বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া উৎসবহীন পরিবেশে শান্তিপূর্ন ভাবে ভোট গ্রহন সম্পন্ন

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৬ মাস আগে

প্রাকৃতিক দূর্যোগ , ইভিএম জটিলতাসহ বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া উৎসবহীন পরিবেশে শান্তিপূর্ন ভাবে বুধবার কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের তৃতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। সকাল ৮টা থেকে কোন রকম বিরতী ছাড়া বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোট গ্রহন চলে। কয়েকটি কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে কিছুটা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্ন ভাবে ঘটলেও কোর রকম রক্তপাতের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেনি কুমিল্লা নগরবাসী। মেয়র পদের প্রধান তিন প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীও ভোটের পরিবেশ নিয়ে মোটামোটি সন্তুষ্ট প্রকাশ করেছেন। অনভিপ্রেত কয়েকটি ঘটনায় ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে আটক করা হয়েছে।
কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডের ১০৫টি কেন্দ্রের ৬৪০টি বুথে এবার ২লক্ষ ২৯ হাজার ৯২০ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার কথা থাকলেও সরেজমিনে নির্বাচন পরিদর্শন করে বুঝা গেছে, ভোটার উপস্থিতির হার তেমন একটা সন্তুষ্টজনক নয়।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল আহসান, পুলিশ সুপার মো. ফারুক আহমেদ ও রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহেদুন্নবী চৌধুরী ভোটের পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
এ দিকে, বুধবার দিনভর কুমিল্লা সিটির বিভিন্ন কেন্দ্রে সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়, ভোট গ্রহণের সময় সকাল ৮ থেকে ভোটার উপস্থিতি আশানুরুপ না হলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। তবে সকাল ৯টার পর বৃষ্টি শুরু হলে ভোটার,কর্মী ও সমর্থকদের নানা দূর্ভোগ পোহাতে হয়। বিশেষ করে এ সময় কেন্দ্রের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা ও বয়স্ক পুরুষ ভোটারদের দূর্ভোগ ছিল অসহনীয়। তার কাক ভেজা হয়ে ভোট দিয়ে বাড়ি যান।
কেন্দ্রের বাইরে নৌকার সমর্থকদের অবস্থান :
ভোট শুরুর আগেই নগরীর ৫নং ওয়ার্ডের রেয়াজ উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাহিরে রাস্তার দুই পাশে নৌকার ব্যাজ পড়ে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী শক্ত অবস্থান নেন। সাংবাদিক দেখতেই ব্যাজধারী কিছু লোক ঢুকে যায় কেন্দ্রের দিকে। তারপর আবারও সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায় ভোট দিতে। পরে কেন্দ্রের একটি কক্ষে ঢুকে দেখা গেল, গোপন কক্ষে দুইজনকর্মীকে। বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করলে কেন্দ্রে আসা নৌকার ব্যাজধারী আবদুল কুদ্দুস জানান, আমরা বয়স্ক লোকদের সহযোগিতা করতে কেন্দ্রে এসেছি।
১১জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা :
নগরীর ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে কয়েকটি কেন্দ্রে ১১জনকে অনভিপ্রেত ঘটনার কারণে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নগরীর বজ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে দুই বহিরাগতকে সাত দিনের কারাদন্ড এবং ফরিদা বিদ্যায়ন কেন্দ্রে তিন বহিরাগতকে তিনদিন করে বিনাশ্রম কারাদন্ড দিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজা মতিন এবং সোহেল রানা। ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে দিদার হোসেন নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভোট কার্যক্রমকে ‘প্রভাবিত’ করার অভিযোগে সাতদিনের বিনাশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জিয়াউর রহমান। এ ছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শুভাশিস ঘোষ নির্বাচনী আচরণ নিশ্চিত করতে আরেক ব্যক্তিকে তিনদিনের কারাদন্ড দিয়েছেন।
নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পিটিআই স্কুল কেন্দ্রে নির্বাচনী আচরণ ভঙ্গের দায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহুল চন্দ দুইজনকে তিন মাসের কারাদন্ডাদেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া আরো দুইজন দন্ডিত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
খলনায়ক যখন বৃষ্টি : ভোট সৃষ্টির এক ঘন্টা পরেই শুরু হয় মোশলধারে বৃষ্টি। চলে প্রায় পোনে এক ঘন্টার মত। এ সময় কেন্দ্রে ভোটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নারী ও বৃদ্ধ ভোটারদের কষ্ট ছিল অবর্ণনীয়। এই বৃষ্টির কারণেই পরবর্তীতে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কমে আসে।
ইভিএমে জটিলতা :
ইভিএমের জটিলতা ছিল গতকাল কুমিল্লা সিটির নির্বাচনের টক অব দ্যা কান্ট্রি। নগরীর ৫নং ওয়ার্ডে সকাল ৮.৪৮ মিনিটে গিয়ে দেখা যায় এ সময় ভোট পড়েছে মাত্র ৪টি। ইভিএমের ধীরগতিতে প্রতিটি ভোটারই বিরক্ত হয়েছে এবং অনেকেই ভোট না দিয়ে বাড়ি ফিরে যান। এ ছাড়া ৫ নম্বর ওয়ার্ডের একটি কেন্দ্রে ইভিএম মেশিনে ক্রুটির কারণে ৪১ মিনিট ভোটগ্রহণ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সাবানও কাজ হয়নি
ফাতেমা আক্তার। বয়স ৬০। ভোটার ৮ নং বজ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুর ১২টায় তিনি বুথের সামনে পৌঁছান। ভোটার নাম্বার দেওয়ার পর ছবি এলেও বিপত্তি বাধে আঙুলের ছাপ নিয়ে। বুথের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে আসতে বলেন। তিনি যথারীতি হাত ধুয়েও আসেন। কিন্তু ফিঙ্গার প্রিন্ট মেলেনি। অবশেষে তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর ভোট না দিয়েই ফিরে যান তিনি। মো. লিটন নামে ওই কেন্দ্রের আরেক ভোটার জানান, সব মেলে আঙুলের ছাপ মেলে না। আগেও তো ভোট দিয়েছি। এখন কেন মিলবে না? কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আবুল কালাম মজুমদার বলেন, অধিকাংশ মানুষ কম শিক্ষিত। তারা ইভিএম বুঝতে পারে না। ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাদের শিখিয়ে দিলেও ভোট দিতে পারছেন না।
সেমনা আক্তার নামে আরেক বৃদ্ধা জানান, গত বছরও তিনি ভোট দিয়েছেন। কিন্তু আজ তিনি ভোট দিতে পারছেন না। ইভিএমে ভোট দেওয়া নিয়ে ভোগান্তির শিকার এমন দুয়েকজন নয়। কুসিকের ৩০টি কেন্দ্র পরিদর্শন করে দেখা যায়, সব কেন্দ্রেই অনেক মানুষ ভোগান্তির শিকার। এছাড়া ধীর গতি তো আছেই।