর চরে বসতি শুরু করেন। এর আগে ভাড়া ছিলেন কুমিল্লা শহরে।
জামিরাপাড়া গ্ৰামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে কামাল। ৭ বছর আগে নদীর উত্তর পাড়ের প্রভাবশালী কামাল হোসেনের কাছ থেকে ৪ শতক অর্থাৎ ২ গন্ডা জমি কিনে ৩ লাখ টাকা দিয়ে। শুধু মাত্র একটি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে এ জমির কেনাবেচা হয়।
কামালের ছেলে রিপাত হোসেন এখন দেখাশোনা করছেন।

আরও এক বসতি রুহুল আমিন জানান, তার গ্ৰামের বাড়ি চাঁদপুর হাজীগঞ্জ পাঁচরুই। ৮ বছর আগে নজির মিয়ার কাছ থেকে এ জমি ক্রয় করে গন্ডা দেড় লাখ টাকায়। নজির মিয়া, জহির মিয়া এবং তাদের স্বজনরা কুমিল্লার গোমতী নদীর চাঁনপুর ব্রিজ এলাকার এ সম্পত্তি বিক্রি করে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণে শুধুমাত্র সদর উপজেলা এলাকায় অধিগ্রহণের আওতায় নেয়া হয় ৭৮৫ একর জমি। অধিগ্রহনের পর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাতে একে একে দখল হতে শুরু করে এ সরকারি সম্পত্তি। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে গোমতী নদী রক্ষা বৈঠকে তিন হাজার ১৭ জন দখলদারের তালিকা জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। তালিকা ধরে ১৪১ টি স্থাপনা উচ্ছেদ হয় যৌথ অভিযানে। এরপর থেকে নিশ্চুপ পানি উন্নয়ন বোর্ড ।

সনাক কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান ও বাপা কুমিল্লার সাধারণ সাধারণ আলী আকবর মাসুম বলেন, দখল, ভরাটে লাবণ্যতা হারাচ্ছে গোমতী নদী। নির্বিচারে বালু-মাটি কাটা এবং বসতি নির্মাণে ঝুঁকিতে বাঁধ। যেকোন ঢলে ভেঙ্গে আক্রান্ত হতে পরে কুমিল্লা শহর, আশঙ্কা তাদের। এসব দখলের সবকিছুর জন্য দ্বায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।

কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, সরকারি জায়গা দখলে রাখা সম্ভব না। গোমতীর বাঁধের উপর ও ভেতরের বসতিগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। তালিকা করে পাঠানো হয়েছে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে। উচ্ছেদ মামলা প্রক্রিয়াধীন। অচিরেই দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে।

কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ শামসুল তাবরীজ বলেন, নদীরক্ষা বাঁধে অবৈধ বসত-দোকান স্থাপনা উচ্ছেদ এবং গোমতী নদীর পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় জেলা প্রস্তুত রয়েছে। পানি উন্নয় বোর্ড যখনই সহযোগিতা চাইবে উচ্ছেদে সহযোগিতা করা হবে।