চান্দিনায় বিচারের বদলে গৃহবধূকে ধর্ষকদের হাতে তুলে দিল নারী ইউপি চেয়ারম্যান!

কথিত ধর্ষকরা ধর্ষণের পাশাপাশি আত্মসাত করল সাড়ে চার লাখ টাকাও
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

কুমিল্লার চান্দিনায় এক অসহায় গৃহবধূ ৪নং মহিচাইল ইউপি চেয়ারম্যান মাকসুদা আক্তারের কাছে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের বিচার চাইতে গিয়ে চেয়ারম্যানের ভাই ও ভাসুরের কাছে ধর্ষণের শিকার হলেন এবং সাথে খোয়ালেন সাড়ে চার লাখ টাকাও । আবার ধর্ষণের ভিডিও করে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দিলেন চেয়ারম্যান মাকসুদার ছোট ছেলে মৃদুল। কোন উপায় না দেখে দুই সন্তানের এই অসহায় জননী অবশেষে মামলা করেন আদালতে। সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগ ম্যাধ্যমে আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হলে এ নিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। চেয়ারম্যানসহ ধর্ষকদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয় এলাকাবাসী।
ভুক্তভোগী ওই গৃহবধূ প্রথমে অভিযোগ নিয়ে চান্দিনা থানায় গেলেও থানা মামলা না নিয়ে তাকে পাঠানো হয় আদালতে।
এ বিষয়ে গত ১ অক্টোবর ৪নং মহিচাইল ইউপি চেয়ারম্যান মাকসুদা আক্তার, ইউপি চেয়ারম্যানের ভাসুর ও স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা এ কে এম হারুন ভূঁইয়া ও আপন বড় ভাই ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হোসেন,মারুফ ভূইয়া ও দেলোয়ার হোসেন এই ৫ জনের বিরুদ্ধে পর্ণগ্রাফি, ধষর্ণ ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কুমিল্লার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল বিশেষ আদালত-২ এ মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী।

মামলার অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জনৈক গৃহবধূ স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাকসুদা আক্তারের কাছে সৌদি প্রবাসী স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের বিচার চাইতে যায়। পরে চেয়ারম্যান মাকসুদা আক্তার বিচার করে দেয়ার জন্য পাঠিয়ে দেন তার ভাসুর দুদকের সাবেক কর্মকর্তা এ কে এম হারুন ভূঁইয়া (৫৫)ও আপন বড় ভাই মহিচাইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সহ সভাপতি মোহাম্মদ হোসেনের(৪৫)কাছে। তারা দুই জনই বিচার করে দেওয়ার নামে সময়ক্ষেপন করে গৃহবধূর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তুলে।

এ সময় চেয়ারম্যানের ভাসুর হারুন ও ভাই মোহাম্মদ লন্ডনে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে গৃহবধূর কাছ থেকে হাতিয়ে নেন সাড়ে চার লাখ টাকা। প্রায় বছর খানেক পার হলেও বিদেশে না পাঠানো এবং স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের বিচার না পেয়ে টাকা ফেরত চান ওই ভুক্তভোগী গৃহবধূ। টাকা চাওয়ায় শুরু হয় হুমকি-ধমকি । এক পর্যায়ে তাকে জিম্মি করে তারা দুই জন পৃথক ভাবে,পৃথক স্থানে ও সময়ে জোড় পূর্বক তাকে ধর্ষণ করে এবং জোড় পূর্বক ভিডিও করে। পরবর্তীতে অনৈক সম্পর্কের এই ভিডিও ধারণ করে ছেড়ে দেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

ভুক্তভোগী গৃহবধূর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করায় আমি একা হয়ে পড়ি। চেয়ারম্যানের কাছে বিচার চাইতে গেলে তিনি তার ভাসুর ও ভাইয়ের কাছে আমাকে পাঠিয়ে দেয়। বিচারের নামে তারা আমার সাথে সময়ক্ষেপন করে। তারা আমাকে লন্ডনের ভিসা দিবে বলে আমার কাছ থেকে সাড়ে চার লক্ষ টাকা নিয়েছে। পরে তারা ভিসাও দেয় নি আর টাকা চাইলে তারা আমাকে হুমকি ধামকিসহ আমার মেয়েকে তুলে নিয়ে যাবে ও আমার ছেলের ক্ষতি করবে বলে জানায়। এক পর্যায়ে তারা আমাকে কুপ্রস্তাব দেয়। তাদের কথা না শুনলে টাকাও দিবে না এবং ছেলে মেয়ের ক্ষতিসাধন করবে এই ভয়ে আমি তাদের কুপ্রস্তাবে বাধ্য হয়ে রাজি হই। কিন্তু তারা আমার সাথে জোড়পূর্বক খারাপ কাজ করে এবং ভিডিও ধারণ করে। পরে চেয়ারম্যানের ছোট ছেলে মৃদুল এই ভিডিওগুলো ভাইরাল করে দেয়। এখন আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমি প্রশাসনের এর সুষ্ঠু বিচার চাই।

গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ নভেম্বর) সরেজমিনে ইউপি চেয়ারম্যান মাকসুদা আক্তার ও তার ভাই ও ভাসুরের খোঁজে চান্দিনার মহিচাইল ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায় চেয়ারম্যানের কক্ষে তালা ঝুলানো। পাওয়া যায় নি চেয়ারম্যানকে। এছাড়াও, তার পরচঙ্গা গ্রামে গিয়েও পাওয়া যায় নি অভিযুক্ত হারুন ও মোহাম্মদ হোসেনকে। এলাকাবাসীর কাছে জানতে চাইলে, প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পায় সবাই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় জনগন জানায়, এর আগেও একাধিক নারীর সঙ্গে ধরা পড়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হোসেন। আর সব কটিই ধামচাপা দেয়া হয়েছে অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে। এসব অপকর্মের কঠিন বিচারও চাইলেন তারা।

এবিষয়ে অভিযুক্ত হারুনও মোহাম্মদ হোসেনের কাছে সেল ফোনে পৃথক ভাবে জানতে চাইলে তারা বলেন, এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমরা এখন কিছুই বলতে চাই না, প্রমাণ আদালতে হবে।

আর ইউপি চেয়ারম্যান মাকসুদা আক্তারের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, বিষয়টি আমরা দেখছি। এই বিষয়ে আর লজ্জা দিবেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, চান্দিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহাউদ্দিন বলেন, শুনেছি মামলা হয়েছে এবং পিবিআই তা তদন্ত করছেন। ভুক্তভোগী গৃহবধূ যখন থানায় এসেছিলেন মামলা করতে তখন কেন মামলা নিলেন না জানতে চাইলে ওসি গৃহবধূর থানায় আসার বিষয়টি অস্বীকার করেন।

এই বিষয়ে চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপস শীল বলেন, ঘটনার বিস্তারিত জেনে আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।