একটি দুঃস্বপ্নের রাত থেকে একটি দুর্বিষহ দিন

মো. মাহমুদুল হাছান রোহান, কুবি।
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম হল, হলে ওঠার বেশিদিন হয়নি। হলের ১০৬ নাম্বার রুম, যা ছিল গণরুম। সেখানেই প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ঠাঁই।

হল চলছিল তৎকালীন বর্বর ছাত্রলীগের নিয়ম অনুযায়ী। এমন সময় জুলাই মাসে শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সাধারণ শিক্ষার্থীরা দলে দলে যোগ দিতে থাকে এই আন্দোলনে।

 

৪ জুলাই, ২০২৪। ঢাকায় শুরু হয় আন্দোলন, এরই প্রেক্ষিতে ৫ তারিখ থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলন শুরু করে। ১১ জুলাই প্রথম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ গুলি চালায় তৎকালীন সরকারের পুলিশি বাহিনী তখন আন্দোলন আরো বেগবান হয়ে ওঠে। এরপর ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শহীদ হলে আন্দোলনের আগুন তীব্র হয়ে ওঠে।

১৭ জুলাই, ২০২৪। চারদিকে থমথমে পরিবেশ, দেশের অবস্থা ক্রমাগত ভয়াবহ হয়ে উঠছিল। এই ১৭ জুলাই রাতে হঠাৎ করেই খবর এলো ছাত্রলীগের কয়েকশো বাইক ক্যাম্পাসের দিকে আসছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল পুরো হল জুড়ে। শুধু নজরুল হলেই নয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বাকি হল গুলোতেও একই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গণরুমের সবাই এই নিয়ে কথা বলছি। হঠাৎ করেই গুলির শব্দের মত একটা আওয়াজ শোনা গেলে পুরো হল জোরে হইচই শুরু হয়ে যায়, হলের সব শিক্ষার্থী একযোগে তিন তালার ছাদে জড়ো হল। আশেপাশের হলেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

 

শিক্ষার্থীরা সবাই হাতে লাঠি নিয়ে ছাদে অপেক্ষা করতে থাকে এরপর যখন নিশ্চিত হয় যে শব্দটি গুলির ছিল না তখন সকলের মাঝে একটু স্বস্তি ফেরে।

কিছুক্ষণ পর তৎকালীন প্রো-ভিসি হলে আসেন এবং বলেন এমন কোন খবর তারা পায়নি কিন্তু উপরমহল থেকে চাপ আছে তাই শিক্ষার্থীরা যেন যত দ্রুত সম্ভব হল ছেড়ে চলে যান। শিক্ষার্থীরা তার এই কথার প্রেক্ষিতে তাকি নানা ধরনের প্রশ্ন করা শুরু করলে তিনি জানান তাদের হাত পা বাধা, তাদের কিছুই করার নেই। তাদের উপর মহল থেকে চাপ আছে বলে, তারা অতিসত্বর শিক্ষার্থীদের হল ছেড়ে চলে যেতে বলেন।

 

সেই ভয়াল রাতে হাতে লাঠি নিয়ে, ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প নিয়ে শিক্ষার্থীরা শুয়েছিল গণরুমে।স্ট্যাম্প সাথে নিয়ে শুয়ে ছিলাম, গণ রুমে সকলকে দেখছিলাম দুশ্চিন্তার ভাজ সবার চোখে মুখে। কেউ কেউ ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল আর কেউ কেউ চিন্তায় জেগে ছিল। বন্ধু শামীমকে জিজ্ঞেস করলাম,- ‘কিরে ঘুমাবি না?’ প্রতিউত্তরে সে বলল, ‘ঘুম আসছে না রে।’

তাকে আর কিছু বললাম না কারণ দেশের ওই পরিস্থিতিতে ঘুম না আসাটাই স্বাভাবিক।

এভাবেই কেউ জেগে, কেউ ঘুমিয়ে, একে অপরকে পাহারা দিয়ে, ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে সেই রাত্রি অতিবাহিত হয়েছে।

 

