সারা দেশে ৬৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক গণপরিষদ সদস্য-একুশে পদক প্রাপ্ত হাজী আবুল হাশেমের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

এন এ মুরাদ ।।  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, সাবেক গণপরিষদ সদস্য, ২০১১ সালে একুশের জাতীয় পদক প্রাপ্ত বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব মো. আবুল হাশেম এর আজ প্রথম মৃত্য বার্ষিকী। তাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করছে এলাকাবাসী ও তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও তার গুনমুগ্ধ ব্যাক্তিবর্গ।

আলহাজ্ব মো. আবুল হাশেম ২০২১ সালের ৯ই এপ্রিল না ফেরারদেশে চলে যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৯ বছর।

হাজী আবুল হাশেম বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসাবে জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত অবিচল ছিলেন। ৭৫ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের সময়ে তাকে মন্ত্রী-এমপি বানানোর প্রস্তাব দিলেও তিনি তা গ্রহন করেননি। আ’লীগের কঠিন দু:সময়ের সময় ২২বছর মুরাদনগর উপজেলা আ’লীগের সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ১৯৭৯ সালে আ’লীগের দলীয় প্রার্থী হিসাবে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন।

আলহাজ্ব মো. আবুল হাশেম ১৯২২ সালের ১১এপ্রিল জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম বদিউল আলম, মায়ের নাম অজিফা খাতুন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার রাজা চাপিতলা গ্রামে। শৈশবের কিছু অংশ গ্রামের বাড়িতে কাটালেও সপরিবারে তারা ঢাকায় চলে আসেন। তিনি ঢাকা নবকুমার ইন্সটিটিউট থেকে ১৯৪৩ সালে এন্ট্রান্স পাস করেন। ১৯৪৬-৪৮সাল পর্যন্ত ৩০টাকা বেতনে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানায় শিক্ষকতা করেন। ৩০টাকা বেতনে শিক্ষকতা করা কালে তাঁর প্রায় সমবয়সী মিটফোর্ড হাসপাতালে এল এম এফ পড়ুয়া লুৎফর রহমানের অর্থাভাবে লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে তিনি তাকে তাঁর বেতনের অর্ধেক অর্থাৎ প্রতিমাসে ১৫টাকা করে দিয়ে তার লেখা পড়া চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন। এ দানই তার উপার্জিত টাকার প্রথম দান।

১৯৪৮ সালে ১৫০ টাকা বেতনে আদিল-খলিল অ্যান্ড কোম্পানীতে নৈশকালীন চাকুরী হিসাবে কাজ করতেন । অত্যন্ত পরিশ্রমী আবুল হাশেম দিনের বেলা অবসর থাকতে চাননি তাই তাঁর বাড়ির আঙ্গিনায় ‘গ্লোব প্রিন্টিং প্রেস’ এর মাধ্যমে তাঁর ব্যবসায়িক জীবনের গোড়াপত্তন করেন।

