রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
চাল পিয়াজ-সহ দ্রব্যমুল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে জনগন দিশেহারা …. ডাঃ ইরানবিশ্বকাপ বাছাইয়ে আর্জেন্টিনা দল ঘোষণামেঘনা-ধনাগোধা বেড়িবাঁধে আকস্মিক ভাঙন, আতঙ্কে লাখো মানুষচুরি যাওয়া গরুর সন্ধান দিলেই মিলবে পুরস্কারছাত্র বিক্ষোভে উত্তাল হাটহাজারী মাদ্রাসাএ বছরও বিনামূল্যে এক লাখ গাছের চারা বিতরণ করবে লাল সবুজ উন্নয়ন সংঘপদ্মবিল জুড়ে শরতের শুভ্রতা, হৃদয় কাড়ছে সৌন্দর্য পিপাসুদের‘২০২১ সাল আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে’কুমিল্লানগরীর দিশাবন্দে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যুবাসে তরুণীকে পালাক্রমে ধর্ষণ, অভিযুক্ত চালক-হেলপার গ্রেফতাররেলের বগি নির্মাণে আরো একটি কারখানা হবে: রেলমন্ত্রীবাড়ি ফেরার পথে বাসের দরজা-জানালা বন্ধ করে তরুণীকে গণধর্ষণআবদুল মতিন খসরু এমপি’র নির্দেশনায়” যানজট নিরশনে বুড়িচংয়ে বাইপাস সড়ক চালু করার সিদ্ধান্তকুমিল্লার আজকের করোনা আপডেটচাকরির বয়স ১০ বছর হলে উচ্চতর গ্রেডে বাধা নেইফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ভারতের পতন, বাংলাদেশ আগের অবস্থানেইকুমিল্লার আজকের করোনা আপডেটহাত-পা বেঁধে ছাত্রকে মারধর, শিক্ষকের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিপিলখানায় চলছে বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলন, প্রাধান্য পাবে সীমান্ত হত্যাবৃষ্টি নিয়ে যা জানালো আবহাওয়া অফিস

ভিসা কার্ড হ্যাক করে ৯ দেশে ৩ কোটি টাকার কেনাকাটা

পাপুয়া নিউগিনির ব্যবসায়ীর ভিসা কার্ড হ্যাক করে ৮ মাসে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, বাংলাদেশসহ ৯টি দেশ থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকার কেনাকাটা করেছে এক বাংলাদেশি হ্যাকার। প্রতারণার শিকার ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াহেদ দীর্ঘ ৫ বছর বিভিন্ন দেশে ঘুরে অবশেষে বাংলাদেশ পুলিশের আশ্রয় নেন।

তদন্তে নেমে পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ২৫ আগস্ট রাতে মিরপুর ডিওএইচএস থেকে এক সহযোগীসহ ওই হ্যাকারকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার হওয়া হ্যাকারের নাম নাজমুস সাকিব নাঈম। তিনি একজন আইটি বিশেষজ্ঞ। গ্রেফতারের পর তাকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার আদালতে জবানবন্দি দেন হ্যাকার নাজমুস সাকিব নাঈম। তিনি আবদুল ওয়াহেদের ভিসা কার্ডটি হ্যাক করে বাংলাদেশসহ ৯টি দেশে ২০১৪ সালের জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যে ৮০ দিনে মোট ১ হাজার ৪৭৩টি লেনদেনের মাধ্যমে সাড়ে তিন কোটি টাকা খরচ করেন। ওই কার্ড ব্যবহার করে অনলাইনে ৯টি দেশ থেকে দামি সফটওয়্যার, ম্যাকবুক, আইফোন কিনেন নাজমুস সাকিব। পাশাপাশি নিজের এন্টোপে অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ভার্চুয়াল ভিসাকার্ড জেনারেট করে ৬৯ বারে ৯৯ হাজার মার্কিন ডলার তুলে নেন। আর নেটলার ইউকে অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে আরেকটি ভার্চুয়াল ভিসা কার্ড জেনারেট করে আরও কয়েক হাজার ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া থাই এয়ার ওয়েজে পরিবার নিয়ে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন সাকিব।

