নিরবে নিভৃতে চোখের পানি ফেলে পাহাড়সম বড্ড অভিমান নিয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাচ্ছেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও দেশের প্রতিথযশা আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে দেশব্যাপী গড়ে উঠা আন্দোলনের সময় পুলিশের লাঠির আঘাত লাগে তার মাথায়। তাৎক্ষণিক অবস্থার গুরুতর মনে না হলেও বাসায় গিয়ে শুরু হয় ব্যথা। এরপর পর্যায়ক্রমে চলে দেশ-বিদেশে চিকিৎসা। কিন্তু লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করলেও দেশের মাঠ কাঁপানো এই জীবন্ত কিংবদন্তি রাজনীতিবিদকে আর রাজনীতির মাঠে ফেরাতে পারেনি। আস্তে আস্তে তিনি চলে যান লোকচক্ষুর অন্তরালে। সাথে দলেরও। যে দলের জন্য জীবনের উজ্জ্বলতম সংগ্রামী সময়গুলো ব্যয় করেছেন পথে প্রান্তরে।
ইতিমধ্যে চলতি বছর হারিয়েছেন প্রিয়তমা স্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শাহিদা রফিককে। স্ত্রীকে হারিয়ে আরও একা হয়ে পড়েন এক সময়ের দাপুটে রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। কিছু দিন আগে শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে স্বজনরা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করান। গেল সপ্তাহে হাসপাতাল থেকে ঢাকা মিরপুরে ছোট ভাই মাহফুজুল ইসলাম মিয়ার বাসায় উঠেন। সেখানেই জীবনের বর্ণাঢ্য সময়ের হিসেব মিলাতে চেষ্টা করছেন। কথা বলা ও চলাফেরা করতে না পারা ব্যারিস্টার রফিক বর্তমানে কাউকে খুব একটা চিনতেও পারেন না। বলা যায়, ভাইয়ের বাসায় জীবনের সর্বশেষ দিনগুলো তিনি কাটাচ্ছেন এখন।
ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া কুমিল্লার মুরাদনগরের সন্তান। নবম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি ছাত্রলীগের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন। ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রছাত্রী সংসদ নির্বাচনে তিনি ভিপি নির্বাচিত হন। এ সময় জিএস নির্বাচিত হন একই প্যানেলের অধ্যক্ষ আফজল খান অ্যাডভোকেট।
ছাত্রজীবন শেষ করে ব্যারিস্টার রফিক যখন লন্ডনে ব্যারিস্টার এট ল– শেষ করে লন্ডনেই আইন পেশা শুরু করেন, তখনই তার ডাক পড়ে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের। শহীদ জিয়ার আহ্বানে গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ নির্মাণ করতে লন্ডনের রাজকীয় জীবন ফেলে চলে আসেন বাংলাদেশে। তখন বিএনপির চেয়ারম্যান ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আর মহাসচিব ছিলেন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। রাজনীতি এবং আইন পেশা দুটিই সমান তালে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ৯০ এর স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ব্যারিস্টার রফিক বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
যার ফলশ্রুতিতে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সদ্য সাবেক মন্ত্রী ও এমপি আলহাজ্ব শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর বিএনপি বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠন করলে প্রথমে শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও পরে গণপূর্ত মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এ সময় বিএনপির পূর্ণ মেয়াদে তিনি মন্ত্রিত্ব করেন।
২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলামকে পেছনে ফেলে জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়েই ধানের শীষের মনোনয়ন প্রাপ্ত হন সাবেক এমপি কায়কোবাদ। এরপর বেশ কয়েক বছর ব্যারিস্টার রফিক গ্রুপ ও কায়কোবাদ গ্রুপ মুরাদনগরে রাজনীতি চলে। এক পর্যায়ে ব্যারিস্টার রফিক ঢাকা ভিত্তিক রাজনীতি শুরু করেন। পদোন্নতি পান দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারনী পদ জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে। সেই থেকে ব্যারিস্টার রফিক এখন পর্যন্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য হিসেবে আছেন। যদিও ২০১৮ সালের পর থেকে তিনি রাজনীতি থেকে একেবারেই দূরে। অসুস্থ হয়ে বাসায় শয্যাশায়ী।
এক সময়ের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপি, জাঁদরেল রাজনীতিবিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া এখন ছোট ভাইয়ের বাসভবনে নির্বাক, নিথর হয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত করছেন। তার ছোট ছেলে থাকে আমেরিকা ও বড় ছেলে লন্ডনে। পালাক্রমে দুই ভাই দেশে এসে বাবাকে কিছুটা সান্নিধ্য দিয়ে যান বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার এক স্বজন এই প্রতিবেদককে দুঃখ করে বলেন, যে বিএনপির জন্য লন্ডনের বিলাসী জীবন ত্যাগ করে দেশে এসে রাজনীতি করল, যে বিএনপির জন্য ২০১৮ সালে আন্দোলন করে আজ ৮ বছর ধরে বাসায় শয্যাশায়ী হয়ে মৃত্যুর ক্ষণ গুনছে, সেই বিএনপির কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এখন আর উনার কোনো খোঁজখবর নেন না। এমনকি তার হাত দিয়ে অসংখ্য শুধু আইনজীবীই সৃষ্টি হয়নি, হয়েছে আইনজীবী নেতাও, সেই আইনজীবীরাও এখন তার কোনো খোঁজখবর নেয় না।
এখন রফিক সাহেবের কোনো চিন্তাশক্তি নেই কিংবা কাউকে দেখলে চিনতে পারেন না এ কথা বলে তাঁর ঐ স্বজন বলেন, যতদিন উনার স্মৃতিশক্তি ছিল ততদিন দলের খোঁজখবর নিয়েছে। জানতে চেয়েছে তার খোঁজ নিতে কেউ ফোন করছে কি না। আমরা অনেক সময় তাকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিতাম। যদি মিথ্যে মিথ্যে বলতাম, বিএনপির বড় বড় নেতারা আপনার খোঁজ নিয়েছে, জানতে চেয়েছে আপনি কেমন আছেন, তখন চোখ দিয়ে টলটল করে পানি পড়ত, আবার হাসিও দিতেন। কারণ, সারাজীবন রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানো এই লোকটিকে বিছানায় আটকে রাখা যে কত কষ্ট হচ্ছে তা গত ৭/৮ বছরে আমরা হারে হারে টের পাই।
জানতে চাইলে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার আপন ভাগিনা জাহাঙ্গীর আলম কাজল শুক্রবার (২৯ আগস্ট) দৈনিক কুমিল্লার জমিনকে বলেন, মামা এখন আর কাউকে খুব একটা চিনতে পারেন না। মামি ড. প্রফেসর শাহিদা রফিক মারা যাওয়ার পর তিনি মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়েছেন। বড় ছেলে থাকেন আমেরিকা আর ছোট ছেলে থাকেন লন্ডনে। পালাক্রমে এক ভাই গেলে আরেক ভাই আসেন। এখন আমার ছোট মামার বাসায় আছেন। তিনি দুঃখ করে বলেন, মামা প্রতিনিয়ত বিএনপিকে মিস করেন। ২০১৮ সালের আন্দোলন চলাকালে হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক রাজনৈতিক মিটিং এ যোগ দিতে গেলে তিনি পুলিশের লাঠির আঘাতপ্রাপ্ত হন। এরপর বাসায় এসে যখন ব্যথা অনুভব করেন, তখন তো প্রথমে দেশে পরে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়েছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। যদি দলের নেতাকর্মীরা উনার একটু খোঁজখবর নিতেন তাহলে তিনি মানসিকভাবে কিছুটা সুস্থ থাকতেন বলে আমার কাছে মনে হয়। সব সময় ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকেন। মনে হয় কী যেন খুঁজেন। কিন্তু আমরা উপলব্ধি করি, তিনি প্রতিনিয়ত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বিএনপির নেতাকর্মীদের খুঁজে বেড়ান। এখন তো কথা বলারও শক্তি নেই। যখন কথা বলতে পারতেন, তখন অভিমান নিয়ে বলতেন, আমি অসুস্থ হয়ে বাসায় পড়ে আছি, অথচ আমার রাজনীতির সহকর্মীরা বা যাদের আমি নেতা বানিয়েছি তারাও এখন আর আমার খবর নেয় না।
লেখাটি শেষ করতে গিয়ে ভাবছি, যার ক্ষণিক পদচারণায় এক সময় মুখরিত হয়ে উঠতো রাজপথ, আজ তিনি একা, বড্ড একা। পার্থিব তার আর কোনো কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই। জাগতিক সকল লোভ-লালসার তিনি এখন অনেক ঊর্ধ্বে। অথচ তিনি এখনো বেঁচে আছেন। কিন্তু স্বজনরা ছাড়া কেউ তার খোঁজ নেয় না বা নিচ্ছে না কিংবা খোঁজ নেওয়ার ইচ্ছে আছে কিন্তু সময় হচ্ছে না।
আমি সব সময়ই একটা বলি, কেউ যদি কাউকে সম্মান দিতে হয়, তাহলে তাকে যেন জীবিত অবস্থায় দেওয়া হয়। কারণ, মরে গেলে সম্মান এবং অসম্মান তিনি সকল কিছুর ঊর্ধ্বে চলে যাবেন। তখন দোয়া ছাড়া আর কোনো কিছুর দরকার নেই।
সুতরাং, যারা এক সময়ের জাঁদরেল নেতা ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াকে পছন্দ করতেন, ভালোবাসেন, উপকৃত হয়েছেন তারা তাকে এক নজর দেখে আসুন। তাহলে আপনাকে চিনতে না পারলেও চোখে দেখে তার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অবলোকন করবেন, তার প্রিয় লোকগুলো তাকে ভুলে নাই, ভুলবে না ।
লেখক : সম্পাদক , দৈনিক কুমিল্লার জমিন।