‘ সে দিন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এসেছিলাম ’

বীরমুক্তিযোদ্ধাদের অণুগল্প - ৩২
শাহাজাদা এমরান ।।
প্রকাশ: ২ সপ্তাহ আগে

যুদ্ধের যাত্রা যখন শুরু :
বীরমুক্তিমোদ্ধা মো.আবদুল মালেক বলেন,১৯৭১ সালে আমি ঢাকা সিটি কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি। ৭মার্চ যখন ঢাকার রেইসকোর্সে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষন দেন, তখন আমরা দল বেঁধে সেই ভাষন শুনতে সেখানে যাই। বঙ্গবন্ধুর সেই দিনের ভাষন আমাদেরকে সাহসী করে তুলে। ২৫ মার্চ রাতে আমি ঢাকার লালবাগে ছিলাম। বিকালে স্থানীয় আওয়ামীলীগের উদ্যোগে এক সভা হয়। সেই সভায় আমরা যোগদান করি। সন্ধার পর থেকেই শুরু হয় চর্তুদিকে এক ধরনের আতংক। সারারাত আতংকের মধ্যে ছিলাম। মুহুমুহু গুলি শদ্ধ ভেসে আসত। ঢাকা নগরীতে যে হত্যাযজ্ঞ চলতেছে তা টের পেয়েছি। ২৬ মার্চ দিল সারাদেশে কারফিউ। সমস্ত দিন বাসার মধ্যেই ছিলাম। ২৭ মার্চ সকালে এক প্রকার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু। ঢাকা থেকে নারায়নগঞ্জ হয়ে কুমিল্লা আসতে সময় লেগেছে ৩ দিন। এই তিন দিন রাস্তায় রাস্তায় কি পরিমান দূর্ভোগ যে পোহাতে হয়েছে তা এক কথায় অবর্ননীয়। আমাদের রসুলপুর এলাকায় রেলস্টেশন সংলগ্ন হানাদার বাহিনীর একটি বড় ক্যাম্প ছিল। পুরো এলাকায় রাজাকারদের সহাতায় চলত অত্যাচার নির্যাতন। যুবক ছেলেদের ক্যাম্পে ধরে এনে চালাত অমানুসিক নির্যাতন। আবার কাউকে কাউকে গুলি করে মেরে ফেলত। এগুলো দেখে মা আমাকে নিয়ে অস্থির হয়ে গেলেন। এক পর্যায়ে পাঞ্জাবীদের আজরাঈল আখ্যা দিয়ে বললেন তাদের খতম করতে যুদ্ধে যা। মায়ের অনুপ্রেরণা পেয়ে আগষ্টের প্রথম দিকে আমার জেঠাত বড় ভাই যিনি ইপিআরে চাকুরী করতেন আবদুল গফুর। তাকে বললাম,আমি আর দেশে থাকতে পারছি না। যুদ্ধে যেতে চাই। ব্যবস্থা করেন।

যুদ্ধের প্রশিক্ষন যখন শুরু :
আমার স্পষ্ট মনে আছে,সেই দিন বৃহস্পতিবার ছিল। রাতে আমিসহ এলাকার সফিকুল ইসলাম,সফর আলীসহ আমরা ৪ জন ভারতে যাই। আমরা সেখানে আমার ভাইয়ের চিঠি নিয়ে মতিনগর ইয়ুথ ক্যাম্পের বক্সনগর গিয়ে উঠি সকালে। সেখানে আমরা অধ্যক্ষ আফজল খান ও অধ্যক্ষ আবদুর রউফসহ অনেককেই দেখতে পাই। এই ইয়ুথ ক্যাম্প আমাদের ২১ দিনের একটি প্রশিক্ষন হয়। আমি থ্রি নট থ্রি রাইফেল চালনার প্রশিক্ষন নেই। এই ক্যাম্পে আমরা ২৫ জন প্রশিক্ষণ নেই। এর মধ্যে শিমরার সোলেয়মান , আবদুস সামাদ,বানাশুয়ার আবদুল হাকিম,রামপুরার আবদুল বারী, শিমপুরের নুরুল ইসলাম,মৌলভী নগরের সফিকুল ইসলামসহ অন্যরা। আমাদের প্রশিক্ষক ছিলেন সুবেদার আবদুল কাদের।

অণুগল্প :
প্রথম যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চাইলে বীরমুক্তিমোদ্ধা মো.আবদুল মালেক বলেন, আমাদের কমান্ডার ছিলেন এড.সৈয়দ মতিউল ইসলাম মন্টু।সোর্সের মাধ্যমে খবর পেয়েছিলাম যে, সেনানিবাস থেকে একদল সেনাবাহিনীর সদস্য সকালে বুড়িচং আসছে। এ কথা শুনে আমরা বড়াসার বাজারের একটি বাড়িতে অবস্থান নেই ভোর ৪টায়।

সকাল ৮টার দিকে যখন দেখলাম বাজারের দক্ষিন দিক থেকে ২টি জিপ গাড়িতে করে হানাদার বাহিনী আসছে তখন আমরা পশ্চিম দিক থেকে ফায়ার ওপেন করে বসি।এখানে আমাদের একটু ভুল হয়েছে যে, আমরা একটু আগেই ফায়ার ওপেন করে বসি। আমাদের উচিত ছিল তারা আরেকটু কাছে আসার পর ফায়ার শুরু করা। যা হোক আমাদের আক্রমনের কারনে তারা আর সামনে না এগিয়ে পিছনের দিকে চলে যায়।

পরবর্তী সপ্তাহে আমরা কমান্ডার সোলেয়মানের নেতৃত্বে বুড়িচংয়ের নানুয়া বাজার আক্রমন করি।এই আক্রমনে তাদের বেশ কয়েকজন নিহত হয়। আমাদের টিমের মুল কাজ ছিল রসুলপুর আর্মি ক্যাম্পকে ব্যতিব্যস্ত রাখা। কারণ, অত্র এলাকাসহ আশেপাশের এলাকাগুলোর মধ্যে এই ক্যাম্পটি ছিল সবচেয়ে বড় একটি ক্যাম্প। রসুলপুর বধ্যভুমির অবদানও কুখ্যাত হানাদার বাহিনীর এই ক্যাম্পটি।কাটানিসার বড়পুলের সামনে তাদের কয়েকটি বাংকার ছিল। এগুলোকে আমরা প্রতিনিয়ত গেরিলা কায়দায় আক্রমন করে তাদের ব্যস্ত রাখতাম। এক পর্যায়ে তারা বাংকার তুলে নিয়ে রসুলপুর ক্যাম্পে চলে যায়।
বাবা মাকে দেখার জন্য আমার মন অস্থির হয়ে উঠল। আমি মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কারণে পাঞ্জাবীরা আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়।বাবা-মা যাযাবরের মত একেক সময় একেক জায়গায় থাকত। খবর পেলাম বাবা-মা রামনগর বোনের বাসায় আছে। তাদের দেখার জন্য সেখানে গেলাম। তখন দুপুর প্রায় দেড়টার মত হবে। আমাকে ভাত দেওয়া হয়েছে খাবারের জন্য। এমন সময় খবর এলো এই পাড়ায় পাঞ্জাবীরা রেড দিয়েছে যুবক ছেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের কাছে নাকি খবর আছে এই পাড়ায় মুক্তিবাহিনী ঢুকেছে। ভাত আর খেলাম না। কিন্তু পালাবার কোন পথও খুঁজে পাচ্ছি না। ঠিক এমন সময়ই পাঞ্জাবীরা আমার বোনের ঘরে প্রবেশ করে আমার দুলাভাই ও তালাতো ভাইসহ আমাকে ধরে নিয়ে বাড়ির পাশের পুকুরপাড় নিয়ে যায়। সেখানে আরো কয়েকজন এলকার যুবক ছিল। তাদের সমস্যা হলো,পাঞ্জাবীরা আমার খোঁজে এলেও তারা আমাকে চিনতো না আবার তাদের সাথে কোন রাজাকারও ছিল না। যারা তথ্য দিয়েছিল তারা দূরেই রয়ে গেছে কাছে আসেনি।এটাকেই বলে রাখে আল¬াহ মারে কে আর মারে আল¬াহ রাখে কে ?সব মিলিয়ে তারা ৭/৮জনকে ধরে নিয়ে আসে। আমিতো ধরেই নিয়েছি আজ আমি শেষ। এরই মধ্যে হানাদাররা নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করে জোরে একটি বক্সিম দিয়ে অন্যদের ছেড়ে দিচ্ছে। সর্বশেষ এলো আমার পালা। আমার কাছে এসেই একটি জোড়ে বক্সিম দিল। আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম। জানতে চাইল আমি মুক্তি কি না। বললাম না। এবার বলল হিন্দু কি না, কি করি। বললাম,আমি মোসলমান গৃহস্থের কাজ করে খাই।তখন বলল,ঐ পাড়ায় কিছু হিন্দু বাড়ি আছে । এই দিয়াশলাই ধর। হিন্দু বাড়িতে আগুন দিয়ে জলদি আবার এখানে চলে আসবি। আমাদের হয়ে কাজ করবি।জ্বি বলে দিয়াশলাই নিয়ে হিন্দু বাড়ির দিকে আগাতে লাগলাম। আর ভাবছি কিভাবে পালাব। প্রথম ভাবছি হানাদাররা আমার পেছনে পেছনে আসবে। পড়ে পিছনে তাকিয়ে দেখি তারা মনের সুখে আড্ডা দিচ্ছে পুকুরপাড় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।কিছুক্ষন আগুন দেয়ার ভান করলাম। যখন দেখলাম তারা আর আমাকে ফলো করছে না ঠিক এমন সময় হিন্দু বাড়ির পেছন দিয়ে দৌঁড় দিলাম। এক দৌঁড়ে বুড়িচং সদরে চলে এলাম। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার অনেক কাহিনী শুনেছি। কিন্তু নিজের এই প্রথম অভিজ্ঞতা হলো।
৮ ডিসেম্বর যখন কুমিল¬া মুক্ত হয় তখন আমরা মেলাঘরে ছিলাম। আমরা যারা মতিউল ইসলাম মন্টু ভাইয়ের নেতৃত্বে ছিলাম তারা ১০ডিসেম্বর এক সাথে কুমিল্লায় প্রবেশ করে মন্টু ভাইয়ের বাসায় গিয়ে উঠি। পরে বিকালে আমরা যে যার মত করে বাসায় যাই।

পরিচয় : মো.আবদুল মালেক।পিতা লাল মিয়া মাতা খাতুনের নেছা। ১৯৫০ সালে তিনি কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ৪নং আমড়াতলী ইউনিয়নের মৌলভী নগর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। পিতা-মাতার ৫ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে তার অবস্থান চতুর্থ।