‘৬ মাসের জীবন্ত শিশুকেও মাটি চাপা দিতে বাধ্য হই’

বীরমুক্তিযোদ্ধাদের অণুগল্প -৯
শাহাজাদা এমরান ।।
প্রকাশ: ২ সপ্তাহ আগে

যুদ্ধের যাত্রা যখন শুরু : বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নাজিম উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ২৫ মার্চ সন্ধ্যার পরই আমাদের নেতা অধ্যক্ষ আফজল খান এডভোকেট,নাজমুল হাসান পাখি,অধ্যক্ষ আবদুর রউফ,আবদুর রশিদসহ আরো অনেকের নির্দেশে আমরা শাষনগাছা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন রেলগেইটটিতে অবস্থান নেই। নেতাদের নির্দেশে টমছম ব্রিজসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। রাত ১১টার পর লক্ষ করলাম, সারা শহরেই পাক সেনাদের প্রতিরোধ করার জন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীসহ সাধারণ ছাত্ররাও রাস্তায় নেমে পড়ছে। আর শহরে কিছুক্ষন পর পর নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। এক ধরনের ভয়ও কাজ করছে সবার মাঝে। তখন কুমিল্লা শহরে প্রবেশ করার ভাল রাস্তা বলতে ছিল শাসনগাছা। সোর্সের মাধ্যমে পাকিস্থানী আর্মিরা আগেই জানতে পারে শাসনগাছায় যে আমাদের অবস্থান। ত্ইা আমরা কোন কিছু বুঝার আগেই পাকিস্থান আর্মিরা শাসনগাছা এসেই এলোপাতারী গুলি শুরু করে। তখন মুহুর্তেই আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। নেতাদের থেকে আমরা কর্মীরাও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। যে যেদিকে পারছে ভয়ে পালাচ্ছে। আর এ সুযোগে মুহুর্তের মধ্যেই পুরো শহর নিয়ন্ত্রনে চলে যায় পাকিস্থানী বাহিনীর। তারা শহরে প্রবেশ করে প্রথমেই আক্রমন করে কুমিল্লা পুলিশ লাইন্সে। ঐ রাতেই রেইসকোর্সে এমপি আবদুল মালেক সাহেবের ভাইয়ের বাড়িটি মাইন দিয়ে গুড়িয়ে দেয়। ২৮ মার্চ সকালে কারফিউ তুলে নিলে আমরা বন্ধুরা কুমিল্লা শহরের অবস্থা দেখার জন্য সারা শহর ঘুরে বেড়াই। তখন দেখি রানীর বাজারে হিন্দুদের যে মন্দিরটি আছে সেই মন্দিরের এক ঠাকুরের মরদেহ ড্রেনে পড়ে আছে। ছাতিপট্রি ও চকবাজার গিয়ে দেখি ঐ এলাকার মিস্ত্রি দোকানের কয়েকজন মালিকের মরদেহ ড্রেনে পড়ে আছে। অনুমান করে মনে হলো ২৫ মার্চ রাতে কুমিল্লা শহরে কম করে হলেও ১৫/২০জন মানুষকে তারা গুলি করে মেরে ফেলে গেছে। দুটি ড্রেনে গুলিবিদ্ধ মরদেহ দেখে আমরা ভরকে যাই । এরই মধ্যে খবর পেয়ে যাই আমাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য ভারতে চলে গেছে।
৩০ মার্চ সকালে আমরা কয়েকজন রওয়ানা দিয়ে গোমতী নদী পাড় হয়ে ভারতের সোনামুড়া গিয়ে পৌঁছি বিকালে। সেখানে গিয়ে প্রথমেই দেখা হয় বন্ধু মোগলটুলির কাজী দৌলত আহমেদ বাবুর সাথে। ঐ রাতে আমরা সোনাইমুড়ি নদী সংলগ্ন একটি মাদ্রাসা ছিল সেখানে রাত কাটাই। এখানে এসে আমাদের নেতা অধ্যক্ষ আফজল খান, অধ্যক্ষ আবদুর রউফ.অধ্যাপক খোরশেদ আলমদের সাক্ষাত পেতে আমাদের ৫/৬ দিন সময় চলে যায়। পরে তাদের সাথে যোগাযোগ হলে তারা স্লিপ দিয়ে আমাদের বক্্র নগর ক্যাম্পে পাঠায়।

প্রশিক্ষণ যখন শুরু :
ক্যাম্পে আমি,আবু,আসাদও মতিনসহ আরো ৪/৫জন বন্ধু যোগ দেই। এই ক্যাম্পে ৪/৫ দিন থাকার পর আমাদের মেলাঘর নেওয়া হয় এবং একই রাতে মেলাঘর থেকে আবার ওম্পি নগর প্রশিক্ষন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই ক্যাম্পে পুরো এক মাস আমাদের প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। প্রশিক্ষন শেষে আবার আমাদের মেলাঘর নেওয়া হয়। সেখানেই আনুষ্ঠানিক ভাবে আমাদের অস্ত্র দেওয়া হয়। আমাকে দেওয়া হয় একটি এস এল আর। অস্ত্র দিয়ে আমাদের সবাইকে গুছিয়ে নিতে বললেন। পরে আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় ২নং সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মাহবুবের কাছে নির্ভয়পুরে। এই নির্ভয়পুর থেকেই আমরা একটানা প্রায় দুই মাস যুদ্ধ করি ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বে।

যুদ্ধের অনুপম গল্প :
প্রথম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমি প্রথম যুদ্ধ করি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়াবাজার সীমান্তে। এটি সম্ভবত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ হবে। কমান্ডার ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বে আমরা ৪০জন যোদ্ধা মিয়াবাজার গিয়ে এ্যামবুশ করি। এ্যামবুশের পরে আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হই। আমাদের প্রস্তুতিটা ছিল এমন, প্রথম দলে ছিল ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বাধীন,দ্বিতীয় সারিতে হাবিলদার কালামিয়ার নেতৃত্বাধীন এবং তৃতীয় সারিতে আমরা যারা এফ এফ ছিলাম তারা। তারিখটা মনে নেই। সময়টা তখন সকাল হবে। পাক বাহিনীর দুটি জিপ যখন মিয়াবাজার সীমান্ত এলাকা দিয়ে যাচেছ , তখন প্রথমেই তারা আমাদের এ্যামবুশে পড়ে। প্রথম গাড়িটি এ্যামবুশে পড়ার পর দ্বিতীয় গাড়িটি থামিয়ে ফায়ার করা শুরু করে। তখন আমরাও আমাদের কৌশলমত তীব্র পাল্টা আক্রমন শুরু করি। এই যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর ৪জন নিহত ও কয়েকজন মারাত্মক আহত হয়ে রাস্তার পাশে পড়ে যায়। তখন আমরা দ্রুত নির্ভয়পুর ক্যাম্পে চলে যাই। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে, আমাদের প্রথম যুদ্ধেই আমরা সফল হই এবং প্রথম বারের মত সেদিন শত্রুর বিরুদ্ধে আমি এসএলআর চালাই। পরে আমি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন সীমান্তে রেগুলার ফোর্সের সাথে ৪/৫টি সক্রিয় যুদ্ধে অংশ গ্রহন করি।
সম্ভবত অক্টোবরের দিকে, কুমিল্লা শহর আক্রমন করার জন্য নির্ভয়পুর ক্যাম্প থেকে যুদ্ধকালীন থানা কমান্ডার আবদুল মতিনের নেতৃত্বে আমাদের ২০জন যোদ্ধাকে মতিনগর ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়। বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত এলাকা এন সি নগর থেকে ক্যাপ্টেন মাহবুবের নির্দেশনায় এবং আবদুল মতিনের নেতৃত্বে কুমিল্লার বিভিন্ন সীমান্তে আমরা প্রায় ১০/১২টি যুদ্ধে অংশ নেই। এর মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধ ছিল অর্ধেকের বেশী। এই যুদ্ধের এলাকা গুলোর মধ্যে ছিল শিবের বাজার,আমড়াতলী,ছাওয়ালপুর, ইটাল্লাসহ বিভিন্ন এলাকা। গোমতী নদীর বিভিন্ন আইলে পাক হানাদার বাহিনীর শক্তিশালী টহল অব্যাহত ছিল। কিন্তু আবদুল মতিনের নেতৃত্বে আমাদের বাহিনীর রেগুলার গেরিলা আক্রমনের মুখে একটা সময় তারা গোমতী নদীর পাড় টহল শিথিল করতে বাধ্য হয় এবং বলা যায় এই কারনেই কুমিল্লা মুক্ত হওয়াটা কিছুটা তরান্বিত হয়।

আরেকটি যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মো. নাজিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় হবে। গাইডের মাধ্যমে আমরা খবর পাই, গোমতী নদী নিয়ে নৌকা যোগে দুই জন পাক সেনা আমড়াতলী ক্যাম্পে যাচ্ছে। এমন সময় আমরা প্রস্তুতি নিয়ে কৌশলে তাদের আটক করি। এ সময় একজন অস্ত্র বের করতে চাইলে সাথে সাথে তাকে আমরা গুলি করে মেরে ফেলি। আর অপরজনকে হাত ও চোখ বেঁধে মতি নগরের সাব সেক্টর কমান্ডার দিদারুল আলমের কাছে পাঠিয়ে দেই। কিন্তু এই দুই সেনার হত্যার কারণে আমাদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। এই অপারেশনের মাত্র ২ দিন পরই পাকিস্তান বাহিনী এর প্রতিশোধ হিসেবে ইটাখোলা,আমড়াতলী ও ছাওয়ালপুর তিন দিক দিয়ে এক সাথে আক্রমন করে। এই অভিযানে তারা প্রায় এই তিন এলাকার প্রায় শতাধিক নিরিহ লোককে হত্যা করে । এর মধ্যে মহিলা ছিল ২০ এর মত ।
মুক্তিযোদ্ধা মো. নিজাম উদ্দিন অস্ত্রুসিক্ত নয়নে বলেন, এই অভিযানটি এতই নির্মম ছিল যে,অভিযানের পর আমরা যখন আসি তখন দেখি শিবের বাজার এলাকার মাস্টার বাড়িতে ১০/১৫জন মহিলাকে হত্যা করে একটি মাটির ঘরে ঢুকিয়ে বাহির থেকে বন্ধ করে হানাদার বাহিনী চলে যায়। আমরা এসে ঘর খুলে দেখি, লাশের দুগর্ন্ধ বের হচ্ছে। ঘরের পাশে গর্ত খুড়ে দাফন কাফন ও জানাযা বিহিন তাদের আমরা এক সাথে মাটি চাপা দিয়ে দেই। যেই না আমরা একটি করে লাশ গর্তে ফেলছি , এমন সময় দেখি মাত্র ৬ মাসের একটি শিশু অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে আছে। আমাদের আওয়াজে চোখ খুলছে। সারা দেহে নানা পোকামাকড়। একজন সহকর্মী বলল, ভাই জীবন্ত এই শিশুকে কি করব। তখন আমরা কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারলাম না। কারণ, ২দিন আগে বয়ে যাওয়া হানাদার বাহিনীর ব্যাপক তান্ডবে পুরো গ্রাম জনমানব শূন্য। আশে পাশে ডাক্তার নেই। মতিনগর ক্যাম্পে নিতে নিতে শিশুটিকে বাঁচানো যাবে না। আর সবচেয়ে বড় ভয় ছিল আমাদের আগমনের কথা শুনে যদি হানাদার বাহিনী আবার আক্রমন করে বসে তখন তো প্রতিরোধ করতে হবে। এই বলে ১০/১৫জন নিহত মহিলাদের সাথে এই শিশুটিকেও আমরা জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে আসি। হয়তো এই মহিলাদের কোন একজন ছিল নিস্পাপ এই শিশুটির মা। সেদিনের আমাদের বুক চাপড়িয়ে কান্নার আওয়াজ যে কত তীব্র ছিল একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ জানবে না।

পরিচয় :
মো.নাজিম উদ্দিন আহমেদ । পিতা মৃত মো. বশির উদ্দিন এবং মা আজিজুন নেছা। ১৯৫৫ সালের ৫ মে কুমিল্লা শহরের রেইসকোর্স এলাকার এক সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্ম গ্রহন করেন। পিতা মাতার ৪ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে তার অবস্থান দ্বিতীয়।