কুমিল্লার লাকসাম জংশনের লোকোশেডে পড়ে আছে মরিচা ধরা একটি ডেমু ট্রেন। ট্রেনটির আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নয়, বরং কেবল অচলতা ও অবহেলার নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দাম প্রায় ৩০ কোটি টাকা। আর এভাবে পড়ে থাকা ট্রেন শুধু একটি নয়, রেলের পূর্বাঞ্চলে আনা ২০টি ডেমু ট্রেনের প্রায় সবটিরই একই দশা। চীনের তৈরি এসব ট্রেন ২০১২ সালে আমদানি করেছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। খরচ হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা। পরিকল্পনা ছিল, কুমিল্লা-নোয়াখালী, কুমিল্লা-চাঁদপুর এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতকারী নিম্নআয়ের মানুষ যেন দ্রুত ও কম খরচে চলাচল করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। পূর্বাঞ্চলের চালু হওয়া সব ডেমু ট্রেনই এখন বিকল হয়ে পড়ে আছে।
রেলওয়ে সূত্র বলছে, এই অঞ্চলে এক সময় চলত ৫৪ জোড়া ট্রেন। এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬ জোড়ায়। ডেমু ট্রেন বন্ধ হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। কুমিল্লা রেলস্টেশনে টিকিটের জন্য লম্বা লাইন। অনেকে টিকিট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে।
এ বিষয়ে যাত্রী বেলাল হোসেন বলেন, আগে স্বল্প দূরত্বে সহজেই ট্রেনে যেতাম। এখন ট্রেনও চলে না, টিকিটও মেলে না। বাধ্য হয়ে বাসে যাচ্ছি। আরেক যাত্রী ইয়াছিন বলেন, ডেমু ট্রেনগুলো খুব দরকার ছিল। একটা ট্রেনেই শত শত যাত্রী যেত। এখন সেই সুযোগ নেই।
রেলওয়ের লাকসাম লোকোশেডের ইনচার্জ সাইফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এই ট্রেনগুলো পুরোপুরি বিকল হয়ে গেছে। এখন আমরাও ট্রেন না পেয়ে সড়কপথে চলাচল করি। ডেমু ট্রেনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে কুমিল্লা স্টেশনের মাস্টার আনোয়ার হোসেন বলেন, ডেমু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরা বেশি ভুগছেন। এখন আসনভিত্তিক টিকিটের চাহিদা তিন গুণ বেড়ে গেছে।
লাকসাম জংশনের স্টেশন মাস্টার ওমর ফারুক ভূঁইয়া বলেন, চালু থাকাকালে ডেমু থেকে ভালো আয় হতো। এখন যদি ট্রেনগুলো মেরামত করে চালু করা যায়, তাহলে অনেকটা চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী লিয়াকত আলী মজুমদার বলেন, ডেমুগুলো মেরামত করলে স্বল্প খরচে যাতায়াতের একটি কার্যকর ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
তবে সমস্যার শিকড় আরও গভীরে। রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, এসব আধুনিক ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও জনবল না থাকায় রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে বছর বছর ধরে পড়ে আছে ট্রেনগুলো। মেরামতের কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি মন্ত্রণালয় থেকে।
রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, যতদিন না নতুন ট্রেন আনা হচ্ছে কিংবা বিকল ডেমুগুলো মেরামত হচ্ছে, ততদিন পূর্বাঞ্চলের রেলব্যবস্থার সংকট কাটবে না। আর এতে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হবে স্বল্প আয়ের মানুষকে, যাদের জন্যই মূলত ডেমু ট্রেনগুলো আনা হয়েছিল।