জানা যায়, ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৮৮ সালে পাপুয়া নিউগিনিতে পাড়ি জমান আবদুল ওয়াহেদ। সেখানে প্রথমে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত হলেও পরে ব্যবসা শুরু করেন। তিনি বর্তমানে পাপুয়া নিউগিনির শীর্ষস্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেশবেশ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি পাপুয়া নিউগিনিতে সুপার মার্কেট, সুপারশপ চেইন, ফাস্ট ফুড অ্যান্ড বেকারি, রেস্টুরেন্ট চেইন, ফিলিং স্টেশন, ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড লজিস্টিকস, কনটেইনার ইয়ার্ড, অ্যাপার্টমেন্ট ইত্যাদি ব্যবসায় জড়িত। ২০০৭ সালে পাপুয়া নিউগিনির ব্যাংক সাউথ প্যাসিফিক লিমিটেডে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট খুলে ভিসা ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট কার্ড গ্রহণ করেন আবদুল ওয়াহেদ। ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসের শেষদিকে ব্যবসায়িক কাজে সিঙ্গাপুরে যান তিনি। কাজ শেষে বাংলাদেশে আসার কথা। ব্যবসায়িক কাজ শেষে সিঙ্গাপুরের পার্করয়েল হোটেলের বিল পরিশোধ করতে হোটেলের পজ মেশিনে নিজের ভিসা ইন্টারন্যাশনাল ডেভিট কার্ডটি প্রবেশ করাতেই মেশিনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে- ‘আপনার কার্ডটি রেস্টিক্টেড করা হয়েছে।

আপনি আপনার ব্যাংকে যোগাযোগ করেন।’ কয়েকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন আবদুল ওয়াহেদ। নিজের কাছে থাকা নগদ টাকা ও পরিচিতজনদের সহায়তায় হোটেল বিল পরিশোধ করে পাপুয়া নিউগিনিতে ফিরে যান তিনি। যোগাযোগ করেন ব্যাংক সাউথ প্যাসিফিক লিমিটেড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতারণামূলক বৈদেশিক লেনদেন সন্দেহে তার ভিসা কার্ডটি রিজেক্ট করা হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এই লেনদেনের দায় আবদুল ওয়াহেদের ওপর চাপিয়ে বলে, আবদুল ওয়াহেদ তার কোনো আত্মীয়-কর্মচারীকে কার্ডের তথ্য সরবরাহ করেছে। যে তথ্য ব্যবহার করে সেই আত্মীয়-কর্মচারী ২০১৪ সালের ২১ জুলাই থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত আবদুল ওয়াহেদের ভিসা কার্ড ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে অনলাইনে কেনাকাটা ও ভার্চুয়াল কার্ড ক্রয় করে সাড়ে তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ব্যাংকের এ দায়সারা বিবৃতি প্রত্যাখ্যান করেন আবদুল ওয়াহেদ। ক্ষতিপূরণ দাবি করে পাপুয়া নিউগিনি’র ন্যাশনাল কোর্টে ব্যাংক সাউথ প্যাসিফিক লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা করেন ওয়াহেদ। ব্যাংক সাউথ প্যাসিফিক লিমিটেড তার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করে যে, আত্মীয় অথবা কর্মচারীকে কার্ডের তথ্য পাচার করে ওয়াহেদ নিজেই দাবিকৃত টাকা খরচ করিয়ে ক্ষতিপূরণ দাবির পাশাপাশি ব্যাংকের সুনাম নষ্ট করেছেন। কিন্তু ওয়াহেদ এতে দমে জাননি। তিনি ক্ষতিপূরণ আদায়ের পাশাপাশি ব্যাংকের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণে আইনি লড়াই শুরু করেন।

আইনজীবীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, হংকং, চীন ও থাইল্যান্ডে তার কার্ড থেকে প্রতারণামূলক বৈদেশিক লেনদেন বিষয়ে আইনগত সহায়তা চান তিনি।

দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের সঙ্গেও যোগাযোগও করেন। কিন্তু ব্যর্থ হন আবদুল ওয়াহেদ। ক্ষতিপূরণ আদায়ের পাশাপাশি ব্যাংকের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণে দেশে দেশে ঘুরতে ঘুরতে বিপর্যস্ত আবদুল ওয়াহেদ ২০১৯ সালে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে এসে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা করেন। দীর্ঘ ৮ মাসের অনুসন্ধান শেষে পুলিশ খোঁজ পায় হ্যাকার নাজমুস সাকিব নাঈমের। এরপর সহযোগী মইনুল ইসলাম মামুনসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশীদ যুগান্তরকে বলেন, ২০১৪ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভিসা কার্ড জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। আমরা এই ৮০ দিনের ব্যাংক স্ট্যাটমেন্ট সংগ্রহ করে দেখি হ্যাকার থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশে বসে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশসহ আরও ৫টি দেশে অনলাইনে ১৪৭২টি ট্রানজেকশনের মাধ্যমে শপিং করে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আমরা হ্যাকারকে শনাক্ত করে গ্রেফতার করি। তার কাছ থেকে জব্দকৃত ল্যাপটপ ও তার তিনটি ই-মেইলে আমরা এই জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছি।

নাজমুস সাকিব নাঈম আমেরিকার দি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে গ্র্যাজুয়েশন করেছে। সে একজন আইটি এক্সপার্ট ও ভালো প্রোগ্রামার। সে খারাপ কাজে তার মেধা ব্যবহার করেছে। সে তার এই অপকর্ম গোপন করার অনেক চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দেশে গিয়েও হ্যাক করা ভিসাকার্ড দিয়ে ট্রানজেকশন করেছে যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে শনাক্ত না করতে পারে। এটি যেহেতু পাপুয়া নিউগিনির ঘটনা, আন্তর্জাতিক বিষয়। আমরা দেশের ভাবমূর্তির কথা চিন্তা করে মামলাটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত তার শেষরক্ষা হয়নি। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশের পুলিশ এ কাজটা করেছি। এর তদন্তের পেছনে সব কর্মকর্তা রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

এদিকে পুলিশের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, হ্যাকার নাজমুস সাকিব স্বীকার করেছেন যে, তার তৈরি পেখম অনলাইনে হোটেল বুকিংয়ের জন্য বিকাশ, ওয়ান ব্যাংক, যমুনা ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। পেমেন্ট গেটওয়ে সার্ভিস প্রোভাইডার ইজিপেওয়ের প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। থাইল্যান্ডের সিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। কাজ করেছেন সিভিল ব্যাংক নেপালের পরামর্শক হিসেবে। তার উদ্ভাবিত দ্য জেডবয় নিয়ে মার্কিন সাময়িকী আন্টারপেনার ও ফোর্সে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশ বলছে, আর কোনো অনলাইন প্রতারণায় নাজমুস সাকিব নাঈম জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার সঙ্গে আর কোনো গ্রুপ আছে কি না, তা বের করার চেষ্টা চলছে।

ভোক্তভোগী ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াহেদ যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের পুলিশের সদস্যরা ইন্টারন্যাশনালি সক্রিয় হ্যাকারকে শনাক্ত করেছে। আমি তাদের স্যালুট জানাই। অতি উন্নত রাষ্ট্রগুলোয় মামলা করেছি, কিন্তু সেসব দেশের পুলিশ এর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। পেরেছে বাংলাদেশ পুলিশ। তাই বাংলাদেশ পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

সংবাদটি শেয়ার করুন............
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *