শনিবার, ২৩শে মার্চ, ২০১৯ ইং | ৯ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
হোমনায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থীবরুড়ায় শিক্ষক সমিতির মানববন্ধনবরুড়ায় শিখা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিতনৌকার বিরুদ্ধে গেলেই বহিষ্কারকুমিল্লায় ৮জন হত্যা মামলায় জামায়াত নেতা ডা. তাহের কারাগারেমানবিক আবেদন মানুষ মানুষের জন্য পাশে দাঁড়ান পরিবারটিকে বাঁচানতনুর হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার দাবিতে তার কলেজের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ‘স্মিথ-ওয়ার্নার ফিরলে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপ জিততে পারে’কুমিল্লা সদরে গৃহবধূকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগে স্বামী গ্রেফতারআদালতে যেতে ‘অনিচ্ছুক’ খালেদা জিয়ামসজিদে হামলার চারদিন পর ৬ জনের মরদেহ হস্তান্তর, স্বজনদের ক্ষোভলক্ষ্মীপুরে আ.লীগের ৬ নেতা বহিষ্কারআজও ৭ ছাত্রী অজ্ঞান, স্কুল বন্ধ ঘোষণাতনু হত্যার তিন বছর তদন্তের নেই কোন অগ্রগতিনিজের দেশেই কোচ হচ্ছেন ইউনিসবিশ্বকাপের নিরাপত্তা শঙ্কা উড়িয়ে দিল আইসিসিকুমিল্লায় বাস চাপায় বৃদ্ধ নিহতহোমনায় ব্যাটারি চার্জ দিতে গিয়ে অটোচালক নিহতআশুগঞ্জে নতুন পাওয়ার প্লান্টের নির্মাণ কাজ শুরুএকে একে অজ্ঞান ৮ ছাত্রী

সম্মুখ সমরের মুক্তিযোদ্ধা-৪ নিশ্চিত মৃত্যু জেনে কলেমা পড়া শুরু করি

শাহাজাদা এমরান।।
বীরমুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ বলেছেন,সোর্সের বেঈমানীর কারণে হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা বাগান যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ৩০ জন সহযোদ্ধার মধ্যে কমান্ডার ফোরকানসহ ২৫জন যখন চোখের সামনে শহিদ হয়ে যায় তখন নিশ্চিত মৃত্যু হচ্ছে জেনে, গুলিবিহীন রাইফেলটা চা গাছের উপর রেখে, কলেমা পড়ে ,তওবা করে দুই হাত তুলে যেই না আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করব, এমন সময় লক্ষ্য করলাম, আমার কোমরের দুই পাশে দুইটি গ্রেনেড আছে। কাল বিলম্ব না করে, শরীরে সবটুকু শক্তি দিয়ে অগ্রসর হওয়া হানাদার বাহিনীর ট্রাকটি লক্ষ করে একটি গ্রেনেড ছুড়ে পেছনের দিকে দিলাম দৌঁড়। কিছু দূর গিয়ে ছুঁড়লাম আরেকটি গ্রেনেড। এরপর আর কিছু বলতে পারব না। শুধু দৌঁড় আর দৌঁড়। একটা পর্যায় গিয়ে আবিস্কার করলাম নিরাপদ জায়গায় এসেছি। কিছুক্ষণ পর দেখি আরো চারজন সহযোদ্ধা আহত অবস্থায় ফিরে এসেছে। সেদিন যদি কোমরে গ্রেনেড দুটি না থাকত তবে আজ হয়তো আপনারা আমাকে এভাবে দেখতেন না। আর এখানে বলে রাখা ভাল, শহিদ হওয়ার আগে বেঈমানী করা সোর্সকে সাথে সাথেই গুলি করে মেরে ফেলেন কমান্ডার ফোরকান ভাই ।
আবুল কালাম আজাদ। পিতা আমিনুল ইসলাম। যিনি নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মা আফিয়া খাতুন। ১৯৫৮ সালের ২ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্চারামপুর উপজেলার তেজখানী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা মাতার চার ছেলে ও ছয় মেয়ের মধ্যে তার অবস্থান দ্বিতীয়। নিজ গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি চলে যান পিতার কর্মস্থল হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার সাহাজী বাজার বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকায়। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পিতা অবসর প্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় জগদিশপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় দেশ ব্যাপী ছিল ৭০ এর নির্বাচনের ঢামাডোল। সে সময় এই এলাকায় নির্বাচনী প্রচারে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান আসেন। তখন স্কুল ছাত্র হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সাথে তিনি হ্যান্ডসেক করার পর বঙ্গবন্ধু তাকে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। আবুল কালাম আজাদের মতে-বঙ্গবন্ধুর সাথে ক্ষণিক এই সান্নিধ্যটুকুই তার জীবনের সেরা অর্জন বলে মনে করেন তিনি।
কিভাবে যুদ্ধে গেলেন জানতে চাইল বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এইড-কুমিল্লার প্রতিষ্ঠাতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ২৭ মার্চে হবিগঞ্জের সাহাজী বাজার বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকায় আসেন সেনা বাহিনীর কর্মকর্তা খালেদ মোশারফ,নুরুজ্জামান চৌধুরী,কেএম সফিউল্লা(পরবর্তীকালে সেনা প্রধান ও এমপি হন)এসে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মকর্তা কর্মচারী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সভা করেন। সেই সভায় আব্বার সাথে আমিও ছিলাম। সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে খালেদ মোশারফ খুব সংক্ষেপে দেশে যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে এর পটভূমিকা বর্ণনা করে বলেন, এই এলাকায় আমাদের একটি ক্যাম্প করতে হবে। এখন এটা কোথায় করা যায় এবং দেশের জন্য আপনারা আমাদের কি ধরনের সহযোগিতা করতে পারেন। তখন আব্বাসহ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল মজিদ, স্টোর অফিসার মোসলেহ উদ্দিনসহ অফিসাররা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিতর খালি জায়গায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করার প্রস্তাব দেন আর স্থানীয়রা কাপড় চোপড় থেকে শুরু করে খাবার দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার কথা জানান। তখন এই তিন সেনা অফিসার সবাইকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ক্যাম্পটি সাহাজি বাজার করা যাবে না। তারা তেলিয়াপাড়া চা বাগান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করার সিদ্ধান্ত নেন এবং উপস্থিত যুবকদের মধ্যে কারা কারা এই কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ করতে আগ্রহী তাদের নাম জানতে চান। মুক্তিযুদ্ধে যেতে আগ্রহী অন্যান্যদের সাথে আমিও হাত উঠাই। নবম শ্রেণীর ছাত্র হলেও তখন বয়স বা দেখতে একেবারে ছোট দেখাত না। তাই পরদিন ২৮ মার্চ তেলিয়াপাড়া চা বাগানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আমরা প্রায় শতাধিক যুবক ছেলে অংশ নেই। এখানে আমরা এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখ পর্যন্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি প্রশিক্ষক সফিউদ্দিন আহমেদের কাছে। এই স্থানে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি নিরাপদ না মনে করায় ১৫ এপ্রিল এটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের নরসিংহপুরে স্থানান্তর করা হয়। ভারতে যাওয়ার সময় ক্যাম্প কমান্ডার বয়সে ছোট বলে আমাকে ভারতে নেয়নি। এর পরে সাহাজী বাজারের অবস্থা উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আমাদের গোটা পরিবার গ্রামের বাড়িতে চলে আসে।
বাড়িতে আসার পর কোন কাজেই আমার মন বসছিল না। দেশে যুদ্ধ চলছে আর আমি বাড়ি থাকব এই বিষয়টি কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। এ জন্য কিভাবে ভারতের নরসিংপুর ক্যাম্পে যাব এই চিন্তা করতে থাকি। একদিন খবর পেলাম আমাদের এলাকার এমপি দেওয়ান আবদুল আব্বাস নরসিংহপুর ক্যাম্পের দায়িত্বে আছেন। এ কথা শুনে দুই দিনের মাথায় আমার বন্ধু মুজাফ্ফরসহ ২৫জন মিলে কসবা হয়ে ভারতের নরসিংহপুর রওয়ানা দেই। বিকাল নাগাদ গিয়ে ওপারে ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছি। বাড়ি থেকে যাওয়ার সময়, যেতে দিবে না বলে মাকে, বলে যাইনি। তবে বাবাকে গোপনে বলে যাই। তিনি আমাকে ২শ টাকা হাতে দিয়ে বলেন, টাকাটা রাখ,দেশ স্বাধীন করে ফিরবা ইনশাল্লাহ। আমরা এখানে এসেই আমাদে এমপি দেওয়ান আবদুল আব্বাসের কাছে গেলে তিনি একটি চিরকুট লিখে দিলে আমাদের এখানে থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যায়। তিন দিন পর একদিন সকালে একটি জিপ গাড়িতে করে ২জন বাঙ্গালী আর্মি অফিসার এসে বলল, এখানে কে আছ যে, সিলেট অঞ্চলে যুদ্ধ করতে পার। আমি হাত তুলে বললাম, স্যার আমি হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার সব রাস্তাঘাট চিনি। আমার বয়স কম বলে প্রথমে বিশ্বাস না করে প্রায় ১৫ মিনিট মাধবপুর ও সাহাজীবাজার এলাকার বিভিন্ন রাস্তাঘাট নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলে আমি চটপট সব উত্তরে দেই। পরে এই ক্যাম্প থেকে শুধু মাত্র আমাকেই তিনি তার জিপ গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায়। দুপুর নাগাদ আমরা তিন সেক্টরের অধীনস্ত একটি ক্যাম্পে যাই। এই মুহূর্তে ক্যাম্পের নাম মনে করতে পারছি না। এই ক্যাম্পে আমিসহ প্রায় শতাধিক তরুণ একটানা ২১ দিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। এখানে আমাদের প্রশিক্ষক ছিলেন বাঙ্গালী এবং ভারতীয় আর্মির প্রশিক্ষকরা। প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ৩নং সেক্টরের প্রধান অফিস হেজামারা ক্যাম্পে। এখানে আমি ৭ দিন ছিলাম। আমার এখানে একমাত্র কাজ ছিল, দিনে বাবুর্চিকে রান্নার বিভিন্ন কাজে এবং রাতে নৈশপ্রহরীদের সহযোগিতা করা।
প্রথম যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ বলেন, আগষ্টের প্রথম সপ্তাহে আমাদের কমান্ডার হাবিলদার সফিউদ্দিন আমাদের সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের মধ্যে কারা সাহাজী বাজার বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংলগ্ন আশেপাশের রাস্তা ভাল করে চিন। আমরা এক সাথে ৩০ জন হাত উঠাই। তখনি জানতে পারলাম আমার বাবার কর্মস্থল আর আমার আবাসস্থল সাহাজী বাজার বিদ্যুৎ কেন্দ্র হানাদার বাহিনী দখল করে নেয়। বিষয়টি শুনে অন্য রকম এক উত্তেজনা কাজ করেছিল আমার মধ্যে। পরদিন সকাল ৭টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফোরকান উদ্দিনকে কমান্ডার করে হেজামারা ক্যাম্প থেকে আমাদের ৩০ জনকে সাহাজী বাজার বিদ্যুৎ কেন্দ্র আক্রমণ করার জন্য পাঠানো হয়। সাথে ছিল স্থানীয় এক গাইড। যদিও এই গাইড আমাদের সাথে বেঈমানী করেছিল। তেলিয়াপাড়া চা বাগান যাওয়ার আগেই রাত হয়ে যায়। গাইড আর কমান্ডার ফোরকান উদ্দিন সবার আগে। তেলিয়াপাড়া চা বাগানের প্রবেশ পথ বন দিয়ে ঢুকতেই দেখা গেল, দূর থেকে গাড়ির হেড লাইটের আলো। মুহূর্তেই আমাদের ভুল ভাঙ্গল। গাইড আমাদের সঠিক রাস্তা দিয়ে না এনে হানাদার বাহিনীর বলে দেওয়া এবং পজিশন নেওয়া রাস্তা দিয়ে এনেছে আমাদের শেষ করে দেওয়ার জন্য। সাথে সাথেই কমান্ডার ফোরকান উদ্দিন ভাই গর্জে উঠে গাইডকে বলল,তুই আমাদের কোথায় নিয়ে এসেছিস। এ সময় গাইড দৌঁড় দেয়ার চেষ্টা করলে সাথে সাথে ফোরকান ভাই তাকে গুলি করে মেরে ফেলে। আর অপর দিকে, পাকিস্থানী বাহিনী যে আমাদের তিন দিক দিয়ে ঘেরাও করে ফেলেছে তা বুঝতে বাকি রইল না। তারা মাইকে বার বার উর্দুতে ঘোষণা দিচ্ছে, আমরা যেন গুলি না চালিয়ে আত্মসমর্পণ করি। অপেক্ষাকৃত বয়সে আমরা যারা ছোট ছিলাম তারা একেবারে পেছনের দিকে ছিলাম। কোন উপায় না দেখে হঠাৎ করে কমান্ডার ফোরকান ভাই ফায়ার এবং গো ব্যাক বলে চিৎকার দিয়ে উঠলেন। তখন আমরা এক সাথে ফায়ার করতে শুরু করি। হানাদার বাহিনীও সমানতালে জবাব দিচ্ছে। এক পর্যায়ে আমার মনে হলো আমাদের সামনের সব সহযোদ্ধাই শহীদ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। আমার বন্ধুকের গুলিও শেষ হয়ে গেল। আশে পাশে কাউকে না দেখে মৃত্যু নিশ্চিত মেনে নিলাম। আমাদের দিক থেকে কোন ফায়ারের আওয়াজ না শুনে তারাও এগুতে লাগল। তখন আমি বন্ধুকটা চা গাছের উপর রেখে কলেমা পড়ে এবং তওবা করে যেই না হাত দুটো উপরের উঠিয়ে আল্লাহর কাছে শেষ বারের মত ক্ষমা চাইব, ঠিক এমন সময় কোমরের মধ্যে হাত লাগলে বুঝতে পারি আমার কাছে দুটো গ্রেনেড আছে। তখন আমি একটি গ্রেনেড খুলে জীবনের সব শক্তি দিয়ে আমার দিকে অগ্রসরমান হওয়া হানাদার বাহিনীর গাড়িটির দিকে নিক্ষেপ করি। এরপর দেই দোঁড়। কিছু দূর গিয়ে আরেকটি গ্রেনেড মারি। কিভাবে যে সে দিন এমন দৌঁড় দিতে পেরেছিলাম তা এখন ভাবতেই অবাক লাগে। নিরাপদ স্থানে যাওয়ার পর দেখি আহত অবস্থায় আরো চার সহকর্মী এসেছে। কমান্ডারসহ বাকী ২৫জনই এই যুদ্ধে শহিদ হয়। আর আমার ছোড়া দুটি গ্রেনেডে সম্ভবত বেশ কয়েকজন হানাদার মারা যায়। এই যুদ্ধে আমার বাম পা গুলিবিদ্ধ হয় । সেই ক্ষত আজো আমি বহন করে চলি।
সর্বশেষ যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে বললে তিনি জানান, অক্টোবর মাসের একেবারে শেষ দিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শ্রমিক নেতা আবদুল মান্নানের নেতৃত্বে ১০২ জনের একটি কমান্ডো গ্রুপ আখাউড়া-আশুগঞ্জ এবং ভৈরব আক্রমণে যাই। আমরা এখানে এসেই ব্রাক্ষণবাড়িয়া থেকে লালপুর পর্যন্ত রাস্তার ৮/১০ কিলোমিটার উড়িয়ে দেই। তৎসংলগ্ন রেললাইন উপড়ে ফেলি। পরে একই দিন নবীনগর উপজেলার লালপুর গ্রামের গোলামের আজমের বাড়ি জ্বালিয়ে দেই। পরে এই লালপুর গ্রামে আমরা দুই দিন অবস্থান করি। ডিসেম্বর শুরুতে আমরা সদর উপজেলার তারুয়া গ্রামের মহিউদ্দিন চেয়ারম্যানের বাড়িতে স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করি। আমাদের মূল টার্গেট হচ্ছে, ভৈরব আক্রমণ ও দখলে নেওয়া। কিন্তু পাক বাহিনীর শক্তিশালী ঘটি ছিল ভৈরবে। ডিসেম্বর মাসের ৪ তারিখে ভৈরব আক্রমণের জন্য আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করি। এক দিকে, মেজর নাসিম ও লে.ইব্রাহিমের (বর্তমানে কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান) নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি গ্রুপ,আখাউড়া দিয়ে মিত্র বাহিনীর একটি গ্রুপ আর শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মান্নানের নেতৃত্বে আমরা। এই তিনটি টিম এক সাথে আশুগঞ্জের দিকে অগ্রসর হই। কিন্তু আশুগঞ্জ থেকে ভৈরব যাওয়ার পথে একমাত্র রাস্তা হচ্ছে মেঘনা ব্রিজ। আমাদের আগমনের কথা জেনে হানাদার বাহিনী মেঘনা সেতু দিয়ে নামার জায়গায়টি ভেঙ্গে ফেলে। ফলে আমরা আর নদী পার হতে পারিনি । পরে আমরা ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত আশুগঞ্জ অবস্থান করি। দেশ স্বাধীন হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর কিন্তু ভৈরব স্বাধীন হয় ১৮ ডিসেম্বর। ১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করলেও ভৈরবে তারা নদীর এপার ওপার যুদ্ধ চালিয়ে তাদের শক্তি প্রদর্শন অব্যাহত রাখে। পরে বাধ্য হয়ে ১৭ ডিসেম্বর রাতে ভারত থেকে আনা উভয়চর ট্যাংক নিয়ে নদী পার হয়ে স্থল হামলা আর একই সাথে মিত্র বাহিনীর বিমান হামলা চালানো হয়। আমাদের স্থল ও বিমান হামলায় মুহূর্তেই গুড়ে যায় পাক বাহিনীর শক্তিশালী দুর্গ । পরে তারা জানায়, ১৮ ডিসেম্বর সকালে তারা আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে করতে দুপুরে গিয়ে তারা আত্মসমর্পণ করে। এভাবেই আমরা ভৈরব মুক্ত করি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার দুই দিন পরেও বাড়িতে না ফেরায় সবাই মনে করছে আমি যুদ্ধে মারা গেছি। মা আমার কোরআন শরীফ পড়ছে। এমন সময় ১৮ তারিখ সন্ধ্যায় আমি বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। মা’র সে দিনের আনন্দ কান্না আমার সারা জীবন চোখে ভেসে উঠবে।
আমার বাবা আমিনুল ইসলাম ছিলেন ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আমাকে যুদ্ধে পাঠিয়ে তিনি নিজেও হবিগঞ্জের মাধবপুর গিয়ে যুদ্ধ করেছেন। তিনি ছিলেন মাদবপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার। বাবা-ছেলে উভয়ই মুক্তিযোদ্ধা এমন ঘটনা আমাদের দেশে বিরল।
যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বাবার সাথে আবার আমি হবিগঞ্জের মাধবপুর গিয়ে আবার লেখাপড়া শুরু করি।পড়াশুনা শেষ করে অনেক কষ্টে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করি।
যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছিলাম সেই স্বপ্ন তখনি পুরাপুরি পূরণ হবে যখন দেখব দেশ দুর্নীতিমুক্ত হয়েছে।
একটি দুর্নীতিমুক্ত শোষণহীন সমাজ দেখতে চাই আগামীর বাংলাদেশে।

সংবাদটি শেয়ার করুন............
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares
  • 3
    Shares



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *