মাননীয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, লাকসাম – মনোহরগঞ্জে কী ভিন্নমত পোষন করা নিষিদ্ধ ?- শাহাজাদা এমরান

সময়ের কড়চা :
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১ সপ্তাহ আগে

আবারো রক্তাত্ব হলো কুমিল্লা-৯ (লাকসাম – মনোহরগঞ্জ ) নির্বাচনী এলাকা । যেই নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন আমাদের স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি মো. তাজুল ইসলাম। গত শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) নিজ নির্বাচনী এলাকা থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বিপুলাসার বাজারে মারাত্মক রক্তক্ষয়ী হামলার শিকার হন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান,সাবেক মন্ত্রী ও এমপি বরকত উল্লাহ বুলু,তার স্ত্রী ও স্থানীয় অন্তত ৮ জন নেতাকর্মী। হামলায় বরকত উল্লাহ বুলুর মাথা ফেটে যায় ও স্থানীয় ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান , উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-আহবায়ক শরিফ হোসেনের দেহ রক্তে রঞ্জিত হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শরীফ হোসেনের অবস্থা আশংকাজনক বলে জানা গেছে।

ওইদিন কী মনোহরগঞ্জের  বিপুলাসারে বিএনপির কোন রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল বা এমন কোন আন্দোলন ছিল যা এলাকায় শান্তি ভঙ্গের কারণ হতে পারে ? ১৮ সেপ্টেম্বরের দৈনিক আমাদের কুমিল্লা , অনলাইন নিউজ পোর্টাল কুমিল্লার জমিনসহ  বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের সূত্রে জানতে পারলাম যে, না কোন রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না । ছিল না কোন সামাজিক অনুষ্ঠানও। নিছক একটি সামাজিক ভদ্রতা ছিল।

বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান বুলু সাহেব তার নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি বাড়ি থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে মনোহরগঞ্জের স্থানীয় নেতারা যখন জানতে পেরেছেন,  বুলু সাহেব বিকাল বেলা এ রাস্তা দিয়ে ঢাকায় যাবেন তখন তারা অনুরোধ করলেন যে, তিনি যেন বিপুলাসার এক কাপ চা খেয়ে যান।  যেহেতু বুলু সাহেব জাতীয় পর্যায়ের নেতা তাই নেতাকর্মীদের স্বাভাবিক আবদার তিনি  রক্ষা করেছেন এবং স্থানীয় মক্কা হোটেল নামক একটি রেস্টুরেন্টে তিনি যাত্রা বিরতি করেন। বিকাল ৫টা কি সাড়ে ৫টার দিকে চা খাওয়ার শেষ পর্যায়ে একদল দূর্বৃত্ত দেশীয় নানা অস্ত্র নিয়ে তাদের উপর হায়েনার মত হামলা করে এবং বুলু সাহেব, তার স্ত্রী, শরীফ চেয়ারম্যানসহ অন্তত ৮ জন নেতাকর্মী মারাত্মক আহত হন।  এই হামলার জন্য স্থানীয় বিএনপি এবং বরকত উল্লাহ বুলু সাহেব আওয়ামী লীগ , যুবলীগ ও ছাত্রলীগকে দায়ী করে বলেছেন, স্থানীয় বিপুলাসার ইউপির চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি ইকবাল মাহমুদের হেলমেট বাহিনী এ ন্যাক্কারজনক হামলা চালিয়েছে।

বরকত উল্লাহ বুলু সাহেবের মত একটি জাতীয় রাজনৈতিক নেতার নিছক চা চক্রে এমন রক্তক্ষয়ী সন্ত্রাসী হামলার খবরে স্থম্ভিত গোটা কুমিল্লা জেলা। বাক্ স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত লাকসাম মনোহরগঞ্জের বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের বক্তব্য, এতদিন তো আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচী পালন করতে দিত না। এখন দেখা গেল আমরা দোকানে বসে চা খেতেও পারব না।

রবিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন,কুমিল্লায় বিএনপি নেতা বুলুর ওপর হামলা হয়েছে।  কীভাবে হয়েছে তা তদন্ত করা হবে। তিনি বলেন, ‘কেউ অতি উৎসাহী হয়ে কিছু করছে কিনা, তাও দেখা হবে। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তদন্দ রিপোর্ট আদৌ প্রকাশিত হবে কি না এ নিয়ে সংশয় না রেখে কোন উপায় নেই।

মাননীয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম সাহেবের নির্বাচনী এলাকা লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে। মনোহরগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে ১১টি ইউনিয়ন আর লাকসাম উপজেলায় ১টি পৌরসভা ও ৭ টি ইউনিয়ন রয়েছে। এই দুই উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার,সংরক্ষিত মেম্বার, চেয়ারম্যান, উপজেলার চেয়ারম্যান, মহিলা ও পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র,কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সির কেউ সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হননি। এর মধ্যে শুধুমাত্র মনোহরগঞ্জের বিপুলাসার ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে, মৈশাতুয়া ইউনিয়নের ১টি ওয়ার্ডে ও ঝলম উত্তর ইউনিয়নের ১টি ওয়ার্ডে মেম্বার পদে নির্বাচন হয়েছিল দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীদের না বসাতে পারার কারণে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম সাহেব মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী হয়ে চেষ্টা করছেন স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে। অথচ, তার নিজ নির্বাচনী এলাকার দুটি উপজেলার সর্বশেষ অনুষ্ঠিত স্থানীয় পর্যায়ের সকল নির্বাচনেই তার প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এখানে ভিন্নমতকে খুব কঠোর হস্তে দমন করা হচ্ছে বলে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ।

লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলার  বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, এই দুই উপজেলায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর রাজনীতি করার জন্য কিছুটা স্পেস পেলেও ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর তাদের সামগ্রিক রাজনীতিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছে। এলাকায় থেকে  নূন্যতম  কোন রাজনৈতিক প্রচারণা তারা চালাতে পারেন না। কয়েকজন নেতাকর্মী একত্রিত হয়ে রাস্তায় নামার নৈতিক সাহসটুকু হারিয়ে ফেলেছেন আওয়ামীলীগের হামলা ও মামলার নির্যাতনের কারণে।

গত মাসে লাকসামের এক সাংবাদিক যিনি বিএনপির রাজনীতির সাথেও জড়িত । কেন তিনি আওয়ামী লীগের হামলার বিষয়ে নিউজ করার জন্য থানার ওসি সাহেবকে ফোন করেন- এই অভিযোগে তাকে লাকসাম জংশন থেকে তুলে নিয়ে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে বেধরক নির্যাতন নিপিড়ন করে। পরবর্তী পর্যায়ে আর লাকসামে থাকবে না, বিএনপির রাজনীতি করবে না, সাংবাদিক হিসেবে ওসিকে ফোন দিবে না এই মর্মে প্রতিজ্ঞা নিয়ে মোবাইল ও নগদ টাকা রেখে রাত ২টার দিকে কুমিল্লা নগরীর রেইসকোর্সের ওভার ব্রিজের নিকট ফেলে চলে যায়।

আড়াই দশকের বেশী সময় ধরে কুমিল্লার গণমাধ্যমে কাজ করি। জেলার এমন কোন উপজেলার এমন কোন ইউনিয়ন নেই আল্লাহর রহমতে যাওয়া হয়নি। কিন্তু অত্যান্ত বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করছি , ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে লাকসাম- মনোহরগঞ্জে যেভাবে ভিন্নমতকে দমন-নিপীড়ন করা হচ্ছে জেলার আর কোন উপজেলায় এমনটি ঘটছে কিনা আমার জানা নেই। এই সময়ে এই দুই উপজেলার প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি নির্বাচিত হচ্ছে বিনা ভোটে। গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য হচ্ছে বাক স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা। অথচ যেখানে বিরোধী দল গুলো ঘর থেকে উঠানেই দাঁড়াতে পারছে না,  সেখানে আবার কথা বলার সুযোগ কোথায় ?

আমরা লক্ষ করেছি, প্রতিটি সরকারের সময়েই অতি উৎসাহি কিছু লোক থাকে আবার কোথায়ওবা থাকে হাইব্রিড ।এই অতিউৎসাহি ও হাইব্রিডার গুলো প্রতিটি সরকারের অজর্ননকেই ম্লান করে দেয়। কিন্তু দু:খজনক বিষয় হচ্ছে, নেতা নেত্রীরা সময় থাকতে বুঝেন না। যখন বুঝেন তখন চোখে শর্ষে ফুল দেখা ছাড়া তাদের আর করার কিছুই থাকে না।

লাকসাম- মনোহরগঞ্জ এলাকা থেকে একাধিকবার নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম সাহেবকে অনুরোধ করে বলব, আপনার নির্বাচনী এলাকায় গণতন্ত্র আজ পদদলিত । বাক্ স্বাধীনতা আজ নিগৃহিত ।কঠোর হস্তে দমন করা হচ্ছে ভিন্নমতকে। আপনার মন্ত্রনালয়ের অন্যতম কাজ হচ্ছে স্থানীয় সরকারের  কাঠামো গুলোকে শক্তিশালী করা। অথচ, আপনার নির্বাচনী এলাকার দুই উপজেলার কোথায়ও এখন সরাসরি ভোটে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি নেই। সবাই নির্বাচিত হয়েছে বিনা ভোটে।

সর্বশেষ , গত ১৭ সেপ্টেম্বর শনিবার বিকালে আপনার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বিপুলাসার বাজারে এটি রাজনৈতিক তো নয়ই এমনকি সামাজিক অনুষ্ঠানও না। শুধু মাত্র একটি চা চক্রে যেভাবে পিটিয়ে সাবেক এমপি বুলুকে মাথা ফাটিয়েছে,  অন্য নেতাকর্মীদেরকেও একই ভাবে আহত করেছে তা আপনার, এলাকার, জেলার ও সামগ্রিক ভাবে জাতীয় রাজনীতির জন্যও একটি দু:খজনক ,বেদনাদায়ক ঘটনা। কুমিল্লার সহনশীল রাজনীতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথেও এটি যায় না। কারণ, বাহিরের  একজন নেতাকে একটি চা চক্রে এভাবে হামলা করা সমীচিন হয়নি।

আমি বিশ্বাস করতে চাই এই হেন কাজটি করতে আপনি বলেননি। কিন্তু এই অপকর্মটি যারা করেছে তাদের খুঁজে বের করে আপনার সুনামের স্বার্থেই তাদের আইনের আওতায় আনুন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন। যাতে নূন্যতম পক্ষে আমরা মিডিয়া কর্মীরা এটা বলতে পারি যে, বরকত উল্লা বুলু সাহেবের হামলার ঘটনাটি ছিল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী রোড ম্যাপ ঘোষনা করেছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার ও বিরোধীদল গুলো ক্রমান্বয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামীলীগ-বিএনপিসহ জেলার  তথা দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল গুলোকে অনুরোধ করবো, আপনারা যার  যার বক্তব্য নিয়ে দলের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে জনগনের কাছে আসুন, কথা বলুন। কিন্তু কেউ কারো বাক্ স্বাধীনতা প্রয়োগে হস্তক্ষেপ করবেন না। সহনশীল হলে পরবর্তী পর্যায়ে আপনিও সহনশীলতা আশা করতে পারবেন।

আর জেলা  ও পুলিশ প্রশাসনকে অনুরোধ করে বলব, আপনারা ভুলে যাবেন না যে, আপনারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। চট্রগ্রামের জেলা প্রশাসকের মত অন্ধ আনুগত্য প্রকাশ করে গোটা প্রশাসনকেই বিতর্কিত করবেন না যেন ।

লেখক : সাংবাদিক, সংগঠক ও কলাম লেখক।