কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় প্রবাসীর স্ত্রীর (২৫) ওপর বর্বর ধর্ষণের ঘটনা ও সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার মূল অভিযুক্ত ফজর আলীকে (৩৫) রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একইসঙ্গে ভিডিও ধারণ এবং ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে আরও চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার হওয়া, চার আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। রোববার (২৯ জুন) বিকেল সাড়ে ছয়টায় মুরাদনগর থেকে তাদের কুমিল্লার ১১ নম্বর আমলী আদালতে নেয়া হয়। আদালত তাদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
রোববার (২৯ জুন) সকালে গ্রেফতারের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার নাজির আহমেদ খান। এর আগে রাত দেড়টার দিকে পুলিশ সুপারের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মূল অভিযুক্ত ফজর আলীকে গ্রেফতারের পর তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভিডিও ধারণ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট চারজনের বিরুদ্ধেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মামলার এজহারে ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৬ জুন বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে মুরাদনগরের রামচন্দ্রপুর পাঁচকিত্তা গ্রামে ফজর আলী একই গ্রামের এক প্রবাসীর বাড়িতে ঢুকে তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করেন। ধর্ষণের সময় ওই নারী ঘরের দরজা না খুলতে চাইলে ফজর আলী জোরপূর্বক দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং ধর্ষণের পরপরই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ঘটনার সময় পাশের বাড়িতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি পূজা অনুষ্ঠান চলছিল। চিৎকার শুনে ভুক্তভোগীর চাচী স্বরসতী বর্মণ পাশের বাড়ি থেকে লোকজন ডেকে এনে তাকে উদ্ধার করেন। এদিকে, স্থানীয়দের হাতে আটক হয়ে মারধরের শিকার হন অভিযুক্ত ফজর আলী। পরে তাকে কুমিল্লা শহরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখান থেকে তিনি পালিয়ে যান। দীর্ঘ চেষ্টার পর শনিবার রাতে রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।ঘটনার পরদিন শুক্রবার দুপুরে ভুক্তভোগী নারী মুরাদনগর থানায় মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, প্রায় ১৫ দিন আগে ওই নারী স্বামীর বাড়ি হোমনা উপজেলা থেকে বাবার বাড়ি পাঁচকিত্তা গ্রামে সন্তানদের নিয়ে বেড়াতে আসেন। ফজর আলীর সঙ্গে তাদের পরিবারের টাকা লেনদেনের সূত্রে পরিচয় ছিল। সেই সুযোগ নিয়ে ওই রাতেই ফজর আলী বাড়িতে এসে দরজা খোলার জন্য চাপ দিতে থাকেন। ঘটনার সময় উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি মোবাইল ফোনে ধর্ষণের পর বিবস্ত্র অবস্থায় থাকা ওই নারীর ভিডিও ধারণ করেন এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন, যা পরে ভাইরাল হয়ে পড়ে। এদিকে, সনাতন ধর্মাবলম্বী ওই নারীর বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তাঁর ছোট ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, চার হাজার টাকা সুদের বিনিময়ে এক মাসের জন্য তাঁরা ফজর আলীর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ধার নেন। কয়েক দিন আগে ওই টাকা ফেরত দেওয়ার সময় ছিল; কিন্তু তাঁরা টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। ফজরের কাছে আরও কয়েক দিন সময় চান; কিন্তু তিনি তা না দিয়ে হুমকি দিতে থাকেন। বৃহস্পতিবার রাতে সেই টাকার সূত্র ধরে বাড়িতে এসে তাঁর বোনকে ধর্ষণ করেন ফজর। বোনের বিবস্ত্র অবস্থার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে ওই নারীর ভাইয়ের ভাষ্য, ভাই শাহ পরানের সঙ্গে ফজর আলীর বিরোধ আছে। সেই বিরোধের জের ধরে শাহ পরানই ঘটনার সময় তাঁদের বাড়িতে লোকজন পাঠান। তাঁরাই তাঁর বোনকে বিবস্ত্র অবস্থায় মারধর করে সেই ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এদিকে, রোববার ভুক্তভোগী নারী পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে আরেকটি মামলা করেন। ওই মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এদিকে, ঘটনার মাত্র ৩ দিনের মাথায় হঠাৎ করেই ওই ভুক্তভোগী নারী মামলা তুলে নেওয়ারও সিদ্ধান্ত জানালেন গণমাধ্যমকর্মীদের। যা জন্ম দিয়েছে নতুন করে প্রশ্নের। ভুক্তভোগী নারীর ভাষ্যে, “আমি নিজেই মামলা করেছি, কেউ চাপ দেয়নি। কিন্তু এখন আমি মামলা তুলে নিচ্ছি, কারণ আমার স্বামী আমাকে গ্রহণ করছেন না। আমার সঙ্গে কথা বলছেন না, ফোনও ধরছেন না।” এছাড়া, মামলা দায়েরের পর থেকেই এলাকায় গুঞ্জন শুরু হয়, ভুক্তভোগী ও মূল অভিযুক্তের মধ্যে নাকি আগে থেকেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কেউ কেউ বলছেন, এটি ‘পরকীয়া’র পরিণতি। তবে এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছেন ওই নারী। “ফজর আলীর সঙ্গে আমার কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল না। ওর সঙ্গে শুধু টাকা-পয়সা নিয়ে কথা হতো। ও আমাকে টাকা দিত, আমি ফিরিয়ে দিতাম,”এমনটাই জানান ভুক্তভোগী। মুরাদনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুর রহমান জানান, ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে ফজর আলীকে প্রধান আসামি করে মামলা করেছেন। মামলার তদন্তে অভিযুক্তদের শনাক্ত করে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মূল অভিযুক্তসহ গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।