রাজনীতি কি পয়েন্ট অব নো রিটার্নে চলে যাচ্ছে ? -শাহাজাদা এমরান

সময়ের কলাম
শাহাজাদা এমরান
প্রকাশ: ১ মাস আগে

ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দেশের রাজনীতি। শীত যত ঘনিয়ে আসছে রাজনীতির উত্তাপও তত বেড়ে চলছে। আমাদের দেশে শীতকালকে বলা হয় রাজনীতির মাঠ গরমের মহোৎসব। টানা তিন টার্মে ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সম্ভবত মাঠের বিরোধী দল বিএনপির দ্বিতীয় দফার চলমান আন্দোলনকে (বিভাগীয় সমাবেশ) নিয়ে নতুন করে হিসাব কশতে শুরু করেছে। বিএনপির আন্দোলনকে ভয় পাই না, তাদের আন্দোলনের সাথে জনগনের সম্পৃক্ততা নেই ইত্যাদি রাজনৈতিক কথা ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী ও প্রধান সাড়ির নেতারা মুখে যতই বলুক না কেন, তারা যে খুব একটা স্বস্তিতে নেই তা তাদের কথা বলার ভঙ্গি দেখলেই বুঝা যায়।

অপরদিকে, চট্রগ্রামের পর ময়মনসিংহেও শত বাধা বিপত্তির মধ্যেও বিভাগীয় সমাবেশ যেভাবে মহাসমাবেশে পরিণত হয়েছে তাতে বিএনপি তথা সরকার বিরোধী দল গুলো ক্রমেই এক দফার আন্দোলনে যেতে আশান্বিত হয়ে উঠছে। গত ১২ অক্টোবর চট্রগ্রামে প্রথম বিভাগীয় সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, হয় বিজয়, না হয় মৃত্যু। আর ১৫ অক্টোবর ময়মনসিংহে দ্বিতীয় বিভাগীয় সমাবেশে তিনি বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই এ সরকারকে হটিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে বাধ্য করা হবে। সার্বিক অবস্থা দেখে প্রশ্ন জাগছে, রাজনীতি কি পয়েন্ট অব নো রিটার্নে চলে যাচ্ছে?

১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর একটানা আর কোন সময়ই এত দীর্ঘ সময় এভাবে ক্ষমতার বাহিরে থাকেনি। ২০০৭ সাল থেকে তারা সরকারের বাহিরে। বিশেষ করে সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারে আমলে অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এরপর আওয়ামী লীগ তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। তারই ফলশ্রুতিতে ২০১৪ সালের দশম ও ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পূণরায় বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে তারা। এই দুটি নির্বাচন নিয়ে শুধু দেশেই নয় বর্হিবিশে^ও গ্রহণযোগ্যতা হারায় আওয়ামী লীগ। এমনকি এই দুটি নির্বাচন নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগও সন্তুষ্ট যে নয়, সময়ে সময়ে তা তাদের নেতা নেত্রীদের কথা বার্তায় টের পাওয়া যায়। বিএনপি চেষ্টা করেও ঐ দুটি নির্বাচনে তত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করতে পারেনি। অবশ্য ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য। কিন্তু এই নির্বাচনের অধিকাংশ আসনেই নির্বাচনের আগের রাতেই ভোট হয়ে যায়।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে যে জ¦ালাও পোড়াও আন্দোলন হয়েছিল সেই বিতর্কিত আন্দোলনের দায় বিএনপিকে নিতে হয়েছিল। যদিও বিএনপি বরাবরই বলে আসছে, সরকারি দল এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থা গুলোই এই অপকর্ম করেছে, তারা নয়।

২০১৮ সালের চরম বিতর্কিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির বোধোদয় হয়েছে বলে মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল। এরপর তারা সরকার বিরোধী আন্দোলন নয়, নিজেরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। বিএনপিসহ দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন গুলো গোছানোর কাজে হাত দেয় তারা। সাথে সাথে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে হটকারিমূলক কর্মসূচিতে না গিয়ে জনগণ সম্পৃক্ত কর্মসূচি গুলোতে মনোনিবেশ করে। পাশাপাশি দেশের সরকার বিরোধী অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাথেও সংলাপ শুরু করে। সব বিরোধী দলকে একই প্লাট ফর্মে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে প্রথম দফার সংলাপ শেষ করে দ্বিতীয় দফার সংলাপ শুরু করেছে বিএনপি অপরাপর বিরোধী দল গুলোর সাথে।

বর্তমানে একেবারে ক্যালকুলাটারের হিসাব কষে আন্দোলনের কর্মসূচী দিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। তাদের গত এক বছরের আন্দোলনের ধরণ পর্যালোচনা করলে বুঝা যাবে যে, তারা আস্তে আস্তে সরকার বিরোধী চুড়ান্ত আন্দোলনে যাওয়ার একটি যৌক্তিকতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে তেল গ্যাসের দাম বৃদ্ধির দাবির প্রতিবাদে ভোলা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জে বিএনপির ৫জন নেতাকর্মী নিহত হলেও এর সহিংসতার দায় কিন্তু বিএনপিকে নিতে হয়নি। বরং এর পুরো দায় গিয়ে পড়েছে আইনশৃংখলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের উপর। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবার সহিংসতা পরিহার করে যেভাবে আন্দোলনকে এগিয়ে নিচ্ছেন এবং এই আন্দোলনেও ক্রমান্বয়ে যেভাবে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা ঘটানোর চেষ্টা করছেন তা দেখে দলটি সচেতন মহলের প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন নি:সন্দেহে।

অপরদিকে, বিএনপির এই আন্দোলনে শুরু থেকেই ক্ষমতাসীন দল ও আইনশৃংখলা বাহিনীর মারমুখী আচরণে ইতিমধ্যে ৫টি তাজা প্রাণ হারাতে হয়েছে বিএনপিকে। আহত হয়েছে অসংখ্য নেতাকর্মী। সমালোচনা হচ্ছে মিডিয়া থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি প্রান্তরে। চট্রগ্রামের পর সর্বশেষ, ময়মনসিংহে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়ে ক্ষমতাসীন দল অঘোষিত হরতাল পালন করেও কিন্তু লাভের মুখ দেখছে বলে মনে হয়নি। কারণ, বিএনপির নেতাকর্মীরা বড় যানবাহনের অভাবে যেভাবে ছোট যানে করে ভেঙ্গে ভেঙ্গে, পায়ে হেঁটে কিংবা নদী পথ দিয়ে সমাবেশে এসেছে, কেউবা আবার সরকার যে বাধা দিবে এই আগাম বার্তা পেয়ে আগের রাতেই এসে সমাবেশ স্থলে এসে পৌঁছে ময়মনসিংহের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ সমাবেশ পরিণত করেছে। রাস্তায় রাস্তায় নেতাকর্মীদের আটকিয়েও কিন্তু সমাবেশে মানুষের ঢল আটকানো যায়নি।

দৈনিক মানবজমিন তাদের অনলাইন এডিশনে এদিন লিড শিরোনাম করেছে, ময়মনসিংহের গণসমাবেশ, বাধার পাহাড়, নেতাকর্মীদের ঢল। এতেই অনুধাবন করা যায় সরকার ও আওয়ামী লীগ শত চেষ্টা করেও ময়মনসিংহে বিএনপির গণজোয়ার দমাতে পারেনি।

দেশের বাকি বিভাগীয় সমাবেশ গুলো সম্পন্ন করে সর্বশেষ আগামী ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপি বিভাগীয় গণসমাবেশের ইতি টানবে। ধারণা করা যাচ্ছে, সেদিন ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ থেকে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে যেতে পারে বিএনপি। অথবা এক দফার আন্দোলনের বিষয়ে আরেকটু সময় নিতে পারে দলটি। তবে সেই দিন বিএনপির পক্ষ থেকে একটি বিশেষ বার্তা থাকতে পারে যা তাদের আন্দোলনকে আরো তরান্বিত করতে পারে।

আবার, বিএনপির বর্তমান রাজনীতির গতি প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে বুঝা যাবে যে, আগামী ১০ ডিসেম্বরই সরকার পতনের এক দফার চুড়ান্ত আন্দোলনে যাবে না দীর্ঘ দিনের হোচট খেয়ে আসা এই দলটি। কারণ, নির্বাচন কমিশনের মতে, ২০২৩ সালের শেষ কিংবা ২০২৪ সালের প্রথম দিকে যদি নির্বাচন দেওয়া হয় তাহলে বিএনপিকে আরো এক বছর সরকার বিরোধী আন্দোলনটা চালিয়ে নিতে হবে। আওয়ামী লীগের মত একটা শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে যারা দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে টানা ক্ষমতায় এবং নিচ থেকে একেবারে শীর্ষ পর্যন্ত প্রশাসন যন্ত্র যাদের একেবারেই কবজায় তারা যে অতি সহজে বিএনপির তত্বাবধায়ক দাবি মেনে নিবে না তা হলফ করেই বলা যায়। সুতরাং এক দফার আন্দোলন ঘোষণা করে এত দীর্ঘ সময় বিএনপির পক্ষেও কনটিনিউ করা হবে অত্যন্ত ডিফিকাল্ট। পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, এবার হয়তো বিএনপি এই ধরণের রিস্ক নিবে না। তারা চুড়ান্ত আন্দোলনটি একেবারে শেষ পর্যায়ে গিয়ে ঘোষণা করতে পারে। যাতে স্বল্প সময়ে অলআউট আন্দোলনে দাবী আদায় করতে পারে।

বর্তমানে যেভাবে বিএনপির আন্দোলনে তারা গতি আনার চেষ্টা করছে তা অব্যাহত রেখে একটা স্বল্প সময়ের কঠিন আন্দোলন বিএনপিকে গড়ে তুলতে হবে তাদের বিজয় নিশ্চিত করতে হলে। শোনা যাচ্ছে, আন্দোলনের ধারাবাহিকতার এক পর্যায়ে সংসদ থেকে পদত্যাগ, সচিবালয়ে থাকা এন্ট্রি আওয়ামী লীগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের দিয়ে ১৯৯৬ সালের জনতার মঞ্চের আদলে কিছু করাসহ এক অসহযোগ আন্দোলনে যেতে পারে দলটি।
দিন যত এগিয়ে যাচ্ছে দেশের সামগ্রিক রাজনীতি ততই জটিল পথে যাচ্ছে।

ক্ষণেক্ষণে নতুন মোড় নিচ্ছে রাজনীতি। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত রাজনীতির মাঠ যে উত্তপ্ত থাকবে তা বলাই বাহুল্য। আওয়ামী লীগ বিএনপি দুই দল এখন মরিয়া হয়ে উঠছে। কেউ কাউকে নূন্যতম ছাড় দিতে নারাজ। গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য্য হচ্ছে একে অপরের সাথে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া। আপাতত দৃষ্টিতে এ ধরনের সংলাপের কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কারণ, আওয়ামী লীগ চাইবে তাদের ক্ষমতায় থাকতে হলে নিজের অধীনে নির্বাচন দেয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। আর বিএনপি ভালো করেই জানে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া তাদের ক্ষমতায় আসার নূন্যতম কোন সুযোগ নেই। সুতরাং দুই দলেরই পৃথক কিন্তু এজেন্ডা অভিন্ন। অর্থাৎ ক্ষমতা ধরে রাখা কিংবা ক্ষমতায় যাওয়া। ক্ষমতাই যখন সর্বশেষ কথা তখন সেখানে অন্য বিষয় কিভাবে আসবে তা বোধগম্য নয়।

জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, দলীয় কর্মসূচিতে গুলো করে নেতা-কর্মীদের হত্যার প্রতিবাদে এবং নির্বাচনকালে নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বিএনপির চলতি রাউন্ডের আন্দোলন যে শত বাধার পরেও নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জনসম্পৃক্ততা বাড়ছে তা আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠা সংগঠন আওয়ামী লীগের অজানা নয়। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা নিশ্চয়ই আন্দোলনের গতি প্রকৃতি অনুধাবন করছেন এবং খোঁজ খবর নিচ্ছেন।

এখন দেখার বিষয়, বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল যখন এক দফার আন্দোলন নিয়ে মাঠে নামবে তখন দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এর বিপক্ষে কি ধরনের ভূমিকা রাখবে তা সময়ই বলে দিবে। প্রশাসন যন্ত্র বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা তখন কি থাকবে সেটাও অবশ্যই বিবেচ্যতার দাবি রাখে। বেশ কিছু জায়গায় পুলিশের অতিউৎসাহী ভূমিকা ছাড়া অধিকাংশ জায়গাই পুলিশ এখনো কিছুটা সহনীয় অবস্থায় আছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা প্রশাসনযন্ত্র কোন দিকে যাবে তা অনেকটা নির্ভর করবে বিরোধী দলের সামগ্রিক শক্তিমত্তার ওপর। কারণ, ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে প্রশাসনের লোকেরা কিন্তু রিস্ক নেয় না, রিস্ক দেয়। যখন দেখবে সরকারের পতন অত্যাসন্ন তখন তারা বিরোধী দলের দিকে ঘুরে দাঁড়াবে। আবার যখন দেখবে বিরোধী দল পারবে না তখন তারা তাদের ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালিয়ে সরকারের আস্থা থাকার চেষ্টা করবে।

রক্তক্ষয় ছাড়া আমাদের দেশের কোন আন্দোলন সফল হয়েছে এমন উদাহরণ নেই। তারপরেও আমরা প্রত্যাশা করব, গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য্য হলো আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা। বর্তমান রাজনৈতিক সংকট আলোচনার মাধ্যমেই শেষ হোক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের কুমিল্লা ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, কুমিল্লা জেলা। মোবাইল: ০১৭১১-৩৮৮৩০৮।