মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে রমরমা ব্যবসা চার এমপির

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের নিয়ন্ত্রণে সাবেক মন্ত্রী, এমপিসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে। সবশেষ তাদের এজেন্সির প্রতারণার শিকার হয়েছেন প্রায় ৩০ হাজার কর্মী। যাদের থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে হাজার কোটি টাকা।

গতকাল শুক্রবার ছিল মালয়েশিয়ার প্রবেশের শেষদিন। অনুমোদন পেয়েও ভোর থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও টিকিট পাননি হাজারো যাত্রী। এজেন্সির গাফিলতি ও প্রতারণায় মালয়েশিয়া যেতে পারেননি ৩০ হাজারের মতো কর্মী।

আবু বক্কর নামের এক ভুক্তভোগী জানান, জীবনের সবটুকু সঞ্চয় ৬ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন ফুয়াং ট্রাভেলস এজেন্সির হাতে। ৩১ মে মালয়েশিয়ায় ছেলে তোফায়েলের যাওয়ার কথা ছিল। তবে ইমিগ্রেশনে প্রবেশ করতেই জানা গেল, এজেন্সির দেওয়া টিকিট ভুয়া। বারবার ফোন করলেও জবাব নেই রিক্রটিং এজেন্সির।

অপরদিকে জমি, মায়ের গয়না বিক্রি করে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখেছিলেন ময়মনসিংহের গৌরিপুরের আনোয়ার। তবে ভুয়া টিকিটের চক্রে তিনিসহ আরো ১৭ জনের স্বপ্ন পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে।

গণমাধ্যমে হাজারো কর্মীর ভোগান্তির কথা ফুটে উঠলেও বায়রা, বিএমইটিসহ সংশ্লিষ্ট সবগুলো সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের নীরব থাকতে দেখা যায়। অথচ মালয়েশিয়া সরকারের কোটা অনুযায়ী ৫ লাখ কর্মীর কাছ থেকে গড়ে ৫ লাখ টাকা করে আদায় করে তারা।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে রমরমা ব্যবসা করছেন বর্তমান ও সাবেক চার এমপি। ফেনী থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী বিদেশে কর্মী পাঠাতে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নেন। তার প্রতিষ্ঠানের নাম স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেড। লাইসেন্স নেয়ার সাড়ে তিন বছরে মাত্র ১০০ কর্মী বিদেশে পাঠায় প্রতিষ্ঠানটি। অবশ্য ‘মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটে’ বা চক্রে যোগ দেওয়ার পর গত দেড় বছরে নিজাম হাজারীর এজেন্সির নামে দেশটিতে ৭ হাজার ৮৬৯ জন কর্মী গেছেন। মালয়েশিয়ায় সবচেয়ে বেশি কর্মী পাঠানো এজেন্সির তালিকায় ৪ নম্বর স্থান পেয়েছে স্নিগ্ধা ওভারসিজ।

আরো দুজন সংসদ সদস্য এবং একজন সংসদ সদস্যের পরিবারের দুজন সদস্যের রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে এই চক্রে। সেগুলো হলো- ফেনী-৩ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল ও ঢাকা-২০ আসনের সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদের প্রতিষ্ঠান আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল। সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য আ হ ম মুস্তফা কামালের স্ত্রী কাশমেরী কামালের অরবিটালস এন্টারপ্রাইজ ও মেয়ে নাফিসা কামালের অরবিটালস ইন্টারন্যাশনাল। ১৯৭৯ সালে মুস্তফা কামাল অরবিটালস এন্টারপ্রাইজ প্রতিষ্ঠা করেন।

আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল মালয়েশিয়া চক্রে ঢুকে শীর্ষ তালিকায় চলে যায়। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় গেছেন ৭ হাজার ৮৪৯ কর্মী। চক্র গঠনের সময় এমপি বেনজীর আহমেদ ছিলেন রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রার সভাপতি।

অপরদিকে অরবিটালস এন্টারপ্রাইজ ও অরবিটালস ইন্টারন্যাশনালের নামে মালয়েশিয়ায় গেছেন মোট ৯ হাজার ৮৬১ জন। চক্র গঠনের সময় আ হ ম মুস্তফা কামাল অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।

পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতা, সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর এবং এ খাতের নতুন অনেক প্রতিষ্ঠান বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠাচ্ছে।

প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের জুলাইয়ে যখন মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলে, তখন কর্মী পাঠানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচনের দায়িত্ব পায় মালয়েশিয়া। তাদের কাছে ১ হাজার ৫২০টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাঠিয়েছিল প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। কিন্তু বেছে নেয়া হয় মাত্র ২৫টিকে। এজেন্সি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নীতিমালা ছিল না। এক্ষেত্রে প্রভাব খাটানো ও ঘুষ লেনদেনের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।