তারপর নিউ ঢাকা ব্রেইড ফ্যাক্টরী ও হারিকেনের ফিতা ও কাইতন তৈরীর ফ্যাক্টরী দেন। রুমি মেডিকেল ষ্টোর নামে ঢাকার নিউ মার্কেটে ওষধের দোকান দিয়ে ওষধের ব্যবসা করেন। ১৯৬২ সালে জবা টেক্সটাইল ও করিম ইন্ড্রাষ্ট্রিয়াল কর্পোরেশনের গোড়াপত্তন করেন। দেশব্যাপী খুব অল্প সময়ের মধ্যে শিল্পপতি হিসাবে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর নাম। তিনি ইষ্ট পাকিস্তান টেক্সটাইল এসোসিয়েশনের সভাপতি ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি আ’লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। ১৯৭০ সালের গণপরিষদের নির্বাচনে আলহাজ্ব আবুল হাশেম তৎকালিন মুরাদনগর ও হোমনা থানা হতে নির্বাচন করে নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের সাথে ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ হোটেল পূর্বানীতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এক বৈঠক হয়। শেখ মজিবুর রহমান ঐ বৈঠকে আ’লীগের সকল গণপরিষদ সদস্যকে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এলাবাসীকে সংগঠিত করার নির্দেশ প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধুর এ নির্দেশ অনুযায়ী গণপরিষদ সদস্য হিসাবে নিজ এলাকা মুরাদনগর ও হোমনা সহ বাঞ্চারাপুর থানার বেশ কিছু গ্রামে গিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সংগঠিত করেন। ১৯৭১ সালের ১৮ই মে তিনি চলে যান আগরতলার কর্নেল চৌমুহনীতে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করার জন্যে আগতদেরকে তিনি স্লিপে স্বাক্ষর করে বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন। মুরাদনগর ও হোমনা থানা ছিল ২নং সেক্টরের ক্যাপটেন হায়দারের অধীনে। ভারতের আগরতলায় হাফাইনন্যা, মেলাঘর নামে মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পছিল। হাজী আবুল হাশেম সাহেবের এ ক্যাম্পের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। মুরাদনগর-হোমনা এলাকা শত্রু মুক্ত হয় ১০ ডিসেম্বর এবং দেশ স্বাধীন হয় ১৬ ডিসেম্বর।তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মুরাদনগর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি ছিলেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সসস্র মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অস্র জমাদেওয়ার আহবান জানালে তিনি সসস্র মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নিয়ে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে অস্র জমা দিয়ে আসেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মুরাদনগর ও হোমনা এই দুই থানার এডমিনিষ্ট্রেশনের দায়িত্ব পালন করেন।

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার কোম্পানীগঞ্জে ১৯৫৬ সালে আলহাজ্ব আবুল হাসেম সাহেব প্রতিষ্ঠা করেন কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম হাই স্কুল। বর্তমানে এ স্কুলটি কুমিল্লা বোর্ডের অন্যতম ও মুরাদনগর উপজেলার সেরা স্কুল হিসাবে পরিচিত। ১৯৭০ সালে কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।বর্তমানে এটি উপজেলার অন্যতম বিশ্ব বিদ্যালয় কলেজ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত।

তিনি আরো প্রতিষ্ঠা করেন চাপিতলা অজিফা খাতুন হাই স্কুল,নারী শিক্ষা প্রসারে মুরাদনগর উপজেলার প্রানকেন্দ্রে প্রথম বালিকা বিদ্যালয় হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন মুরাদনগর নুরুন্নাহার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, এ প্রতিষ্ঠানটিও বালিকা বিদ্যালয় হিসাবে উপজেলার সেরা, বাখরনগর হাশেমিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, সলপা প্রাথমিক বিদ্যালয়, কচুয়ার পাড় প্রাথমিক বিদ্যালয়,হোমনা উপজেলার রামকৃষ্ণ পুরে প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণপুর কলেজ, কামাল স্মৃতি গার্লস হাই স্কুল, কাশীপুরে হাশেমিয়া হাই স্কুল, ফেনী জেলার দক্ষিন রাজেশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁয়ে নূরুন্নাহার প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ সারাদেশে ৬৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন।

এ ছাড়াও মুরাদনগরে ছৈনদ্দিন সরকার উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সহ ১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় গোড়াপত্তন করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করাই যেন তার ধ্যান ছিলো,তিনি নিজে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন অন্যদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার জন্য উৎসাহ দিয়েছে।

শিক্ষা ও সমাজসেবায় তাঁর এ অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ ২০১১ সালে একুশের জাতীয় পদকে তাঁকে সন্মানিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর হাতে পদক তুলে দেন।

মুরাদনগর-হোমনা উপজেলা সহ দেশের বিভিন্ন জনপদে জ্ঞানের মশাল হিসাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করায় মানুষের মনে ঠাই করে নিয়েছেন আলহাজ্ব মো: আবুল হাশেম।তার অসামান্য অবদানের কারনে তিনি চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবেন ###