শ্রীলঙ্কা সিরিজের পর জুন মাসে টেস্ট অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। নেতৃত্ব হারানো সময়টা তাকে স্মৃতিতে গেঁথে দিয়েছে কিছু চাপ, কিছু অস্বস্তি আর কিছু আত্মঅনুশীলন। কিন্তু কয়েক মাস পরই আয়ারল্যান্ড সিরিজ শুরুর আগে আবারও তাঁকে নেতৃত্বে ফেরায় বিসিবি। আর সেই প্রত্যাবর্তন যেন একদম গল্পের মতো-সিলেট টেস্টে ব্যাট হাতে সেঞ্চুরি করে নেতৃত্বের প্রতিশোধটা নিলেন শান্ত তার নিজের স্টাইলে, শান্ত-সুলভ ভঙ্গিতেই।
আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ১০০ রানের ইনিংসটি ছিল তাঁর ব্যাটিং মেজাজের নিখুঁত প্রকাশ। টেস্টে অধিনায়ক হিসেবে এটি তাঁর চতুর্থ সেঞ্চুরি। কিন্তু শান্ত বলেন, তিনি ব্যাট হাতে নামলে নেতৃত্ব মাথায় রাখেন না। সংবাদ সম্মেলনে শান্ত জানালেন, ব্যাটিং করার সময় তিনি নিজেকে শুধু একজন ব্যাটার হিসেবেই ভাবেন, দলের নেতা হিসেবে নয়, ‘আমি সবসময় যেটা বলি, ব্যাটিংয়ের সময় একজন ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতে পছন্দ করি। মনে হয় না যে আমি ক্যাপ্টেন হিসেবে ব্যাট করছি। ফিল্ডিংয়ে থাকলে তখনই ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করি।’
নেতৃত্ব হারানোর পরের দিনগুলো কেমন ছিল-এ প্রশ্নে শান্তর স্বীকারোক্তি ছিল অকৃত্রিম। শুরুটা কঠিন ছিল, তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে নতুনভাবে গুছিয়ে নেওয়া। পরিবারের সাথে সময় কাটানো, নিজের দক্ষতা শান দেওয়া এবং মানসিক প্রশান্তি ফিরে পাওয়াই ছিল সেই বিরতির মূল লাভ। শান্ত বলেন, ‘প্রথম দিকটা কঠিন ছিল। পরে রিল্যাক্স হয়ে গিয়েছিলাম। সময়টা খুব ভালো কেটেছে, নিজেকে আর ফ্যামিলিকে সময় দিয়েছি, নিজের ক্রিকেটটা কীভাবে আরও উন্নত করা যায় তা ভেবেছি।’
সিলেট টেস্টে বাংলাদেশের জয় ছিল প্রত্যাশিত, সাড়ে তিন দিনেই ম্যাচ শেষ করে ইনিংস ও ৪৭ রানের জয় পায় দল। তৃতীয় দিনেই ম্যাচের ভাগ্য প্রায় নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। চতুর্থ দিনের শুরুতে ম্যাকব্রাইনের ফিফটি আর লোয়ার অর্ডারের লড়াই জয়ের ব্যবধান কিছুটা কমালেও বাংলাদেশের দাপট নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। সিরিজের প্রথম ম্যাচ থেকেই বাংলাদেশ দেখিয়েছে নিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস এবং পরিকল্পনার সংগতি।
শান্তর ক্যারিয়ারে ৩৮ টেস্টে ৮ সেঞ্চুরি আর ৫ ফিফটি, সংখ্যা বলে তারই প্রমাণ। যেখানে অনেক বাংলাদেশি ব্যাটারই ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে পরিণত করতে হিমশিম খেয়েছেন, শান্ত সেখানে ঠিক বিপরীত দিকেই হাঁটছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি হেসে বললেন, তাঁকে এখনই এত প্রশংসায় ভাসানোর সময় আসেনি, ‘মাত্র তো ৩৮টা ম্যাচ খেলেছি। যদি মুশফিক ভাইয়ের মতো ১০০–১৫০ টেস্ট খেলার পরও এমন ধারাবাহিক থাকতে পারি, তখনই বলা যাবে ক্যারিয়ার ভালোভাবে শেষ হয়েছে।’
বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটার এখনও শততম টেস্ট খেলেননি। মুশফিকুর রহিম সেই অধ্যায় ভাঙতে যাচ্ছেন মিরপুরে। শান্তও নিজের দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন লুকাননি, তবে বাস্তবতার মাটিতে পা রেখেই, ‘৯৯ তো না, ১০০ টেস্ট অবশ্যই খেলতে চাই। তবে সুস্থ থাকতে হবে, পারফর্ম করতে হবে। এত লম্বা চিন্তা এখনই করি না।’
নিজের সেঞ্চুরি ইনিংস নিয়ে শান্তর মূল্যায়নও ছিল সরল ও পেশাদার। তিনি জানালেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খারাপ বল কম পাওয়া যায়, তাই যেটুকু আসে সেটাকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। কয়েকটি প্যাডেল সুইপ খেলেও তিনি মূলত শট সিলেকশনে মনোযোগী ছিলেন।
এখন সিরিজে ১–০ তে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশ সামনে তাকিয়ে আছে মিরপুরে দ্বিতীয় টেস্টের দিকে। ১৯ নভেম্বর শুরু হতে যাওয়া সেই ম্যাচটি জয়ের লড়াইয়ের পাশাপাশি এক ঐতিহাসিক উপলক্ষও, মুশফিকুর রহিমের শততম টেস্ট। সিলেটে পাওয়া জয়ের শক্তি নিয়ে দল যখন ঢাকার চ্যালেঞ্জে নামবে, তখন শান্তের নেতৃত্ব ও ব্যাটিং দুটোই আবার আলোচনার কেন্দ্রেই থাকবে, ঠিক যেমনটা তার প্রত্যাবর্তনের গল্পে দেখা গেছে।