মসজিদ কমিটিতেও রাজনীতি – শাহাজাদা এমরান

সময়ের কথা
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৪ সপ্তাহ আগে

চলতি অক্টোবর মাসের ৭ তারিখে খাগড়াছড়ি জেলা সদরে যাই। পর দিন ৮ অক্টোবর জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার তবলছড়ি ইউনিয়নের তবলছড়ি গ্রামে যাই এক স্বজনের বাড়িতে । ইচ্ছে না থাকলেও স্বজনদের অনুরোধে সেখানে রাত কাটাই।পাহাড়ের উপর বাড়ি। বিদ্যুতের সুবিধা এখনো সেখানে না পৌঁছালেও সোলার দিয়ে তাদের চাহিদা কিছুটা মিটানো হচ্ছে। রাতে দীর্ঘক্ষন কোরআন,হাদিস,ইতিহাস, বিজ্ঞান সম্পর্কিত আড্ডা আর শেষ রাতের দিকে কিছুটা শীতের অনুভুতি এক অন্যরকম আবহ কাজ করেছিল মনের গহিনে।

ডিনার করে এক জম্পেশ আড্ডায় মেতে উঠি আমার স্বজনের শ^শুড়ের সাথে। ষাট উর্ধ্ব এই ভদ্র লোক একজন আলেমেদ্বীন।দীর্ঘ ২২ বছর মসজিদে ইমামতি করেছেন। এখন একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। খাগড়াছড়ির তবলছড়িতে স্থায়ী হলেও তাদের আদি বাড়ি ফেনীর পরশুরামে। ৬০ এর দশকে তাঁর দাদা ব্যবসার উদ্দেশ্যে পাহাড়ে আসেন। পরবর্তী পর্যায়ে এখানেই স্থায়ী হন। পাহাড়ের অতীত,বর্তমান অবস্থা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। মসজিদের ইমাম কিংবা মাদ্রাসার শিক্ষক হলেও আলাপে তাঁর মধ্যে কোন ধর্মীয় গোঁড়ামী কিংবা কপটতা খুঁজে পাইনি। বরং তার চিন্তা চেতনা এবং কথা বার্তায় ধর্মের সাথে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের অপূর্ব এক মিশেল খুঁজে পেয়েছি। যা আমার অনেক অজনার ভান্ডারকে কিছুটা হলেও সমৃদ্ধ করেছে।

এই ধর্মীয় বুজুর্গ ব্যক্তির সাথে আলাপের এক পর্যায়ে উঠে এলো বর্তমানে মসজিদ কমিটিও যে রাজনীতির মধ্যে কিভাবে ঢুকে পড়েছে সেই সম্পর্কে। তিনি জানালেন, আজ থেকে বিশ বছর আগে তিনি এবং গ্রামের কিছু মুরুব্বীদের নিয়ে এলাকায় একটি মসজিদ করেন। প্রথমে বাঁশ ও মুলির বেড়া দিয়ে মসজিদ প্রস্তুত করা হয়। এভাবে চলে তিন বছর। মসজিদ প্রতিষ্ঠার তিন বছর পর এলাকার সর্বস্তরের মানুষের অনুরোধে তিনি সভাপতির দায়িত্ব গ্রহন করেন। একটানা ১৭ বছর এই মসজিদের সভাপতি ছিলেন। মুলির বেড়া থেকে ক্রমান্বয়ে মসজিদটি তার নেতৃত্বে পাকা হয়। সর্বশেষ গেলবার মসজিদের মুসল্লিদের নামাজ পড়ার সুবিধার্থে এসি সংযোজন করেন। মসজিদের চর্তুদিকে ভাউন্ডারি দেয়ার পরেও এখন মসজিদের ফান্ডে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা আছে। এই উন্নয়ন কাজ করতে তাকে অনেক পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। যখনি শুনেছেন কেউ বিদেশ গিয়েছে কিংবা বিদেশ থেকে দেশে এসেছেন , লাজ লজ্জা ত্যাগ করে ছুটে গিয়েছেন তার কাছে। মসজিদের জন্য অনুদান চেয়েছেন, এনেছেন। এভাবেই শূন্য ফান্ড থেকে মুলির বেড়ার মসজিদটি আজ আধুনিক সুযোগ সুবিধা সমেত একটি ভালো ফান্ডের উপর দাঁড়িয়ে আছে।

