বেশি দামে ইভিএম কেনার প্রস্তাব, ব্যয় ৮৭১১ কোটি

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২ মাস আগে

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কমপক্ষে দেড়শো আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের লক্ষ্যে আট হাজার ৭১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

প্রকল্পটিতে ডাবল কেবিন পিকআপভ্যান কেনা হবে ৫৩৪টি। এ খাতে ব্যয় হবে ২৬২ কোটি টাকা। আর ভ্যাট-ট্যাক্সসহ প্রতিটি ইভিএম আগের চেয়ে দেড় লাখ টাকা বেশি দরে কেনা হচ্ছে।

প্রতিটির দর ধরা হয়েছে তিন লাখ ৩৩ হাজার টাকা। ইভিএম কিনতেই যাবে ছয় হাজার ৬৬০ কোটি ২৯ লাখ টাকা। আর জমিসহ ১০টি ওয়্যারহাউজ করতে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা। ফলে প্রকল্পের মোট ব্যয় আট হাজার ৭১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। আড়াই লাখ টাকার বাল্ক ব্যাটারি চার্জার এখন ৩০ লাখ টাকায় কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া এত বড় একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও করা হয়নি কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা।

এর আগে নির্বাচন কমিশনের বোর্ড সভায় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুমোদনের পর বুধবার (১৯ অক্টোবর) প্রকল্পটির প্রস্তাবনা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। পরিকল্পনা কমিশন যাচাই-বাছাই করে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করবে। এরপর একনেক সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটি অনুমোদন দেবেন।

সাধারণত ১০০ কোটি টাকার বেশি কোনো প্রকল্প হলেই তার ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু তড়িঘড়ি করে নতুন প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়নে কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। সম্ভাব্যতা যাচাই না করার যুক্তি হিসেবে সংস্থাটি বলছে, প্রয়াত অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে উপদেষ্টা করে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সে কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নতুন কনফিগারেশনের ইভিএম দিয়ে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮৯৩টি সংসদীয় ও স্থানীয় নির্বাচন হয়েছে। সেজন্য নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কোনো প্রয়োজন মনে করছেন না তারা।

প্রকল্প প্রস্তাবে দেখা যায়, নতুন করে দুই লাখ ইভিএম মেশিন কিনতে চায় কমিশন। একেকটি ইভিএম কিনতেই খরচ হবে তিন লাখ পাঁচ হাজার টাকা। নতুন ইভিএম কেনাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ছয় হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। নির্বাচন পরবর্তীসময়ে এসব ইভিএম রাখতে সারাদেশে ১০টি ওয়ারহাউজের প্রতিটিতে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা করে মোট ৩৭৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এ ভবনের জন্য জমি কেনাতেই খরচ ধরা হয়েছে ৪০ কোটি টাকা।

এছাড়া ইভিএম কাস্টমাইজেশন সেন্টার স্থাপন, আঞ্চলিক ওয়ারহাউজ নির্মাণ, ইভিএম পরিবহন ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত কাজেই মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে এক হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। এছাড়া ইভিএম কেন্দ্রিক প্রশিক্ষণের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২০৫ কোটি টাকা। প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হবে ৬৯০ কোটি টাকা।

প্রকল্প প্রস্তাবের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে ইভিএম কেন্দ্রিক পাঁচটি আন্তর্জাতিক সেমিনার করবে নির্বাচন কমিশন। এতে ভ্যাট ও সার্ভিস চার্জসহ ব্যয় ধরা হয়েছে দুই কোটি টাকা। একেকটি সেমিনারে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ লাখ টাকা করে।

এতে আরও দেখা যায়, নির্বাচনের সময় সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা সামগ্রী ভাড়ায় চালানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৩১ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এ ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে সিসিটিভি ভাড়া, কানেকশন সেট ও আনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতিতে। এতে ব্যয় হবে ৫১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এছাড়া সিসিটিভি স্থাপন ও সাপোর্ট সার্ভিসের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

নির্বাচন কমিশনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১৫০ আসনে ২৫ হাজার ভোট কেন্দ্রের প্রয়োজন হতে পারে। গড়ে সাতটি ভোট কেন্দ্রে মোট দুই লাখ ৬২ হাজার ৫০০ ইভিএম প্রয়োজন পড়বে। এছাড়া প্রশিক্ষণের জন্য আরও অতিরিক্ত ২৫ হাজার মেশিন প্রয়োজন। আগের কেনা দেড় লাখ ইভিএমের মধ্যে ১২ হাজার ইভিএম নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে কমিশন।

এছাড়া প্রকল্প প্রস্তাবে দেখা যায়, আগের কেনা দেড় লাখ ইভিএমের ভাড়া বাবদ ৩৬ কোটি টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি। নতুন করে ৩০ জেলায় ইভিএম সংরক্ষণ করতে গেলে প্রতি বছর গড়ে পাঁচ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। একটি ইভিএমের তিনটি অংশ আছে। এগুলো হলো কন্ট্রোল ইউনিট, ব্যালট ইউনিট ও ডিসপ্লে ইউনিট। ভোটারের নিজেদের পরিচয় নিশ্চিত করতে আঙুলের ছাপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিসপ্লেতে ওই ভোটারের ছবিসহ যাবতীয় তথ্য চলে আসে। ব্যাটারির মাধ্যমে ইভিএম চলবে। চার্জ থাকবে ৪৮ ঘণ্টা। ইভিএমের সঙ্গে বাইরের কোনো ইন্টারনেট বা এ ধরনের কোনো সংযোগ থাকবে না। ফলে এটি হ্যাক করার সুযোগ নেই।

২০১১ সালের পর থেকে বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে সীমিত পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ছয়টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। তবে তখন ৭০ থেকে ৮০টি আসনে ইভিএমে নির্বাচন করার সামর্থ্য ছিল নুরুল হুদা কমিশনের।

এর আগে এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন বাংলাদেশে প্রথম ইভিএম ব্যবহার করে। ওই ইভিএম তৈরি করেছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। বুয়েটের তৈরি ইভিএমে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়েছিল। ওই ইভিএমে বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করার ব্যবস্থা ছিল না। ‘ভিভিপিএটি’ (ভোট দেওয়ার নিশ্চিতের রশিদ) সুবিধাও ছিল না। বর্তমানের ইভিএমেও ‘ভিভিপিএটি’ সুবিধা নেই।

আগের কমিশনের ইভিএম প্রকল্পের খরচের সঙ্গে তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা যায়, শুধু প্রতিটি ইভিএম তখন দাম ধরা হয় দুই লাখ পাঁচ হাজার টাকা। এখন সেটা তিন লাখ পাঁচ হাজার টাকা। এখানে দামেই এক লাখ টাকা বেশি। অ্যাপলিকেশন ও ওয়েব সার্ভারে ব্যয় হয়েছিল প্রতিটিতে ১২ লাখ টাকা। এখন সেটা চারগুণ বেশি ধরে ৫৫ লাখ টাকা। স্মার্ট কার্ড প্রতিটি আগে ছিল ৫০০ টাকা করে। এখন সেটা এক হাজার টাকা। স্মার্ট কার্ড রিডার প্রতিটি আগে পাঁচ হাজার টাকা ছিল, এখন সেটা ধরা হয়েছে সাত হাজার টাকা। এসডি কার্ড আগে ছিল ৫০০ টাকা এখন সেটা এক হাজার টাকা ধরা হয়েছে। বাল্ক এসডি কার্ড আগে সাড়ে তিন লাখ টাকা ব্যয় হতো। এখন সেটা তিন লাখ ৮৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে।

বাল্ক বেটারি চার্জার আগে আড়াই লাখ টাকা ছিল, এখন সেটা ধরা হয়েছে ৩০ লাখ
বাল্ক বেটারি চার্জার আগে আড়াই লাখ টাকা ছিল, এখন সেটা ধরা হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। প্লাস্টিক হার্ড বক্স যেটা আগে ১২ হাজার টাকা ছিল প্রতিটি। এখন সেটা ১৯ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। স্মার্ট কার্ড প্রি পারসোনালাইজেশন সিস্টেম মেশিনস আগে সাড়ে ৪২ কোটি টাকায় কেনা হয়। এখন সেটা সাড়ে ৪৪ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। ডাবল কেবিন পিকআপ ৪৯ লাখ টাকা করে ধরা হয়েছে প্রতিটি। বলা হয়েছে বাজার দর অনুযায়ী এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইসি সূত্র জানায়, একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম কেনার জন্য কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশনের দেওয়া প্রস্তাবে তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পাস করেছিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। সেবার প্রতি ইভিএমের পেছনে ভ্যাট-ট্যাক্সসহ খরচ হয়েছিল দুই লাখ ৩৪ হাজার টাকা। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ইভিএমপ্রতি এক লাখ টাকা থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকার মতো খরচ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

প্রকল্পটির বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, নির্বাচনের দায় সাংবিধানিক দায়। এটা পরিবর্তন করা সুযোগ নেই। সেজন্য ইভিএমের প্রয়োজন আছে। তবে বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকটের মুহূর্তে এত টাকা অর্থনীতিতে কিছুটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যেহেতু অর্থ খরচ হবে। আমরা কমিশনে দেখবো কোনো খাতে ব্যয় বেশি চাওয়া হয়েছে কি না। সম্ভব হলে ব্যয় কমাবো।