মাননীয় পুলিশ সুপার, ধর্মপুর কত দূর ? – শাহাজাদা এমরান

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১ মাস আগে

একুশে আগস্ট বোমা হামলার প্রতিবাদে গত ২১ আগস্ট রোববার কুমিল্লা মহানগর আওয়ামীলীগ টাউন হল মাঠে এক প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। এই প্রতিবাদ সমাবেশে আসাকে কেন্দ্র করে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে কুমিল্লা শহরতলীর ধর্মপুরে আওয়ামীলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে প্রথমে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, পরে প্রকাশ্য অস্ত্র প্রদর্শন শুরু হয়। এই ঘটনার জেরে রোববার,সোমবার ও মঙ্গলবার টানা তিন দিন অস্ত্রের মহড়া হয়েছে অত্র এলাকায়। মোটর সাইকেল আগুন দিয়ে জ¦ালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাংচুর হয়েছে দক্ষিণ বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ ভিক্টোরিয়া কলেজ ও কলেজের ক্যান্টিন। সেই সাথে ঘর থেকে ছাগল ও পুকুর থেকে মাছ লুটের ঘটনা সংগঠিত হয়েছে। শুধু রাতের আধারে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে এই অস্ত্রের মহড়ায় ধর্মপুর, সাতোরা ও ভিক্টোরিয়া কলেজ এলাকাজুড়ে আতংক বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ এলাকায় থাকাকে অনিরাপধবোধ করছে। যে কোন সময় ঘটে যেতে পারে প্রাণহানির ঘটনা। ঘটনার চার দিন অতিবাহিত হলেও এখনো পুলিশের দৃশ্যমান ভুমিকা পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ ঘটনাস্থল থেকে কোতয়ালী মডেল থানার দুরুত্ব হবে তিন কিলোমিটারের কিছুটা বেশি।

প্রকাশ্য অস্ত্রের এই মহড়ার নেপথ্যে কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ৩নং দক্ষিণ দুর্গাপুর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল হান্নান সোহেল ও ৩নং ওয়ার্ড সদস্য ফখরুল ইসলাম রুবেল গ্রুপের মধ্যে নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবসা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। অবশ্য তারা সবাই বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত।

২১ আগষ্ট রোববার ধর্মপুরে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওযা পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এমন একটি সিসিটিভি ফুটেজ সোমবার ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ফুটেজে দেখা যায়, রোববার রাস্তায় বন্দুক হাতে মহড়া দিচ্ছেন দুইজন। স্থানীয়রা তাদেরকে রুবেল ও চপল বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া সিসিটিভির ক্যামেরা ভাঙতে দেখা যায় জনিকে। এই দিন প্রায় সাতঘণ্টা অস্ত্রের মহড়া দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দুই গ্রুপের বিরোধে বিকাল থেকে সন্ধ্যায় আরও দুই দফা হামলা হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালামাল লুট করা হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে ওই এলাকায় অবস্থিত ভিক্টোরিয়া কলেজের ডিগ্রি শাখা। এ ঘটনায় সোমবারও ওই এলাকায় অস্ত্রের মহড়া দেয়া হয়। মঙ্গলবার চলে ছাগল ও মাছ লুটের ঘটনা।

মাননীয় পুলিশ সুপার, যারা প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়েছে তাদের অস্ত্র হাতে ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি দূর্বত্তদের নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়েছে। এই ঘটনায় শুধু শহরতলীর ধর্মপুর, সাতোরা ও ভিক্টোরিয়া ডিগ্রী কলেজ এলাকার মধ্যেই আতংক ছড়ায়নি, আতংক ছড়িয়েছে পুরো ৩নং দূর্গাপুর ইউনিয়ন ও কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন মহল্লায়ও।

কিন্তু বড্ড অবাকও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছি, আজ (২৪ আগষ্ট,বুধবার) দুপুরে কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহিদুর রহমান সাহেবের সাথে কথা বলে। কারণ, ধর্মপুর এলাকা কাগজে কলমে শহরের বাহিরে হলেও এটা কিন্তু শহরেরই একটি অংশ হিসেবে মানুষ মনে করে। ঘটনাস্থল কোতয়ালী মডেল থানা, কান্দিরপাড় পুলিশ ফাঁড়ি এমনকি জেলা পুলিশ সুপার অফিস থেকেও খুব দূরে নয়। যেখানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং গণমাধ্যমে অস্ত্রধারীদের সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে , সেখানে ঘটনার চারদিন পরে কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহিদুর রহমান বলেছেন, এই বিষয়ে আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করেনি, কোন পক্ষই মামলা করেনি । প্রকাশ্যে যারা অস্ত্রের মহড়া দিলে যাদের ছবি পত্রিকায় ছাপা হলে তাদের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি কোতয়ালী জানান, এই বিষয়ে আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি।

জনাব পুলিশ সুপার মহোদয়, গত মঙ্গলবার(২৩ আগষ্ট) গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে কুমিল্লায় যোগদান উপলক্ষে আপনার মিট দ্যা প্রেস অনুষ্ঠানে আমিও ছিলাম। সেখানে আমাদের সহকর্মীরা আপনাকে প্রশ্ন করেছিল, দৃশ্যমান কেউ যদি অপরাধ করে আর যদি কোন অভিযোগ না করা হয় সেখানে পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে কোন ভূমিকা রাখতে পারে কি না। আপনি খুবই চমৎকার ভাবে উত্তরে বলেছিলেন, পুলিশ যদি মনে করে এই ঘটনাটিতে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে বা হতে পারে তখন পুলিশ নিজ দায়িত্বেই ব্যবস্থা নিতে পারে। আমরা কথায় নয়, বাস্তবে আপনার এই কথার সত্যতা খুঁজে পেতে চাই।

কুমিল্লার নবাগত পুলিশ সুপার জনাব মো. আবদুল মান্নান বিপিএম(বার) মহোদয়কে বলব, আপনি আমাদের কুমিল্লায় এসেছেন মাত্র কয়েকদিন হলো। আলোচিত ধর্মপুরের ঘটনাটি চার দিনেও পুলিশ কোন কিছুই করতে না পারার ব্যর্থতা এখনি আপনাকে আমরা জড়াতে চাই না। শুধু এতটুকু বলতে চাই, একটু খোঁজ নিন, কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানা থেকে ঘটনাস্থল ধর্মপুর কত দূর ? কেন গত চার দিনেও কোতয়ালী মডেল থানার পুলিশ জানতে পারল না গত তিন দিনে এই এলাকায় প্রকাশ্যে কারা অস্ত্রের মহড়া দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি এলো, গণমাধ্যমে ছাপা হলো কিন্তু নজরে এলো না শুধু মাত্র কোতয়ালী থানা পুলিশের কিংবা সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার।

আমি সুদৃঢ় ভাবে জানি এবং বিশ^াস করি যে, আমাদের দেশের পুুলিশ বাহিনী অনেক যোগ্য এবং চৌকশ। তারা পারে না এমন কিছু নেই। শুধু দরকার সদ্ব্ইচ্ছা ও ইতিবাচক মনোভাবের। ধর্মপুরের প্রকাশ্যে অস্ত্র যারা প্রদর্শন করেছে তাদের ব্যাপারে পুলিশের জিরো টলারেন্স বিশেষ করে নবাগত পুলিশের সুপারের সাহসী ভূমিকা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে নগরবাসী।

কুমিল্লার ইতিহাসে সর্বোচ্চ অস্ত্রের মহড়া হয়েছে নগরীর প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়ে সম্ভবত ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর। সেই দিন যুবদলের কমিটি গঠন নিয়ে বিএনপির দুই গ্রুপের যে প্রকাশ্য হালকা,মাঝারীও ভারী অস্ত্র নগর কুমিল্লায় প্রর্দশন হয়েছিল সেই কথাও কিন্তু নগরবাসী ভুলে যায়নি। অসহায় নগরবাসী এটিও ভুলে যায়নি যে, সেই অস্ত্র প্রদর্শণকারীদের কিন্তু আজো পুলিশ চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে পারেনি।

মাননীয় পুলিশ সুপার, আপনি মাত্র চার দিন হলো কুমিল্লায় এসেছেন। এরই মধ্যে একদিন আপনাকে দেখে এবং কথা বলে আপনাকে একজন সজ্জ্বন ও বন্ধুবাৎসল্য মানুষ হিসেবে মনে হয়েছে। আপনার কাছে নগরবাসীর ক্ষুদ্র একটি প্রত্যাশা হলো, দ্রুত ধর্মপুরের অস্ত্র প্রদর্শণকারীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হোক, নগরবাসীর জন্য বিশাল মাথা ব্যাথা হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং কালচার। এই কিশোর গ্যাংকে সমূলে উৎপাঠন করা হোক। সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে মাদককে পুরো নির্মূল করা সম্ভব না হলেও কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রন করা হোক । আমরা আপনার দ্রুত পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছি।
লেখক : সাংবাদিক, সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক।