ক্লাসে অনুপস্থিতিই কিশোর গ্যাং সৃষ্টি করে

অধ্যাপক ডাঃ মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে

চট্টগ্রাম মেট্রপলিটন পুলিশের একটি বিশেষ শাখার নজরে এসেছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের একটি বিরাট অংশ নানা অজুহাতে ক্লাস ফাঁকি দিচ্ছে। উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা না থাকায় তারা ক্লাসের বাইরে সময় কাটাতে গিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক নেতা ও গডফাদারদের সংস্পর্শে হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। এ অবস্থার উত্তরণে বেশকিছু সুপারিশ এসেছে। প্রধান সুপারিশ হচ্ছে নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে উপস্থিতি শতকরা ৭০ ভাগ নিশ্চিত করা। উপস্থিত না থাকলে নির্বাচনী ও চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না দেয়া। ক্লাসে উপস্থিত না হওয়ায় অনেক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব সমাজে পড়ছে। কিশোর গ্যাং এর সদস্য হয়ে সহপাঠীর উপর প্রাধান্য বিস্তার করছে। সহপাঠীকে শায়েস্তা করতে অপরজনও কোন না কোন কিশোর গ্যাং অথবা কথিত রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের ছত্রছায়ায় যাচ্ছে। ক্লাস চলাকালে শহরের বিভিন্ন বিনোদন স্পট, রেষ্টুরেন্ট পার্ক, সিনেমা হল ও মার্কেট তাদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। স্কুলের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতা, আবৃত্তি, চিত্রাংকনে তাদের আগ্রহ কমছে। এদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। অনলাইনের ভিডিও গেমে অনেক সময় দিচ্ছে, অনেক হরেক রকমের জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে। ভেলেন্টাইন ডে, জন্মদিন পালনের নামে বিভিন্ন রেষ্টুরেন্টে, পার্কে সময় কাটাচ্ছে। এসব উদযাপন করার নামে বিকৃত সংস্কৃতি চর্চায় জড়িয়ে পড়ছে। সিগারেট ও মাদকের পয়সা জোগাড় করতে ছিনতাই, চুরি, এমনকি ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়ছে।
এ প্রসঙ্গে সমাজ সংস্কারকরা মনে করছেন, অপরাধী হয়ে উঠার আগেই যদি তাদের থামানো যায়, অর্থাৎ ক্লাসে উপস্থিতির একটা নিম্নতম হার নির্ধারণ করে দেয়া যায় তবে ঝুঁকিটা একটু কমবে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রনালয় এবং শিক্ষাবোর্ড দ্বায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে পারে। ২০১৫ সালে শিক্ষামন্ত্রনালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৭০ শতাংশ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করেছিল। প্রজ্ঞাপনে নির্বাচনী বা প্রাক নির্বাচনী পরীক্ষার অকৃতকার্য হলেও উপস্থিতি বিবেচনায় কৃতকার্য করারও বিধান রাখা হয়েছিল। কিন্তু পরে আদেশটি অজ্ঞাত কারণে বাতিল করা হয়। যদি নির্দিষ্ট হারে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের ক্লাস ফাঁকি দেয়ার সুযোগ থাকবে না। কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার নির্ভরতাও কমে আসবে। অপরাধে জড়ানোর সুযোগ থাকবে না। শিক্ষা মন্ত্রনালয় যদি এ ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে অবশ্যই তা স্কুল কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন করবে এবং শিক্ষাবোর্ড তা তদারকি করতে বাধ্য থাকিবে।
সম্প্রতি মিডিয়ায় প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, ঢাকার গাংচিল বাহিনীর মত অন্ততঃ ৮০ টি বাহিনীর খোঁজ পাওয়া গেছে যেগুলোর বেশির ভাগই কিশোর গ্যাং নামে পরিচিত। নামে কিশোর গ্যাং হলেও অনেকেরই বয়স ১৮ বয়সের বেশি। তারা ছিনতাই, মাদকব্যবসা, চাঁদাবাজী, জমি দখলে সহায়তা, ক্যাবল টিভি ব্যবসা, কারখানা-ময়লা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, ইন্টারনেট সংযোগ ইত্যাদি ব্যবসাসমূহ, মারধর, হামলা ও যৌন হয়রানিসহ নানাহ অপরাধে জড়িত। এসব চক্রের নেতা বা সদস্যদের বড় অংশ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, অনেকেই বস্তিতে থাকে। তবে সঙ্গদোষে অনেক স্কুল কলেজের ছাত্রও এসব চক্রে জড়িয়ে পড়ে। বাহিনীগুলোর নেতাদের কেউ কেউ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ক্ষমতাশীল। পুলিশ কিশোর গ্যাং নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সারাদেশে ১৭৩ টি গ্যাং রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কিশোর গ্যাং গুলো অলিগলিতে চায়ের দোকানে বা বিশেষ কোন স্থানে অবস্থান নিয়ে আড্ডা জমায়। তাদের দ্বারা সংগঠিত হয় নানাহ অপরাধ। পুলিশ অনেক জাতীয় অপরাধ দমনে ব্যস্ত থাকে, অধিকতর একটিভ র‌্যাব বাহিনী এ ব্যাপারে মনযোগ দিলে কিশোর গ্যাং ও তাদের অপরাধ দমনে সামাজিক প্রতিরোধ আসত বলে অনেকেই মনে করে।
এসব কিশোর গ্যাং একদিনে গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিকদের ছত্রছায়া, আশ্রয়-প্রশ্রয় ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দূর্বল পদক্ষেপ এসব বাহিনী ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। এগুলো এখন সমাজের গলার কাটা। শুধু রাজধানীতে নয়, বড় বড় শহর ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের নিরাপদ বসবাস হুমকির সম্মুখিন। কিশোর গ্যাং কালচার এবং কিশোর অপরাধ বর্তমান সময়ে গুরুতর সামাজিক সমস্যা। কিশোর গ্যাং এর বিরুদ্ধে অভিভাকরা শঙ্কিত। কিশোর অপরাধ দমনে শুধু আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হলেই চলবে না। পারিবারিক সুশিক্ষা, ধর্মীয় নৈতিকতা শিক্ষার সঙ্গে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। উচ্চ পর্য্যায়ের নীতি নির্ধারকরা বিষয়টি তদারকী করতে হবে।

সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