মাননীয় এমপি মহোদয়, মামলা করে কি গণমাধ্যমের কন্ঠ রোধ করা যাবে?

মন্তব্য প্রতিবেদন
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১০ মাস আগে

বৃহত্তর কুমিল্লার পাঠক নন্দিত পত্রিকা দৈনিক আমাদের কুমিল্লার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নাসিমা খান মন্টি, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শাহাজাদা এমরান, পত্রিকাটির চান্দিনা প্রতিনিধি মাসুমুর রহমান মাসুদ এবং চান্দিনার মহিচাইল ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবু মুছা মজুমদারকে আসামী করে ৬ কোটি টাকার মানহানী মামলা করেন চান্দিনা পৌর কৃষকলীগ সভাপতি জয়নাল আবেদীন জনি। কৃষকলীগ নেতা জনি স্থানীয় এমপি ডা. প্রাণ গোপালের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। বুধবার (৭ জুন) কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর ৭নং আমলী আদালতে ওই মামলাটি দায়ের করা হয়। এর মধ্যে দৈনিক আমাদের কুমিল্লা পরিবারকে করা হয় ৫ কোটি টাকার এবং আওয়ামীলীগ নেতা মুছাকে করা হয় ১ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা।
প্রিয় পাঠক, এমপি ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের অনুসারী হিসেবে পরিচিত চান্দিনা পৌর কৃষকলীগ নেতা কেন আমাদের কুমিল্লার বিরুদ্ধে মানহানীর মামলা করল? বৃহত্তর কুমিল্লার পাঠক নন্দিত পত্রিকা দৈনিক আমাদের কুমিল্লা কি অপরাধ করেছে কিংবা সত্যি সত্যি যদি আমাদের কুমিল্লা কোনো ভুল সংবাদ করে থাকে, তাহলে তো সরাসরি মামলায় যাওয়ার আগে আরো অনেক প্রক্রিয়া ছিল যা তারা করতে পারত। তারা প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ দিতে পারত, প্রতিবাদ না ছাপলে উকিল নোটিশ দিতে পারত, প্রেস কাউন্সিলে নালিশ করতে পারত। এরপরেও যদি কোন বিহিত না হতো তাহলে সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে তারা আদালতে মামলা করতে পারত। কিন্তু এর কোন ন্যায় সঙ্গত অপশনে না গিয়ে সরাসরি ৬ কোটি টাকার মামলা করে দিল।
মামলার এজাহারে বাদী চান্দিনা কৃষকলীগ নেতা জয়নাল আবেদীন জনি উল্লেখ করেছেন, দৈনিক আমাদের কুমিল্লায় খবরটি প্রকাশ হওয়ায় নাকি মাননীয় এমপি সাহেবের মান সম্মানে আঘাত লাগিয়াছে এবং আমাদের কুমিল্লা নাকি এমপি সাহেবের কোন বক্তব্য নেয়নি। এই জন্য এমপি সাহেবের মানহানী হয়েছে। ফলে,আমাদের কুমিল্লা পরিবারকে ৫ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ আর এমপির অনুসারী হিসেবে কৃষকলীগ নেতার মানহানী হয়েছে। এজন্য আওয়ামীলীগ নেতা আবু মুছা মজুমদারকে ১ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা করা হয়েছে।
এবার আমার পাঠকদের জ্ঞাতার্থে দৈনিক আমাদের কুমিল্লায় ৪ জুন প্রকাশিত সংবাদের কিছুটা তুলে ধরছি। চান্দিনা প্রতিনিধির বরাত দিয়ে আমাদের কুমিল্লা যে সংবাদটি প্রকাশ করে তা হলো, চান্দিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের ৩ জুন কর্মী সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত এর তীব্র সমালোচনা করেন উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ নেতাকর্মীরা। এছাড়া গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীদের এবং নৌকার বিরোধীতার ঘোর অভিযোগ আনেন তারা এমপির বিরুদ্ধে।
এই সভায় মহিচাইল ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান আবু মুছা মজুমদার বলেন, গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এমপি নৌকার বিরোধীতা করে তাকে পরাজিত করেছেন । তিনি আরো বলেন- ‘এমপি সাহেব আমার কাছে প্রশাসন সহ বিভিন্ন জায়গায় দেওয়ার কথা বলে ২০ লাখ টাকা চায়। আমি এমপি’র এপিএস সমীর এর নিকট ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছি।’
প্রিয় পাঠক, আপনারা উপরের বক্তব্যটি শুনলেন। চান্দিনা উপজেলা আওয়ামীলীগের কর্মী সভায় উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি মুনতাকিম আশরাফ টিটুর সভাপতিত্বে প্রকাশ্যে এ সভাটি হয়েছে। এই সভার বক্তব্য শত শত নেতাকর্মীরা রেকর্ড করেছেন।
দৈনিক আমাদের কুমিল্লা প্রকাশ্য সভায় দেওয়া আওয়ামীলীগের পদবীধারী নেতাদের বক্তব্যটি কেবল প্রকাশ করেছেন মাত্র। এই সংবাদটি দৈনিক আমাদের কুমিল্লার কোন নিজস্ব তৈরীকৃত সংবাদ নয়, এমনকি এটা কোন অনুসন্ধানী সংবাদের আওতায়ও পড়ে না। সুতরাং প্রকাশ্য জনসমাবেশ কিংবা কর্মী সমাবেশের বক্তব্য প্রকাশ করার সময়, যার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে তার বক্তব্য নেওয়া মোটেই জরুরী নয়, বাধ্যবাধকতা তো নয়ই। সুতরাং গত ৩ জুন চান্দিনা উপজেলা আওয়ামীলীগের কর্মী সমাবেশের সংবাদ পরদিন ৪ জুন দৈনিক আমাদের কুমিল্লা প্রকাশ করে কোন অন্যায় করেনি। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে দৈনিক আমাদের কুমিল্লা তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছে মাত্র।
প্রিয় পাঠক, একটি গণমাধ্যমের সবচেয়ে বিচারক হচ্ছেন আপনারা। এখন আপনারাই বলুন, দৈনিক আমাদের কুমিল্লা এক্ষেত্রে কোন অন্যায় করেছে কি না। আমরা আর কত সেল্ফ সেন্সরশীপ করব? আমরা কি প্রকাশ্য দিবালোকে অনুষ্ঠিত জনসভার কিংবা কর্মী সভার বক্তব্যও প্রকাশ করতে পারব না? আমরা তো চান্দিনা গিয়ে অনুসন্ধান করে এমপি সাহেবের বিরুদ্ধে কোন সংবাদ প্রচার করিনি। তাহলে কেন সামান্য এই সংবাদে একটি জনপ্রিয় ও পাঠক নন্দিত পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও তার স্থানীয় প্রতিনিধির বিরুদ্ধে কোটি টাকার মানহানীর মামলা করল। এই হয়রানীর অর্থ কি।
মাননীয় সংসদ সদস্য ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত সাহেব, একজন দেশ সেরা গুণী চিকিৎসক হিসেবে সারা দেশেই আপনি সমাদৃত। আপনার মত একজন প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পেয়ে কুমিল্লাবাসী হিসেবে আমরাও আপনাকে নিয়ে অহংকার করি। কিন্তু রাজনীতিতে এসে এবং এমপি হয়েই আপনি কেন এমন হয়ে গেলেন। যেই পরমতসহিঞ্চুতা ছিল আপনার সারা জীবনের অর্জন আপনি এমপি হয়ে কি তা ভুলন্ঠিত করে দিলেন? আপনি কি ভেবেছেন, ৫ কোটি টাকার মানহানীর মামলা করলেই স্তব্ধ হয়ে যাবে গণমাধ্যমের কন্ঠস্বর? জি না স্যার। ইতিহাস কিন্তু তা সাক্ষ্য দেয় না। ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হচ্ছে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। হয়তো আপনিও নিতে চাচ্ছেন না স্যার।
দৈনিক আমাদের কুমিল্লা আপনার অনেক সংবাদ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে অসংখ্য সংবাদ লিড এবং সেকেন্ড লিডও গেছে। এর জন্য আপনার কাছ থেকে এক কাপ চা ও কিন্তু খাইনি। এমনকি আপনি আমাকে চিনেন বলেও আমার কাছে মনে হয় না। তারপরেও যখনি আমাদের চান্দিনা প্রতিনধি আপনার সংবাদ পাঠাত অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে আমরা তা প্রকাশ করেছি। কই ! এজন্য একদিনও তো ধন্যবাদ জানাননি। আজ আপনার দলের উপজেলা সভাপতির সভাপতিত্বে প্রকাশ্যে সভার বক্তব্য ছাপানের কারণেই আপনি এত ক্ষুদ্ধ, বিক্ষুদ্ধ হয়ে গেলেন। এতটুকু সহনশীল স্যার আপনি প্রদর্শন করলেন না। এমনকি আপনার একজন কর্মীর মাধ্যমেও তো একটা প্রতিবাদ দিতে পারতেন। দেখতেন গুরুত্ব দিয়ে আমরা প্রকাশ করতাম কি না। তার কোনটাই না করে আপনি স্যার সরাসরি আদালতে চলে গেলেন। এটা স্যার আপনি যেতেই পারেন। কারণ, আদালত তো সবার। যে কোন সংক্ষুদ্ধ ব্যক্তিই প্রতিকারের আশায় আদালতের শরণাপন্ন হতেই পারে। কিন্তু এমপি মহোদয়, মানুষ আপনার এই মানহানীর মামলাটি বিবেচনা করছে , গণমাধ্যমের কন্ঠ স্তব্ধ এবং পেশাদার সাংবাদিকদের হয়রানী হিসেবে। এটা স্বাধীন গণমাধ্যমের বিকাশে অন্তরায়। গণমাধ্যমের কণ্ঠকে চেপে ধরার নামান্তর।
কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত মহোদয়, লেখাটি শেষ করতে চাই আপনাকে বিনয়ের সাথে একটি কথা বলে। স্বাধীন গণমাধ্যমকে যারা টুটি চেপে ধরে , তার কন্ঠস্বরকে থামিয়ে দিতে চায় , ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় , দিন শেষে তারা কিন্তু ভালো থাকে না। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হচ্ছে যে, এই যে ভালো থাকে না – এই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যখন বুঝতে পাওে, তখন আর তার করার কিছুই থাকে না। অতএব, সাধু সাবধান।

লেখক : সাংবাদিক,সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক।