সুন্দরবন বাংলার ফুসফুস, সেথায় আগুন কেন?

অধ্যাপক ডাঃ মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে

গত সোমবার (০৬.০৫.২৪ই) দুপুরে ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এরপর থেকে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা বন থেকে বেরিয়ে আসেন কিন্তু পানি ছিটিয়ে গেছেন তারপরও বন বিভাগের কর্মচারীরা। কিছুক্ষণ পর পর ড্রোনের সাহায্যে অবস্থা অবলোকন করা হচ্ছে। দু’এক জায়গায় ধোঁয়া দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে পানি দেয়া হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও এখনো ফায়ার আউট ঘোষণা করা হয়নি। মঙ্গলবার (০৭.০৫.২৪ইং) পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিস পর্যবেক্ষণে থাকবেন। সবার সার্বিক সহযোগীতায় বনের আগুন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। তবে বনের আগুন ভিন্ন ধরনের। আগুন আবার জ¦লে উঠতে পারে, তাপপ্রবাহ চলছে। নিচে অক্সিজেন কম, উপরে বাতাস থাকায় আগুন জ¦লে উঠলে তা ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। তাই জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও বনবিভাগের সমন্বয়ে গঠিত টিম আরও দু’তিন দিন পর্যবেক্ষণ করবে বলে জানা যায়।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের জিউধারা স্টেশনের আমোরবুনিয়া টহল এলাকার লতিফেরছিলা এরিয়ায় আগুন লাগে শনিবার (০৪.০৫.২৪ইং)। বিষয়টি নজরে আসার পরপরই টাইগার টিম, ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম, কমিউনিটি প্যোট্রোলিং গ্রুপ ও বন বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীগণ, স্থানীয় বনজীবী ও স্বেচ্ছাসেবীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। তবে পানির উৎস ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে হওয়ার কারণে প্রথম দিন পানি ছিটানো সম্ভব হয়নি। রবিবার (০৫.০৫.২৪ইং) সকাল থেকে সমন্বিতভাবে পানি ছিটানো ও আগুন নিয়ন্ত্রনের কাজ শুরু হয়। সন্ধ্যায় ভাটার কারণে রাতে কাজ বন্ধ থাকে কিন্তু সকালেই পানি ছিটানোর কাজ আরম্ভ হয়।
বনতলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আগের বছরের আগুনে পোড়া ডাল-পালা চোখে পড়ে। স্থানীয় বসবাসকারীদের নিকট জানা যায়, আগুনে লাগা বনের গাছ এক সময় মরে গেলে বাতাসে উপরে পড়ে। এতে উপড়ে পড়া স্থানে গর্ত সৃষ্টি হয়ে পানি জমা হয় এবং এই জমাকৃত পানিতে শিং, মাগুর, কৈ ইত্যাদি মাছের উত্তম আবাসের সৃষ্টি হয় পরে সেই গর্তসমৃদ্ধ জলাভূমি থেকে প্রভাবশালী মৎস্য ব্যবসায়ীরা দাদনের মাধ্যমে প্রান্তিক মৎসজীবীদের দিয়ে মৎস্য আহরণ করেন। প্রতিবছর বনে আগুন লাগার সাথে তাঁদের যোগসাজশ থাকতে পারে বলে স্থানীয় অনেক বাসিন্দার মতামত।
আগুন লাগা সুন্দরবন একটি দুর্গম এলাকা, কোন রাস্তা নেই। ঘন ঘন গাছপালায় ভর্তি। কাছাকাছি পানির তেমন কোন উৎসও নেই। এছাড়া বাঘের উপস্থিতি একটি বিপদজনক ব্যাপার। অনেক সময় কয়েক কিলোমিটারব্যাপী আগুনের বিস্তার ঘটে। ফলে পুরোপুরি আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ ব্যাপার নয়। সুন্দরবনে গত ২০ বছরে ২৫ বার আগুন আগার ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশই ঘটেছে এই চাঁদপাই রেঞ্জে। পৃথিবীর অনেক দেশের বনাঞ্চলে আগুন লাগার ঘটনার অধিকাংশই সূত্রপাত হয় প্রাকৃতিকভাবে, পরে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সুন্দরবনের মাটি ভেজা, কাঁদামাখা এবং উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত। এলাকার আবহাওয়া ও বনভূমি প্রকৃতিগতভাবে আগুন লাগার অনোপযোগী। যদিও আমোরবুনিয়া এলাকা কিছুটা উঁচু ও শুষ্ক। তাই মনে করা হয় যে আগুনের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তা মূলতঃ মানুষের সূত্রপাত। তবে মাছ শিকারী ও গোলপাতা আহরণকারীরা কখনো লাগাতে পারে না। তবে কোন্ দুষ্কৃতকারী এ ঘটনা ঘটায় তা তদন্ত করে দেখা উচিত।
চাঁদপাই রেঞ্জের পশ্চিমের কাটাখালী থেকে পূর্বের দাসের ভরানি পর্যন্ত উত্তরের সীমানা থেকে দক্ষিণে দু’তিন কিলোমিটার এলাকার বন একটু উঁচু। ফলে বর্ষা ছাড়া এ অঞ্চলে পানি উঠে না। সুন্দরবনের এ এলাকার উত্তরের সীমানার খরমা নদী ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে নালায় পরিণত হয়েছে। ভাটার সময় একেবারে শুকিয়ে যায়, জোয়ারের সময় ভোলা নদী থেকে কিছুটা পানি আসে। বর্তমানে উজানের নদীর সঙ্গে খরমা নদীর সংযোগ নাই বললেই চলে। ফলে এ এলাকার বনাঞ্চলে শুষ্ক। এতে সহজে যেমন আগুন লাগানো যায়, তেমনি আগুন লাগলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। চাঁদপাই থেকে দাসের ভরানি পর্যন্ত সুন্দরবনের সীমানার যে দু’একটি খাল এখনও অবশিষ্ট আছে, সেগুলোয় প্রভাবশালীরা বছরের পর বছর মাছ ধরছেন এমন অভিযোগ শুনা যায়। সেসব খালে অন্যদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে বঞ্চিত ব্যক্তিরা ক্ষোভ থেকে অগ্নি সংযোগ এর মত ঘটনা ঘটাতে পারেন বলে অনেকে মনে করেন।
এর আগে আগুন লাগার ঘটনা উদঘাটনে প্রতিবার তদন্ত কমিটি হয়েছে। তেমন দুষ্কৃতকারী চিহ্নিত হয়েছে কিনা তা জানা না গেলেও কমিটি বেশকিছু সুপারিশ প্রদান করেছেন। এর মধ্যে বনসংলগ্ন খাল খনন, পুকুর খনন, বনরক্ষীদের টহল, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার তৈরী, সীমানা বরাবর নাইলনের বেড়া তৈরি ইত্যাদি। কিছু কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন হলেও খাল খননের মত গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশটি আলোর মুখ দেখেনি। চাঁদপাই বাজার থেকে খরমা নদী ও তার শাখা প্রশাখা অতীতে বনতল সজীব রাখত। গত কয়েক দশকে খরমা নদীর উত্তর এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে মাছের ঘের। সংলগ্ন উত্তরের খাল বেদখল হয়ে গেছে। খরমা নদীতে আজ পানি নাই। খরমার সঙ্গে সঙ্গে পুবের ভোলা নদীও মরতে বসেছে। এগুলো খনন করে পানি প্রবাহ ফেরত আনতে হবে। এতে ম্যানগ্রোভ বনের স্বাভাবিক অবস্থা যেমন ফিরে আসবে, তেমনি শীতকালে বনতল এতটা শুষ্ক হবে না। ফলে আগুনের ঝুঁকি কমে যাবে। আমরা আমাজন পাইনি, পেয়েছি সুন্দরবন। এটা আমাদের গর্বের ধন। এ সুন্দরবন সুরক্ষার দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ দেশবাসীর থাকতে পারে বলে পরিবেশবাদীরা মনে করে না।