১৮ জুলাই, ২০২৪। সকাল ১১ টায় অবরোধ কর্মসূচি ছিল। পরিকল্পনা ছিল শান্তিপূর্ণ অপরোধ করবে শিক্ষার্থীরা। সকাল থেকেই কুমিল্লার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে শুরু করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে একযোগে সকল শিক্ষার্থী রওনা দেয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ির বিশ্বরোডের উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌঁছানোর পর মাইকে বারবার ঘোষণা দেয়া হয় শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে এখানে অবস্থান নিয়েছে তারা কোন প্রকার সংঘর্ষ চায়না।

 

কিন্তু বর্বর পুলিশ বাহিনী নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের উপরনির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। মাইকে বারবার ঘোষণা দেয়া হয় শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়া হবে, গুলি করা বন্ধ করতে অনুরোধ করা হয় কিন্তু তারপরেও বর্বর পুলিশ বাহিনী অনবরত গুলি চালাতে থাকে। আহত শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে নেয়ার জন্য তাদের গুলি থামাতে অনুরোধ করা হয় কিন্তু তারপরেও তারা গুলি চালাতেই থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে ঘোষণা দেয়া হয়—তারা যেহেতু শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে হামলা করছে এই শিক্ষার্থীরা তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে তা প্রতিহত করবে।

 

শুরু হয় এক অসম লড়াই। অস্ত্রে সসজ্জিত পুলিশ ও বিজিবি বাহিনী এবং নিরস্ত্র সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের হাতে লাঠি ও ছোট এদের টুকরো অপরদিকে পুলিশ ও বিজিবি বাহিনী অত্যাধুনিক সব অস্ত্রে সজ্জিত। রাবার বুলেট, ছররা গুলি, টিয়ারশেল, সাউন্ড বোম তারা অনবরত চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা সামনে এগোচ্ছে, আহত হচ্ছে, পিছিয়ে পিছিয়ে আসছে আবার গুলির সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি বিশ্বরোড অংশ সেদিন রক্তে পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল। বাতাসে ঘাম আর রক্তের গন্ধ, টিয়ার সেলের ধোয়ায় চারদিক অন্ধকার এবং অনবরত গুলির শব্দ।

পুলিশি বাহিনীর অস্ত্রের ভান্ডার যখন প্রায় ফুরিয়ে এসেছিল তখন শিক্ষার্থীরা একটু জিরোনোর সুযোগ পায়। মহাসড়কের ডিভাইডারে থাকা গাছের নিচে একদন্ড বসে আত্মা জুড়ানোর সুযোগ পায় তারা। কিন্তু তাদের বিশ্রাম বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি কিছুক্ষণের মধ্যেই আলেখারচর বিশ্বরোডের দিক থেকে অস্ত্র বোঝাই করা গাড়ি এলে পুনরায় শুরু হয় পুলিশই তাণ্ডব।

দুপুর ১২টা থেকে শুরু করে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা লড়াই করে গেছে পুলিশি বাহিনীর অস্ত্রের সম্মুখে। আহত হয় বহু শিক্ষার্থী।

 

আজ ১৮ জুলাই, ২০২৫। একটা বছর পেরিয়ে গেছি কিন্তু আজও কুমিল্লার কোটবাড়ির ওই অংশে এলেই মনে পড়ে বীভৎস সেইসব দিনের কথা। মনে পড়ে যায় কিভাবে একটি যৌক্তিক, অন্যায় সঙ্গত দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পড়তে হয়েছিল তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পুলিশী বাহিনীর অস্ত্রের সম্মুখীন।

এই ১৮ জুলাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক অমোচনীয় ইতিহাস। ১৮ জুলাই এর ইতিহাস কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্তাক্ত ইতিহাস। ১৮ জুলাই এর ইতিহাস কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার ইতিহাস। ১৮ জুলাই এর ইতিহাস কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরদের ইতিহাস।

 

১৭ জুলাইয়ের দুঃস্বপ্নের মতো রাত থেকে শুরু করে ১৮ জুলাইয়ের মতো দুর্বিষহ দিন, বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জনে যোগ করেছিল নতুন এক স্প্রিট, সকলের বুকে এনে দিয়েছিল সাহস, সকলকে শিখিয়েছিল কিভাবে অন্যায়ের সামনে মাথা উঁচু করে লড়াই করে যেতে হয়।