সংবাদ শিরোনাম
শুক্রবার, ২৪শে মে, ২০১৯ ইং | ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
কুমিল্লায় প্রেমিক যুগলের নগ্ন ভিডিও ধারন করায় ইউপি সদস্য আটককুমিল্লায় বিরল রোগে আক্রান্ত একই পরিবারের চারজনের সহায়তা কামনাকুমিল্লা নগরীতে পণ্য প্রত্যাহারে অভিযান, ৬ দোকানকে জরিমানা জরিমানা : # স্বপ্ন সুপারশপকে- ১০ হাজার টাকা # আমানা বিগ বাজারকে – ৩০ হাজার টাকা # খাকন স্টোর ও যদু লাল সাহার দোকানকে -১০ হাজার টাকা # মেসার্স হক এন্ড সন্সকে ৫ হাজার টাকা # হোসেন মোল্লা হোটেলেকে- ৩ হাজার টাকাকুমিল্লা সদর উপজেলা আওয়ামীলীগের মনোনয়ন জমা দিলেন টুটুলধানের ন্যায্য মূল্যের দাবী জানিয়ে কুমিল্লা জেলা বিএনপির স্মারক লিপিবাঞ্ছারামপুরে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যুচলন্ত বাসে নার্সকে ধর্ষণের পর হত্যার প্রতিবাদে চৌদ্দগ্রামে মানববন্ধনঅবশেষে বহিস্কার করা হলো ধর্ম কটুক্তিকারী কুবির সেই ছাত্রকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাব্যস্ততা বাড়ছে কুমিল্লার দর্জি পাড়ায়ড্রেজারে আটকে গেল শিশু মারজানার জীবনফেনীতে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ ৫২টি পণ্যকুমিল্লায় বিজিবির সাথে বন্ধুকযুদ্ধে মাদক চোরাকারবারী নিহতকুমিল্লায় বিজিবির অভিযানে মাদকসহ আটক ১গবাদি পশুপালন করে কৃষকদের স্বাবলম্বী করতে হবে – সেলিমা আহমাদ মেরী এমপিকুমিল্লা নামেই বিভাগ হতে হবে – এমপি বাহারকুমিল্লায় মৌসুমী ফলের সমারোহ # আসছে ভারত থেকেওইমলাম ধর্ম ও মহানবী (সা.)কে নিয়ে – আপত্তিকর মন্তব্যের কারণে কুবি শিক্ষার্থী গ্রেফতারবুড়িচংয়ের এ যেন ব্রিজ নয় সাক্ষাত মৃত্যুর ফাঁদঅটোরিকশা চুরির সময় শালা-দুলা ভাই আটকছুটির দিনে কুমিল্লা নগরীতে জম জমাট ঈদ কেনাকাটা

সম্মুখ সমরের মুক্তিযোদ্ধা-৫ ৬ মাসের জীবন্ত শিশুকেও মাটি চাপা দিতে বাধ্য হই

শাহাজাদা এমরান : বীর মুক্তি মো. নাজিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, শিবেরবাজার এলাকার মাস্টার বাড়িতে ১০/১৫জন মহিলাকে হত্যা করে একটি মাটির ঘরে ঢুকিয়ে বাহির থেকে বন্ধ করে হানাদার বাহিনী চলে যায়। আমরা এসে ঘর খুলে দেখি, লাশের দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। ঘরের পাশে গর্ত খুড়ে দাফন কাফন ও জানাযা বিহীন তাদের আমরা এক সাথে মাটি চাপা দিয়ে দেই। যেই না আমরা একটি করে লাশ গর্তে ফেলছি এমন সময় দেখি মাত্র ৬ মাসের একটি শিশু অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে আছে। আমাদের আওয়াজে চোখ খুলছে। সারা দেহে নানা পোকামাকড়। একজন সহকর্মী বলল, ভাই জীবন্ত এই শিশুকে কি করব। তখন আমরা কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারলাম না। কারণ, ২দিন আগে বয়ে যাওয়া হানাদার বাহিনীর ব্যাপক তান্ডবে পুরো গ্রাম জনমানব শূন্য। আশে পাশে ডাক্তার নেই। মতিনগর ক্যাম্পে নিতে নিতে শিশুটিকে বাঁচানো যাবে না। আর সবচেয়ে বড় ভয় ছিল আমাদের আগমনের কথা শুনে যদি হানাদার বাহিনী আবার আক্রমন করে বসে তখন তো প্রতিরোধ করতে হবে। এই বলে ১০/১৫জন নিহত মহিলাদের সাথে এই শিশুটিকেও আমরা জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে আসি। হয়তো নিহত এই মহিলাদের কোন একজন ছিল নিস্পাপ এই শিশুটির মা। সেদিনের এই ঘটনায় আমাদের বুক চাপড়িয়ে কান্নার আওয়াজ যে কত তীব্র ছিল একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ জানবে না।

বীর মুক্তি মো. নাজিম উদ্দিন আহমেদ বলেছেন,বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষন আমার মুক্তিযুদ্ধের অংশ নেয়ার পেছনে টনিক হিসেবে কাজ করছে। আমি তখন কুমিল্লা হাই স্কুলের মেট্রিক পরীক্ষার্থী। টগবগে তরুণ। ৭ মার্চ ঢাকার রেইসকোর্স ময়দানে যখন বঙ্গবন্ধু বললেন, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম- এ কথা গুলো শুনেই সিদ্ধান্ত নেই, যদি যুদ্ধ শুরু হয় তাহলে যুদ্ধে যাবই যাব ইনশাল্লাহ,দেশকে শত্রু মুক্ত করার জন্য এর চেয়ে বড় কাজ আর কিছু হতে পারে না।
মো.নাজিম উদ্দিন আহমেদ । পিতা মৃত মো. বশির উদ্দিন এবং মা আজিজুন নেছা। ১৯৫৫ সালের ৫ মে কুমিল্লা শহরের রেইসকোর্স এলাকায় এক সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্ম গ্রহন করেন। পিতা মাতার ৪ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে তার অবস্থান দ্বিতীয়।
১৯৭১ সালে যখন দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন তিনি কুমিল্লা হাই স্কুলের মেট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে যখন পাক হানাদার বাহিনী ঢাকা চট্রগ্রামসহ বড় বড় শহর গুলোতে পৈশাচিক গণহত্যা চালায় তখন এই অত্যাচার নির্যাতন থেকে বাদ ছিল না শহর কুমিল্লাও। নাজিম উদ্দিন আহমেদ বলেছেন,যেহেতু কুমিল্লায় সেনানিবাস আছে সেহেতু আমাদের আগেই ধারণা ছিল যুদ্ধ শুরু হলে প্রথমেই কুমিল্লা আক্রান্ত হতে পারে। ঐ দিন সন্ধ্যার পরই সারা শহরময় কানাঘুষা চলতেছে কি হয় কি হবে। আমি , আমার বন্ধু ইউছুফ হাই স্কুলের মেট্রিক পরীক্ষার্থী মনির হোসেন, কুমিল্লা হাই স্কুলের সফিকুল ইসলাম এবং এমপি মালেক সাহেবের এক ভাতিজাসহ আমরা কয়েকজন বন্ধু কুমিল্লা রেইসকোর্সে আড্ডা দিচ্ছিলাম। এমন সময় নেতাদের কাছ থেকে খবর এলো আজ রাতে পাকিস্তান আর্মিরা সেনানিবাস থেকে এসে কুমিল্লা শহরে আক্রমন করবে। যে ভাবেই হোক আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে। তখন আমাদের যারা নেতা ছিলেন তারা হলেন, অধ্যক্ষ আফজল খান এডভোকেট,নাজমুল হাসান পাখি,অধ্যক্ষ আবদুর রউফ,আবদুর রশিদসহ আরো অনেকে। আমরা শাষনগাছা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন রেলগেইটটিতে অবস্থান নেই। নেতাদের নির্দেশে কেউ টমছম ব্রিজসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। সময়টা সঠিক বলতে পারছি না। তবে রাত ১১টার পর লক্ষ করলাম সারা শহরেই পাক সেনাদের প্রতিরোধ করার জন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীসহ সাধারণ ছাত্ররাও রাস্তায় নেমে পড়ছে। আর শহরে কিছুক্ষন পর পর নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। এক ধরনের ভয়ও কাছ করছে সবার মাঝে। তখন কুমিল্লা শহরে প্রবশ করার ভাল রাস্তা বলতে ছিল শাসনগাছা। সোর্সের মাধ্যমে পাকিস্থানী আর্মিরা আগেই জানতে পারে শাসনগাছায় যে আমাদের অবস্থান। ত্ইা আমরা কোন কিছু বুঝার আগেই পাকিস্থান আর্মিরা শাসনগাছা এসেই এলোপাতারী গুলি শুরু করে। তখন মুহুর্তেই আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। নেতাদের থেকে আমরা কর্মীরাও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। যে যেদিকে পারছে ভয়ে পালাচ্ছে। আর এ সুযোগে মুহুর্তের মধ্যেই পুরো শহর নিয়ন্ত্রনে চলে যায় পাকিস্থানী বাহিনীর। তারা শহরে প্রবেশ করে প্রথমেই আক্রমন করে কুমিল্লা পুলিশ লাইন্স। ঐ রাতেই রেইসকোর্সে এমপি আবদুল মালেক সাহেবের ভাইয়ের বাড়িটি মাইন দিয়ে গুড়িয়ে দেয়। ২৬ মার্চ সকালে রেইসকোর্সের কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় আমরা বন্ধুরা একত্রিত হয়ে কি করা যায় চিন্তা ভাবনা করি। তখন কুমিল্লা শহর ছিল কারফিউ । যেহেতু ক্রাফিউ ছিল তাই কোথায়ও গিয়ে যে নেতাদের সাথে দেখা করে দিক নির্দেশনা পাব সেই অবস্থাও ছিল না। ২৮ মার্চ সকালে কারফিউ তুলে নিলে আমরা বন্ধুরা কুমিল্লা শহরের অবস্থা দেখার জন্য সারা শহর ঘুরে বেড়াই। তখন দেখি রানীর বাজারে হিন্দুদের যে মন্দিরটি আছে সেই মন্দিরের এক ঠাকুরের মরদেহ ড্রেনে পড়ে আছে। ছাতিপট্রি ও চকবাজার গিয়ে দেখি ঐ এলাকার মিস্ত্রি দোকানের কয়েকজন মালিকের মরদেহ ড্রেনে পড়ে আছে। অনুমান করে মনে হলো ২৫ মার্চ রাতে কুমিল্লা শহরে কম করে হলেও ১৫/২০জন মানুষকে তারা গুলি করে মেরে ফেলে গেছে। দুটি ড্রেনে গুলিবিদ্ধ মরদেহ দেখে আমরা ভরকে যাই । তখন আর কোথায়ও না গিয়ে বাসায় চলে আসি। এরই মধ্যে খবর পেয়ে যাই আমাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য ভারতে চলে গেছে।
৩০ মার্চ সকালে আমরা কয়েকজন মিলে রওয়ানা দিয়ে গোমতী নদী পাড় হয়ে ভারতের সোনামুড়া গিয়ে পৌঁছি বিকালে। সেখানে গিয়ে প্রথমেই দেখা হয় বন্ধু মোগলটুলির কাজী দৌলত আহমেদ বাবুর সাথে। ঐ রাতে আমরা সোনাইমুড়ি নদী সংলগ্ন একটি মাদ্রাসা ছিল সেখানে রাত কাটাই। এখানে এসে আমাদের নেতা অধ্যক্ষ আফজল খান, অধ্যক্ষ আবদুর রউফ.অধ্যাপক খোরশেদ আলমদের সাক্ষাত পেতে আমাদের ৫/৬ দিন সময় চলে যায়। পরে তাদের সাথে যোগাযোগ হলে তারা স্লিপ দিয়ে আমাদের বক্্র নগর ক্যাম্পে পাঠায়। এই ক্যাম্পে আমি,আবু,আসাদও মতিনসহ আরো ৪/৫জন বন্ধু যোগ দেই। এই ক্যাম্পে ৪/৫ দিন থাকার পর আমাদের মেলাঘর নেওয়া হয় এবং একই রাতে মেলাঘর থেকে আবার ওম্পি নগর প্রশিক্ষন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই ক্যাম্পে পুরো এক মাস আমাদের প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। প্রশিক্ষন শেষে আবার আমাদের মেলাঘর নেওয়া হয়। সেখানেই আনুষ্ঠানিক ভাবে আমাদের অস্ত্র দেওয়া হয়। আমাকে দেওয়া হয় একটি এস এল আর। অস্ত্র দিয়ে আমাদের সবাইকে গুছিয়ে নিতে বললেন। পরে আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় ২নং সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মাহবুবের কাছে নির্ভয়পুরে। এই নির্ভয়পুর থেকেই আমরা একটানা প্রায় দুই মাস যুদ্ধ করি ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বে।
প্রথম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমি প্রথম যুদ্ধ করি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়াবাজার সীমান্তে। এটি সম্ভবত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ হবে। কমান্ডার ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বে আমরা ৪০জন যোদ্ধা মিয়াবাজার গিয়ে এ্যামবুশ করি। এ্যামবুশের পরে আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হই। আমাদের প্রস্তুতিটা ছিল এমন, প্রথম দলে ছিল ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বাধীন,দ্বিতীয় সারিতে হাবিলদার কালামিয়ার নেতৃত্বাধীন এবং তৃতীয় সারিতে আমরা যারা এফ এফ ছিলাম তারা। তারিখটা মনে নেই। সময়টা তখন সকাল হবে। পাক বাহিনীর দুটি জিপ যখন মিয়াবাজার সীমান্ত এলাকা দিয়ে যাচেছ তখন প্রথমেই তারা আমাদের এ্যামবুশে পড়ে। প্রথম গাড়িটি এ্যামবুশে পড়ার পর দ্বিতীয় গাড়িটি থামিয়ে ফায়ার করা শুরু করে। তখন আমরাও আমাদের কৌশলমত তীব্র পাল্টা আক্রমন শুরু করি। এই যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর ৪জন নিহত ও কয়েকজন মারাত্মক আহত হয়ে রাস্তার পাশে পড়ে যায়। তখন আমরা দ্রুত নির্ভয়পুর ক্যাম্পে চলে যাই। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে, আমাদের প্রথম যুদ্ধেই আমরা সফল হই এবং প্রথম বারের মত সেদিন শত্রুর বিরুদ্ধে আমি এসএলআর চালাই। পরে আমি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন সীমান্তে রেগুলার ফোর্সের সাথে ৪/৫টি সক্রিয় যুদ্ধে অংশ গ্রহন করি।
সম্ভবত অক্টোবরের দিকে, কুমিল্লা শহর আক্রমন করার জন্য নির্ভয়পুর ক্যাম্প থেকে যুদ্ধকালীন থানা কমান্ডার আবদুল মতিনের নেতৃত্বে আমাদের ২০জন যোদ্ধাকে মতিনগর ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়। বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত এলাকা এন সি নগর থেকে ক্যাপ্টেন মাহবুবের নির্দেশনায় এবং আবদুল মতিনের নেতৃত্বে কুমিল্লার বিভিন্ন সীমান্তে আমরা প্রায় ১০/১২টি যুদ্ধে অংশ নেই। এর মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধও ছিল অর্ধেকের বেশী। এই যুদ্ধের এলাকা গুলোর মধ্যে ছিল শিবের বাজার,আমড়াতলী,ছাওয়ালপুর, ইটাল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করি। গোমতী নদীর বিভিন্ন আইলে পাক হানাদার বাহিনীর শক্তিশালী টহল অব্যাহত ছিল। কিন্তু আবদুল মতিনের নেতৃত্বে আমাদের বাহিনীর রেগুলার গেরিলা আক্রমনের মুখে একটা সময় তারা গোমতী নদীর পাড় টহল শিথিল করতে বাধ্য হয় এবং বলা যায় এই কারনেই কুমিল্লা মুক্ত হওয়াটা কিছুটা তরান্বিত হয়।
আরেকটি যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মো. নাজিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় হবে। গাইডের মাধ্যমে আমরা খবর পাই, গোমতী নদী নিয়ে নৌকা যোগে দুই জন পাক সেনা আমড়াতলী ক্যাম্পে যাচ্ছে। এমন সময় আমরা প্রস্তুতি নিয়ে কৌশলে তাদের আটক করি। এ সময় একজন অস্ত্র বের করতে চাইলে সাথে সাথে তাকে আমরা গুলি করে মেরে ফেলি। আর অপরজনকে হাত ও চোখ বেঁধে মতি নগরের সাব সেক্টর কমান্ডার দিদারুল আলমের কাছে পাঠিয়ে দেই। কিন্তু এই দুই সেনার হত্যার কারণে আমাদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। এই অপারেশনের মাত্র ২ দিন পরই পাকিস্তান বাহিনী এর প্রতিশোধ হিসেবে ইটাখোলা,আমড়াতলী ও ছাওয়ালপুর তিন দিক দিয়ে এক সাথে আক্রমন করে। এই অভিযানে তারা প্রায় এই তিন এলাকার প্রায় শতাধিক নিরিহ লোককে হত্যা করে । এর মধ্যে মহিলা ছিল প্রায় ২০ এর মত হবে।
মুক্তিযোদ্ধা মো. নিজাম উদ্দিন অস্ত্রুসিক্ত নয়নে বলেন, এই অভিযানটি এতই নির্মম ছিল যে,অভিযানের পর শুনে আমরা যখন আসি তখন দেখি শিবেরবাজার এলাকার মাস্টার বাড়িতে ১০/১৫জন মহিলাকে হত্যা করে একটি মাটির ঘরে ঢুকিয়ে বাহির থেকে বন্ধ করে হানাদার বাহিনী চলে যায়। আমরা এসে ঘর খুলে দেখি, লাশের দুগর্ন্ধ বের হচ্ছে। ঘরের পাশে গর্ত খুড়ে দাফন কাফন ও জানাযা বিহিন তাদের আমরা এক সাথে মাটি চাপা দিয়ে দেই। যেই না আমরা একটি করে লাশ গর্তে ফেলছি এমন সময় দেখি মাত্র ৬ মাসের একটি শিশু অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে আছে। আমাদের আওয়াজে চোখ খুলছে। সারা দেহে নানা পোকামাকড়। একজন সহকর্মী বলল, ভাই জীবন্ত এই শিশুকে কি করব। তখন আমরা কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারলাম না। কারণ, ২দিন আগে বয়ে যাওয়া হানাদার বাহিনীর ব্যাপক তান্ডবে পুরো গ্রাম জনমানব শূন্য। আশে পাশে ডাক্তার নেই। মতিনগর ক্যাম্পে নিতে নিতে শিশুটিকে বাঁচানো যাবে না। আর সবচেয়ে বড় ভয় ছিল আমাদের আগমনের কথা শুনে যদি হানাদার বাহিনী আবার আক্রমন করে বসে তখন তো প্রতিরোধ করতে হবে। এই বলে ১০/১৫জন নিহত মহিলাদের সাথে এই শিশুটিকেও আমরা জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে আসি। হয়তো এই মহিলাদের কোন একজন ছিল নিস্পাপ এই শিশুটির মা। সেদিনের আমাদের বুক চাপড়িয়ে কান্নার আওয়াজ যে কত তীব্র ছিল একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ জানবে না।
আরেকটি যুদ্ধের স্মৃাতিচারণ করতে গিয়ে মো. নাজিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, সেপ্টেম্বর মাসের ১২ বা ১৩ তারিখ হবে। বানাশুয়া থেকে সেনানিবাস এই গোমতীর চর এলাকাটিতে প্রতিদিন রোষ্টার করে পাক আর্মি ডিউটি করত। সকাল থেকে সন্ধায় এক গ্রুপ এর পর আরেক গ্রুপ। প্রতিদিন একটি গাড়ি এসে ৬জন দিয়ে যেত আর ডিউটি করা অপর ৬ জন নিয়ে যেত। ৭ দিন রেকি করে পুরো বিষয়টি আমরা জানতে পারি। বানাশুয়া থেকে সেনানিবাস এই এলাকায় মাঝামাঝি আড়াউওরা গ্রাম সংলগ্ন চরের ঢালু জায়গায় আমরা গ্রামবাসীর সহায়তায় একটি এ্যান্টি ট্যাংক মাইন বসিয়ে দেই। মাইনটি বসিয়ে আমরা নিরাপদ দূরুতে পর্যবেক্ষন করতে থাকি। ঠিক এর ৩০ মিনিট সময়ের মধ্যেই ৬জন পাক সেনা নিয়ে যেই না জিপ গাড়িটি মাইনটির উপর দিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনি এক বিকট শব্দে এটি বিস্ফোরিত হলো এবং ঘটনাস্থলেই ৬ পাক সেনা নিহত হয়। একই মাসে আমরা কুমিল্লা জিলা স্কুল ,রেলওয়ে ষ্টেশন ও বিআরটিসি বাস সার্ভিসের উপর একাধিকবার গ্রেনেড নিক্ষেপ করি। ফলে তৎকালীন জিলা স্কুল কতর্ৃৃপক্ষ বাধ্য হয় স্কুল বন্ধ করে দিতে। আমরা শহরে পৌঁছে গেছি পাকি সেনাদের মনে এমন একটি আতংক সৃষ্টি করার জন্য নভেম্বর মাসের শেষ দিকে কুমিল্লা পৌর সভার তৎকালীন চেয়ারম্যান বগা মিয়াকে পৌর ভবনের সামনে থেকে তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে গাড়ি হাইজ্যাক করে নিয়ে আসি। ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত কুমিল্লা শহর ও এর আশেপাশের এলাকায় আবদুল মতিন কমান্ডারের নেতৃত্বে অসংখ্য অপারেশন করি। আমাদের এই শহরের অভিযানে আমি আর মতিন কমান্ডার ছাড়াও যারা ছিলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন, নাজিম, আবু, নঈম, রফিক, ভিপি শাহ আলম, বুলবুল, জিল্লুর রহমান, কুহিনুর, জাহাঙ্গীর আলম, কমল, দিবা ও জুয়েলসহ আরো অনেকে । ৭ ডিসেম্বর সকালে আমরা রেইসকোর্সের দলিলুর রহমান দামালের বাড়িতে আমরা ক্যাম্প করে অবস্থান নেই। ৮ ডিসেম্বর সকালে এই বাড়ি থেকেই মিছিল নিয়ে আমরা টাউনহলে গিয়ে কুমিল্লা মুক্তির স্বাধ নেই সবার সাথে।
৮ ডিসেম্বর কুমিল্লা মুক্ত হয়। এ দিন আমরা আনন্দ মিছিল বের করি। এর পর বাড়ি যাই। বাড়ি গিয়ে দেখি, আমার চিন্তায় চিন্তায় বাবা-মা অসুস্থ হয়ে আছে। তখনকার স্মৃতিটাও অনেক আনন্দ বেদনার ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী জীবন কেমন ছিল জানতে চাইলে বীর এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ভালই আছি ইনশাল্লাহ। যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন সেই স্বপ্ন পূরন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি কিছুটা থেমে বলেন, হ্যাঁ, পূরণ হয়েছে। আমরা দেশকে স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখছিলাম। দেশতো স্বাধীন হয়েছে।
স্বাধীন সার্বভৌম আগামীর বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চান জানতে চাইলে তিনি বলেন, কথা বলার স্বাধীনতা এবং জান ও মালের নিরাপত্তা পাব এমন বাংলাদেশকে দেখতে চাই।

সংবাদটি শেয়ার করুন............
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares
  • 3
    Shares



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *