মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, অবহেলিত চা শ্রমিকদের ন্যায় সংগত দাবিটুকু মেনে নিন-শাহাজাদা এমরান

সময়ের কড়চা ....
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২ মাস আগে

বাংলাদেশের বিভিন্ন পেশাদার শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত,বঞ্চিত,শোষিত ও নিষ্পেষিত শ্রমিক হচ্ছে চা শ্রমিকেরা। এতদিন আলোতে আসেনি বলে কেউ জানেনি। আজ যখন তাদের আন্দোলনের কারণে মানুষ জানতে পেরেছে তখন দেখছে একজন দিন মজুর হিসেবে কত নিম্ম তাদের পারিশ্রমিক। অথচ বাংলাদেশ বিশে^র দশম চা উৎপাদনকারী দেশ। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা চা রপ্তানি করে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছি। যাদের শ্রম ও ঘামের উপর আমাদের রির্জাভ বাড়ে, আমরা ৪১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত করার স্বপ্ন দেখি,সেই শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি হচ্ছে মাত্র ১২০ টাকা।

চা শ্রমিক ব্যতিত দেশের এমন কোন দিনমজুর পাওয়া যাবে না , যাদের দৈনিক আয় তিনশ টাকার নিচে আছে। ২৬৭টি চা বাগানের প্রায় লক্ষাধিক শ্রমিক মাত্র তিনশ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন করে আসছে গত ৯ আগস্ট থেকে।
জানা গেছে, দৈনিক মজুরী ৩০০ টাকার দাবিতে গত ৯ আগস্ট থেকে ৪ দিন ২ ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করেন চা শ্রমিকরা। এরপর তারা ১৩ আগস্ট থেকে পূর্নদিবস কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করেন।

২০ আগস্ট বিকেলে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, বাগান মালিক প্রতিনিধি ও চা শ্রমিক নেতাদের মধ্যে বৈঠক হয়। বৈঠকে তাদের দৈনিক মজুরি ১৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সরকারের এই ঘোষনার সাথে সাথে শ্রমিকদের একটি অংশ মেনে নিলেও বৃহৎ অংশটি তাৎক্ষনিক তা প্রত্যাখান করে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও যৌক্তিক কারণেই। পরবর্তী পর্যায়ে অধিকাংশ শ্রমিকদের অনড় অবস্থানের কারণে ১৪৫ টাকা দৈনিক মজুরির দাবি মেনে নেওয়া শ্রমিকরাও প্রত্যাখান করা শ্রমিকদের সাথে একাত্মতা পোষন করে ২১ আগস্ট থেকে চলমান আন্দোলন অব্যাহত রেখে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন।

২১ আগস্ট রোববার গণমাধ্যমকে চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, ‘আন্দোলন চলমান থাকবে। আমি তো শ্রমিকদের বাইরে যেতে পারবো না। আমরা বলেছিলাম কিন্তু শ্রমিকরা মানেনি। প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ রাখতে তখন আন্দোলন স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছিলাম। কিন্তু শ্রমিকরা না মানার কারণে আবারো আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছি।’

দেশে ক্রমবর্ধমান হারে চা জমি বাড়ছে। ১৯৪৭ সালে যেখানে ২৮,৭৩৪ হেক্টর ভূমিতে চা চাষ হতো , ২০১২ সালে এসে সেখানে ৫৬,৮৪৬ হেক্টরেরও বেশি ভূমি চা চাষ শুরু হয়। ২০২২ সালে এসে দেশের মোট ১৬৬টি চা বাগানের ১,১৩,০৮৭ হেক্টর (২,৭৯, ৪৩৯ একর) জমিতে চাষ হচ্ছে। ফলে নিজের চাহিদা মিটিয়ে প্রতি বছরই আমরা গেল বছর থেকে বেশী করে চা রপ্তানী করছি আর বিনিময়ে পাচ্ছি বৈদেশিক মুদ্রা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, যে শ্রমিকদের হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের কারণে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছি তাদের বর্ধিত শ্রমের মূল্য কি ১৪৫ টাকা হতে পারে ?

দেশের যে কয়েকটি জেলায় চায়ের চাষ হয় তার মধ্যে সবেচয়ে বেশী হচ্ছে মৌলভী বাজার জেলায়। মৌলভী বাজার জেলাসহ চা উৎপানকারী জেলা গুলোর সহযোগি গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে কথা বলে জানতে পারছি, দেশের অন্যান্য শ্রমিকদের তুলনায় চা শ্রমিকরা অনেক বেশী অসহায় এবং নিপেড়িত। তারা এই দেশের নাগরিক হলেও দেশীয় নাগরিক সুযোগ সুবিধার আলো তাদের ছাপড়ি ঘরে পৌঁছে না। এমনকি ছুটি নিয়েও চা শ্রমিকদের সাথে চরম বৈষম্য করা হচ্ছে। এক দিকে যেমন তারা পর্যাপ্ত রেশন পাচ্ছে না, অপর দিকে রেশনের মান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। প্রতিটি বাগানে নেই মানসম্মত চিকিৎসা কেন্দ্র, পর্যাপ্ত খাবার পানি ও শৌচাগারের অভাবতো রয়েছেই।

চা শ্রমিকদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ জীবন নিশ্চিত করতে নেই কোন পর্যাপ্ত সরকারি উদ্যোগ। তাই প্রত্যেক বাগানে প্রাথমিক স্কুল ও প্রত্যেক ভ্যালিতে উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন এখন সময়ের দাবি। চা শ্রমিকের শিক্ষিত সব সন্তানের চাকরির নিশ্চয়তা এবং সব জাতি-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটনোর জন্য সার্বিক পরিকল্পনা নিয়ে তা দ্রুত ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

মৌলভীবাজার জেলার শমসেরনগরে ফাঁড়ি কানিহাটি চা-বাগানের এক চা শ্রমিকের ছেলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র সন্তোষ রবিদাস অঞ্জন । সে তার ফেসবুকে চা শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকা নিয়ে যে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন, তা বর্তমানে সারা দেশে টক অব দ্যা কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে।সন্তোষ চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন, আমরা যারা ৪১ সালে মধ্যম আয়ের দেশের নাগরিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছি , সেই স্বপ্ন তাদের কাছে নিছক স্বপ্ন বা রূপ কথার গল্প ছাড়া আর কিছুই না।

লেখাটি শেষ করতে চাই মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি একটি অনুরোধ জানিয়ে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,আপনিই বলেন, বর্তমান বাজার ব্যবস্থা তথা দেশের সার্বিক আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটের যে অবস্থা তাতে কি একজন শ্রমিকের ১৪৫ টাকা মজুরি দিয়ে তার চুলায় আগুন জ¦লবে ? নিশ্চয়ই জ¦লবে না। চা শ্রমিকেরা যে দৈনিক ৩০০ টাকার মজুরি দাবি করছে তা কি খুব বেশী দাবি করছে । এমন না যে, চা শিল্পটি সরকারের ভর্তুকি দিয়ে চলছে। যে শিল্পটি বিশে^র রপ্তানীকারী দেশ গুলোর মধ্যে দশম স্থান অর্জন করে আছে, যে শিল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর আমাদের কোটি কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে নিয়ে আসছে , সেই শিল্পের শ্রমিকেরা কেন দৈনিক নূন্যতম ৩০০ টাকা মজুরি পাবে না ।
প্লিজ, মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, আপনি আপনার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করুন ।১৪৫ টাকার মজুরির প্রস্তাব প্রত্যাহার করে শ্রমিকদের ন্যায় সংগত দাবি অনুযায়ী ৩০০ টাকা মজুরি প্রদান করুন । দেখবেন, অসহায়,অশিক্ষিত ও অবহেলিত এই চা শ্রমিকরা আপনাকে মনে রাখবে।
লেখক : সাংবাদিক,সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক।০১৭১১-৩৮৮৩০৮