কুমিল্লা শহরের ময়লায় দূষিত হচ্ছে ডাকাতিয়া নদী

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২ সপ্তাহ আগে

# সিটি কর্পোরেশন ভূমিকা রাখতে পারে—পানি উন্নয়ন বোর্ড
# ইপিজেডের নয়, এগুলো কুমিল্লা শহরের বর্জ্য—-পরিবেশ ডিডি
# দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হবে- কুমিল্লা সিটির নির্বাহী প্রকৌশলী
# ২০২২ সালে একটা কমিটিও করা হয়েছে— অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক

 

একটা সময় এই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো বহু মানুষ। নদীর পাড়ের মানুষের তৃষ্ণা নিবারণ হতো ডাকাতিয়া নদীর পানিতে। সকাল থেকে সন্ধ্যায় নৌকার চলাচল ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এখন কালের বিবর্তনে কোনটিই দেখা যায় না। হারিয়ে যাচ্ছে ডাকাতিয়া নদীর সেই চেনা রূপ। নদীর পাড়ের মানুষের জীবনে ডাকাতিয়া হয়ে উঠেছে এখন বিষের কাঁটা। নদীর বিষাক্ত কালো পানিতে এখন আর মাছ নেই। রান্নার কাজেও ব্যবহার করা যায়না পানি। গোসল করা যায়না পানিতে। পানির দূর্গন্ধে অসুস্থ হয়ে উঠেছেন বহু মানুষ। বছরের পর বছর ডাকাতিয়ার এমন অবস্থায় কোন প্রকার ব্যবস্থা নিচ্ছেনা কর্তৃপক্ষ।

২০৭ কি.মি. দৈর্ঘ্যের ডাকাতিয়া নদীটি বাংলাদেশ ভারতের একটি আন্তঃ সীমানা নদী। নদীটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের চাঁদপুর ও কুমিল্লার উপর দিয়ে বহমান। কুমিল্লায় ডাকাতিয়া নদীর দৈর্ঘ্য ৫০ কি.মি.। এছাড়াও ডাকাতিয়া নদীকে মেঘনা নদীর উপনদী বলা হয়। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যর পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লা জেলার বাগমারা দিয়ে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে যা লক্ষীপুর জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত এবং পরবর্তীতে লাকসাম হয়ে চাঁদপুর মোহনায় মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে। কতিথ আছে, এক সময় এই নদী দিয়ে মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা নোয়াখালী ও কুমিল্লায় প্রবেশ করতো। এই নদীতে তাদের মাধ্যমেই ডাকাতি হতো। ডাকাতির উপদ্রবের কারণেই নদীটির নাম ডাকাতিয়া হয়েছে। এছাড়াও মেঘনা নদীর উপনদী হিসেবে একটা সময় খরস্রোতা ছিল বলেও মনে করেন কেউ কেউ আর সে জন্য বহু মানুষও নাকি বলি হয়েছেন এই নদীতে। আর তাই ডাকাতিয়া নামে খ্যাতি পেয়েছে নদীটি।

কুমিল্লা ইপিজেড ও কুমিল্লা শহরের যাবতীয় বর্জ্য সিটি কর্পোরেশনের ড্রেন দিয়ে রোহিতা খাল হয়ে সোনাইছড়ি খাল। নতুন ডাকাতিয়া নদী, পুরাতন ডাকাতিয়া, গুইঙ্গাজুড়ি নদীতে শাখা খালের মাধ্যমে এই বর্জ্য গিয়ে পড়ে। যার কারণে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। দিনের পর দিন দূষিত হয়েই চলেছে কুমিল্লার দক্ষিণ অঞ্চলের নদীগুলো। পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতায় কোন প্রকার কার্যকর ভূমিকা নেই বললেই চলে।
একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যস্ত দপ্তরগুলো। অতিরিক্ত মাত্রায় পানি দূষণের কারণে দূর্গন্ধে এখন নদীর পাড়ের অনেক মানুষই রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে তারা ভীড় করছেন হাসপাতালগুলোতে।

সোনাইছড়ি পানি অথোরাইজড ফেডারেশনের সভাপতি শহীদ আহম্মেদ বাবুল বলেন, কুমিল্লা ইপিজেডের সমস্ত ময়লা আবর্জনা প্রথমে রোহিতা খাল হয়ে সোনাইছড়ি খাল দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং পরে তা নতুন ডাকাতিয়া, গুইঙ্গাজুড়ি, পুরান ডাকাতিয়া সহ অন্যান্য নদীতে গিয়ে পরে যার কারণে পানি অতিরিক্ত মাত্রায় দূষিত হচ্ছে। কুমিল্লা ইপিজেডে ইটিপি থাকলেও যথাযথ ব্যবহার না হওয়াতে ময়লা আবর্জনার পরিমাণ বেশি হচ্ছে। এছাড়াও নদীর পানি দূষিত হয় বিধায় আমরা মানববন্ধন করেছি, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দিয়েছি কিন্তু ইপিজেড এর বিষয়টা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর দেখবাল করে বিধায় কোন প্রকার সুফল আসেনি।

কুমিল্লা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোসাব্বের হোসেন মোহাম্মদ রাজিব বলেন, এইটা এর আগেও স্থানীয় মন্ত্রী মহোদয় আমারে বলছিল ইপিজেড এর বর্জ্য না। মূলত এইটা হলো ইপিজেডের ভিতরে যে ইটিপি আছে, ওরা সেটা নিষ্কাশন করে ফেলে। এখানে কুমিল্লা সিটির যে বর্জ্য আমাদের বাথরুমের বর্জ্য, রান্নার বর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য, তরল বর্জ্য, অন্যান্য সব বর্জ্য বিভিন্ন খাল হয়ে ডাকাতিয়া নদীতে গিয়ে পড়ে। তাছাড়া ইপিজেড এর নিষ্কাশিত বর্জ্যটা সিটি করপোরেশনের ড্রেনে দিয়ে যাচ্ছে। সে জন্য বাহির থেকে বুঝাচ্ছে এগুলো সব ইপিজেড এর বর্জ্য। মূলত এগুলো কুমিল্লা শহরের বর্জ্য।

উপজেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি লালমাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ হেলাল চৌধুরী বলেন, যেহেতু পানি দূষণস্থান শহরে সেহেতু আমরা খুব কম সময়ের মধ্যে ডাকাতিয়ার পানি টেষ্ট করবো কি কারণে দূষিত হচ্ছে এবং রিপোর্ট পেলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিব।

কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, এগুলো নিয়ে প্রতি মাসেই মাসিক সমন্বয় সভায় আলোচনা হয়। কুমিল্লার শহর থেকে কাঁটা খাল দিয়ে বর্জ্য গিয়ে পড়ছে গুইঙ্গাজুড়িতে এবং গুইঙ্গাজুড়ি হয়েই নতুন ডাকাতিয়া নদীতে পড়ে এইটা হচ্ছে মূল দূষণের কারণ। মূলত পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব পরিবেশ দূষন রোধ করা। এই ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন ভূমিকা রাখতে পারে। যেহেতু আর্বজনাটা সিটি কর্পোরেশন দিয়েই খালের মাধ্যমে বের হয়। এছাড়াও পরিবেশ অধিদপ্তর যদি ব্যবস্থা নেয় সেই ক্ষেত্রে কারিগরি সার্পোট লাগলে আমরা দেবো।

কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, ডাকাতিয়া নদীর পানি দূষণ নিয়ে এর আগেও আমরা একাধিক বার বসেছি। এছাড়া ২০২২ সালে সার্বিক বিষয়ে খতিয়ে দেখার জন্য একটা কমিটিও করা হয়েছে। তবে, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করর্পোরেশন সহ সবাই সম্মলিত ভাবে চেষ্টা করলে সমাধান হতে পারে। ইতিপূর্বে এই বিষয়ে কোন অভিযোগ কিংবা মানববন্ধন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বিষয়টা অবগত নন বলে জানান এই কর্মকর্তা।

কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়েম ভূঁইয়া বলেন, বিশ্ব ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার সাথে যৌথভাবে মিলে আমরা কুমিল্লা নগরীর বর্জ্য নিষ্কাশন নিয়ে কাজ করছি। দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হবে।