সাম্প্রতিক জলবায়ু ও পরিবেশ ভাবনা

অধ্যাপক ডা: মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২ মাস আগে

গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনে পানি নিয়ে তেমন কোন আকর্ষনীয় দৃষ্টি ছিল না, কিন্তু এ বিষয়ে মনযোগ সৃষ্টি করা অতীব প্রয়োজনীয়। জলবায়ুর পরিবর্তন যেভাবে মানুষের জীবনের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলে তার প্রায় সবই পানির মধ্য দিয়ে ঘটে। পানি সংকট নিয়ে সামান্য একটু আলোচনা করেছেন বিশ্বনেতারা। সেখানে তাঁহারা পানির ব্যাপারে তড়িৎ পদক্ষেপ নিতে প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন এবং জলবায়ু সংকটের মূলেই পানি সংকট রয়েছে বলে স্বীকার করেন। বিশ্বের অনেক অংশে বৃষ্টির ছবি পাল্টে গেছে। অনেক বৃষ্টি ও ঘনঘন বন্যায় সামগ্রিক পানির উৎস সমূহ দুষিত হচ্ছে। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি নষ্ট করে দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদী খরা দেখা দেয়ায় নদী-নালা ও খাল-বিল শুকিয়ে যাচ্ছে যেগুলো প্রকৃতি ও মানুষকে বেঁচে থাকায় সুবিধা দিচ্ছিল । কিন্তু এ সংকট মোকাবেলায় তেমন কোন উদ্যোগই নেয়া হয়নি। তবে আলোচনায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ ও সম্প্রদায়গুলির সহায়তা নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত তা অবশ্য অনেকেই উপলব্দি করে।
গ্লাসগো সম্মেলনে অবহেলা করা হয়েছে সারা বিশ্বে পানীয় জলের সংকটটিকে। আকর্ষণীয় একটি অভিযোগ এনেছে পানি নিয়ে কাজ করা ওয়াটার এইড নামীয় একটি দাতব্য সংস্থা। ২০২০ এর এক পর্যবেক্ষনে সংস্থাটি বলেছে জলবায়ু পরিবর্তনরোধে সামগ্রিক অর্থ সাহায্যের চেয়ে অন্তত: তিন শতাংশ কম অর্থায়ন হয় পানি সংকট সামলাতে। জাতি সংঘের নেতৃত্বে ৩১শে অক্টোবর’২১ স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে ১৩ দিনের জন্য শুরু হয় কপ-২৬ শীর্ষ জলবায়ু সম্মেলন। বিশাল আকারের ‘ধরিত্রি রক্ষায় শেষ চেষ্টা’ নামের একটি চুক্তির মধ্য দিয়ে শেষ হয় এ সম্মেলন। ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের পর এ সম্মেলন বিশ্বে সবচে গুরুত্বপূর্ণ বলে স্থান করে নিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বে জলবায়ু বাচাতে গ্লাসগোর কপ-২৬ এর সেই ভরসা বিশ্বের মানুষকে সামান্যই দিতে পেরেছে। সম্মেলনে বন নিধন বন্ধ, কয়লার ব্যবহার সীমিতকরন, মিথেন গ্যাস নি:সরন নিয়ন্ত্রণ ও কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা এসেছে। প্রায় সব বিষয়ই বায়ুদোষণ রোধ ও কার্বন নি:সরন সম্পর্কিত। পানির সংকট নিয়ে কোন তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নজরে পরে নাই। গত ২০ বছরে সারা দুনিয়ায় পানির সংকট বেড়েছে অনেক। ২০০০ সাল থেকে পানির সৃষ্ট বন্যার দূর্যোগ আগের থেকে ১৩৪ শতাংশ বেড়েছে। এর বেশির ভাগই সংগঠিত হয়েছে এশিয়ার দেশগুলোতে জাতি সংঘের নভেম্বর’২১ এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৫০০ কোটিরও বেশি মানুষ পানির সংকটে ভুগতে পারে। এখন খরার পরিমানও ২৯ শতাংশ বেড়েছে বলে সকলের ধারনা। খরার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগতে হয়েছে আফ্রিকার দেশগুলোকে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে সামনে অপেক্ষা করছে ভয়াবহ বিপদ। এ বিপদ উৎরন জরুরী হয়ে পড়েছে । এখন থেকেই জীবাষ্ম জ্বালানী, কয়লা জ্বালানী, বিশ্ব উষ্ণায়নবৃদ্ধি, গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমন বৃদ্ধি ও পানির ব্যবহার ও দূষণে মনযোগী না হলে বাসযোগ্য পৃথিবী স্বপ্নই থেকে যাবে। বন্যার পানি নি:সরনের লাগসই প্রযুক্তির ব্যাবহার অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাস সমস্যা বাড়ে এবং তা অপরিকল্পিত নগরায়নে আগ্রহ বাড়ায়। জলবায়ু কেন্দ্রিক অভিবাসন মোকাবেলায় সমন্বিত পদক্ষেপ না নিয়ে অসংখ্য মানুষ প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমন ও অভিযোজনে সমন্বিত পদক্ষেপ, অর্ন্তভূক্তিমূলক উন্নয়ন নীতি ও পরিকল্পনা অভিবাসন মোকাবেলায় সাহায্য করতে পারে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইওএম যৌথভাবে একটি আলোচনায় সম্প্রতী এ সিদ্ধান্তে পৌছেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসন সমস্যা বাড়ায়। আর্থসামাজিক উন্নতি অব্যাহত রেখে আভ্যন্তরীন বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য মান সম্মত জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা উচিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ধীরে ধীরে জলবায়ুসৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি ও প্রয়োজনীয় অর্থায়নে গুরুত্ব দেয়া উচিত। জলবায়ু চ্যালেঞ্জ সংক্রান্ত দূর্বল দেশগুলোকে পর্যাপ্ত অর্থ ও প্রযুক্তি দেয়া সবল দেশগুলোর জন্য কর্তব্য হওয়া উচিত। বাংলাদেশের স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশসহ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ন দেশসমূহকে আর্থিক সাহায্য প্রদানের ক্ষেত্রে ষ্টেট মিনিষ্টারে সংসদ সদস্যদের আরও সোচ্চর হতে হবে এবং জলবায়ু বিপর্যয এড়ানোর ক্ষেত্রে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে ক্ষতিকর কার্বন নি:সরন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা সহনীয় মাত্রায় আনতে জোড়ালো ভূমিকা রাখতে হবে।
প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে যুক্ত থাকার পর ট্রাম্প প্রশাসন সেদিকে কোন নজড় দেয় নাই। এব্যাপারে বিশ্ব হতাশ হয়েছিল কিন্তু বাইডেন প্রশাসন আবার সেথায় যুক্ত হয়ে আমাদের আশাবাদী করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র একটি ঐতিহাসিক বিল সিনেটে অনুমোদন করেছে। এই বিলটিতে ইতিহাসের বৃহত্তম বিনিয়োগ ৩৬৯ বিলিয়ন ডলার রয়েছে। বিলটির প্রবক্তারা বলেছেন ২০৩০এর মধ্যে এ বিনিয়োগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কার্বন নি:সরন ৪০ শতাংশ কমাবে। এ বিলে দেশটির বাড়িগুলোকে সাড়ে সাত হাজার কর ঋণ দেয়া হবে ইলেক্ট্রিক গাড়ী কেনার জন্য। বিলটি প্রেসিডেন্ট বাইডেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। এখন তা ডেমোক্রেটিক পার্টি নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। শীঘ্রই প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাশ হবে। এরপর বাইডেন স্বাক্ষর করলেই তা আইনে পরিণত হবে। মধ্যবর্তী নির্বাচন সন্নিকটে থাকায় বিলটি পাশের ব্যাপারে ডেমোক্রাটরা আশাবাদী। গত কয়েক বছর যুক্তরাষ্ট্র ভয়াবহ বন্যা ও দাবানল প্রত্যক্ষ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উষ্ণতা এবং শুকনো আবহাওয়ার কারনে দাবানলের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। পরিবেশ উন্নয়নে এ বিল যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে সকল মহলের ধারনা।

সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ

সদস্য, কেন্দ্রিয় কাউন্সিল, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)।