মসজিদের উন্নয়ন এবং ফান্ডে থাকা সাড়ে তিন লাখ টাকার খবর পৌঁছে যায় নিয়মিত নামাজ না পড়ার স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে। আর যায় কোথায়। কোন এক শুক্রবারে আওয়াজ উঠল, আমরা ক্ষমতায় থেকেও মসজিদ কমিটিতে আসতে পারব না কেন। আমাদের দল যখন দেশ চালাতে পারে তাহলে আমরা কেন একটি মসজিদ চালাতে পারব না। পরে আমার ঐ স্বজনের শ^শুড় ইজ্জতের ভয়ে চলতি বছরের শুরুতেই দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে চলে এসেছেন। যেখানে প্রতি মাসেই মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিনের বেতন ভাতা,বিদ্যুৎ বিলসহ আনুসাঙ্গিক খরচ মিটিয়ে আয় থাকত সেখানে তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার ৬ মাসের মধ্যেই বাকি পড়ে যায় বিদ্যুৎ বিল। এই ঘটনা যে শুধু খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলাতেই হয়েছে তা নয়, এটা এখন গোটা দেশেই বিরাজমান। খাগড়াছড়ি হতে পারে অসংখ্য ঘটনার একটি মাত্র। এটা যে বিগত বিএনপি সরকারের আমলে ঘটেনি তা কিন্তু আমরা হলফ করে বলতে পারব না। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে বর্তমান সময়ে ঘটেছে বিধায় আমরা এই প্রসঙ্গটি নিয়ে কথা বলছি।

মসজিদ কমিটিতে রাজনীতি অনুপ্রবেশের কারনে আজ কুলসিত রাজনীতিআজ সর্বশেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেখা দিয়েছে ঘরে ঘরে বাক্ বিতন্ডা। পেশি শক্তি নির্ভর এই রাজনীতির জন্যই কি ১৯৭১ সালে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত আর ২ লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছিল আমাদের এই প্রিয় স্বদেশ।
মসজিদ কমিটি কি দেশের রাজনীতি বা সমাজের সামাজিক , সাংস্কৃতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক অন্যান্য কমিটির মতই একটি কমিটি না এখানে ভিন্নতা আছে। তা জানার চেষ্টা করা হয়েছে বিশিষ্ট ওয়াজিনে কেরাম, হযরত মাওলানা মুফতি মাহফুযুল হকের কাছে।

তিনি জানিয়েছেন, মসজিদ কমিটির পদকে নেতৃত্ব মনে করা চরম বোকামী। মসজিদ কমিটির কোথাও জায়াগা হলে এটাকে নিছক খেদমত মনে করা দরকার। এ খেদমত আল্ল¬াহর ঘরের খেদমত। মুসল্লিদের খেদমত। তাই দুনিয়ার কোনো চাওয়া-পাওয়া ব্যতিরেকে মুক্তমনে শুধু আল্ল¬াহতায়ালার সন্তুষ্টি লাভের ইচ্ছায় ইবাদত মনে করে খেদমতের মানসিকতা নিয়ে কমিটিতে অংশ নিতে হয়। সামাজিক পদমর্যাদা বৃদ্ধির অভিলাষে কমিটিতে যোগ দেওয়া হারাম।
মুফতি মাহফুযুল হক আরো বলেন, প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতিতে ক্ষেত্র বিশেষ অর্থের অপচয় হয়, দলাদলির সৃষ্টি হয়, কোন্দল বৃদ্ধি পায়, পরষ্পর শত্রুতার স্থায়ী বীজ বপন হয় ও মহল্ল¬াবাসী বিভক্ত হয়ে যায়। তাই পরামর্শের ভিত্তিতে কমিটি গঠন যুক্তিযুক্ত। এক্ষেত্রে মহল¬ার মুরুব্বি, নামাজি, পরহেজগার ও জ্ঞানীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।
মসজিদ কমিটি অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি ধর্মীয় দায়িত্ব। যে কারও হাতে এ দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া ঠিক না। তাই কাউকে মসজিদ কমিটির জন্য বাছাই করার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হওয়া দরকার- মসজিদ কমিটির দায়িত্ব নেয়ার মতো যোগ্যতা তার আছে কি-না।

হযরত মাওলানা মুফতি মাহফুযুল হকের মতে, মসজিদ কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার যোগ্যতা নয়টি। যেমন,
১. মোতাওয়ালি¬ বা কমিটির সভাপতি হবেন তারা- ক. মসজিদের জমিদাতা, খ. তদীয় কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তি, গ. ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান, ঘ. তদীয় নিযুক্ত স্থানীয় প্রশাসক, ঙ. কোরআন-সুন্নাহমতে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারপতি, চ. মহল্ল¬াবাসী কর্তৃক মনোনীত প্রতিনিধি। ২. প্রাপ্ত বয়ষ্ক হওয়া, ৩. মানসিকভাবে সুস্থ হওয়া, ৪. ওয়াকফ, দান ইত্যাদি সংগ্রহ ও ব্যয় সম্পর্কে শরয়ী মাসআলার জ্ঞান থাকা, ৫. মসজিদ ব্যবস্থাপনার বৈষয়িক যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা, ৬. আমানতদার হওয়া। অর্থ আত্মসাৎ ও তসরুফ তো দূরের কথা সাময়িক তসরুফেরও কোনো আশঙ্কা না থাকা, ৭. এমন কোনো কাজের অভ্যাস না থাকা- যেগুলো মানুষকে সর্বস্বান্ত করে। যেমন- জুয়াখেলা, মদপান করা ইত্যাদি, ৮. কোনো কবিরা গুণাহতে প্রকাশ্যে লিপ্ত না থাকা এবং ৯. মসজিদ কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার আগ্রহ ও চেষ্টা না থাকা।

একটি কথা আমাদের সবাইকে স্পস্ট মনে রাখতে হবে, মসজিদ স্বয়ং আল্লাহর ঘর আর মাদ্রাসা হলো আল্ল¬াহর রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর ঘর। সুতরাং যদি আমরা সত্যিকারের মুসলিম হয়ে থাকি তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার প্রিয় হাবিব রাসুল(সা.) এর ঘর নিয়ে রাজনীতি করতে পারি না। এই দুটি ঘরের আমরা কেউ স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নিতে পারি না। আমাদেরকে যদি যোগ্য মনে করে দায়িত্ব প্রদান করে তাহলেই কেবল খেদমতের উদ্দেশ্যে আমরা সেই দায়িত্ব সততা ও বিশ^স্ততার সাথে পালন করতে পারি।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমিটিতে অনেক আগেই প্রকাশ্য রাজনীতি ঢুকে গেছে। যার কারণে আমাদের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা কতটুকু উন্নত আর অবনত হয়েছে তা শিক্ষাবিদরাই ভালো বলতে পারবেন। আজ দেশের ছোট খাট সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও বাদ নেই কুলসিত রাজনীতির অনুপ্রবেশের। বাকি রয়েছে কেবল মসজিদ, মাদ্রাসা। ক্রমান্বয়ে সেখানেও শুরু হয়ে গেছে। এটা ভালো লক্ষন না।

লেখাটি শেষ করতে চাই, নবী করিম (সা.) এর একটি হাদিস দিয়ে। আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, যখন আমানত নষ্ট করা হবে তখন থেকে কিয়ামতের অপেক্ষা করতে থাকবে। জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল¬াহর রাসূল (সা.) কীভাবে আমানত নষ্ট করা হবে? তিনি বললেন, যখন অযোগ্যকে দায়িত্ব দেয়া হবে তখন থেকে কিয়ামতের অপেক্ষা করতে থাক। -সহিহ বোখারি: ৬৪৯৬।

সুতরাং, আসুন, আমরা মসজিদ-মাদ্রাসাকে রাজনীতির বাহিরে রাখি।আল্লাহ এবং তার রাসুল (সা.)এর ঘর খেদমত করার জন্য যারা যোগ্য তাদেরকেই আমরা সেখানে দায়িত্ব দেই।

লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের কুমিল্লা ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি কুমিল্লা জেলা। মোবাইল,০১৭১১-৩৮৮৩০৮ ই-মেইল –sahajadaamran@yahoo.com ,, ৩০.১০.২২