সাংবাদিকতা মহান পেশা ও মন খারাপ করার কথিত গল্প

কথার পেছনে কথা
শাহাজাদা এমরান ।।
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে

শুক্রবার (২৯ মার্চ,২০২৪) সকাল ঠিক সোয়া ১০টায় বাসা থেকে রিকশায় করে অফিসের সামনে মাত্রই নামলাম। এ সময় প্রেস লেখা এক মোটরসাইকেল দিয়ে এক সাংবাদিকও এলো। সালাম দিয়ে পরিচয় দিল। বাংলাদেশ……….. (খালি স্থানে পত্রিকার বাকি নামটি উহ্য রাখলাম) এক উপজেলার সাংবাদিক। আজকের দৈনিক আমাদের কুমিল্লা পত্রিকাটি দরকার। সেটার জন্যই আমার অফিসে আসা।
পরম স্নেহভরে অফিসে আমার রুমে নিয়ে বসালাম। ছেলেটি অত্যন্ত ভদ্র এবং কথাবার্তায় মার্জিত। দেখতেও সুন্দর, মায়াবি চেহারা। বিয়ে করেছে এবং দুটি সন্তানও রয়েছে। পড়াশোনা উচ্চ মাধ্যমিক।
সাংবাদিকতার পরিচয় জানাতে গিয়ে জানাল, সে স্থানীয়ভাবে একটি কোম্পানির ডিলারশিপ নিয়ে ব্যবসা করতো। ব্যবসায় সুবিধা করতে না পেরে অন্য কোনো উপায় না পেয়ে সাংবাদিকতায় ইন করেছে। বিনয়ের সাথে জানতে চাইলাম, তুমি ব্যবসায় ভালো না করে সাংবাদিকতায় এসেছো। তুমি তো আইন পেশায়, চিকিৎসা পেশায়, বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসে যেতে পারতে। কেন গেলে না? লাজুক হাসিতে সে জানাল, ভাই, ওই পেশার জন্য তো সনদ লাগবে, যা আমার নেই। বললাম, তুমি কি ইচ্ছে করলে এখন তোমাদের উপজেলা সদরের বাজারের, বাজার কমিটিতে যেতে পারবে? বলল, না। ওই কমিটিতে যেতে হলেতো দোকান থাকতে হবে।
তার মানে দাঁড়াল, পৃথিবীতে সাংবাদিকতাই একমাত্র পেশা , যেই পেশায় আসতে হলে কোন সনদ লাগে না, অনুমতি লাগে না এবং যোগ্যতাও লাগেনা। যার যখন খুশি টাকা দিয়ে কার্ড আনবে আর সাংবাদিকতা নামের অপসাংবাদিকতা করে আমার রুটি রুজির একমাত্র এই পেশাটিকে কলঙ্কিত করবে।

কীভাবে বাংলাদেশ……….. এই পত্রিকার কার্ড পেয়েছ, জানতে চাইলে জানাল, ভাই, ৫ হাজার টাকা দিয়ে কার্ড এনেছি। এখন অনেক বেশি লাগে। কুমিল্লায় আমাদের পত্রিকার প্রায় ২০-২৫ জনকে কার্ড দিয়েছে। কুমিল্লাসহ আর কোন কোন পত্রিকায় কাজ করেছ জানতে চাইলে সে যে নামগুলো বলল, ওইগুলোর নাম লিখে পাঠকের হাসির খোরাক হতে চাই না। বললাম, ভালো একটি পত্রিকায় চেষ্টা করো। উত্তরে জানাল, দেশের এক বিশাল শিল্পগোষ্ঠীর নামিদামি একটি পত্রিকার সাথে কথা হয়েছে। উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে ৫০ হাজার টাকা চেয়েছে , এক দাম। বলল, বড় ভাই, এই মুহূর্তে এত টাকা কই পাই ? তার এলাকায় কয়েকটি টিভির সাংবাদিকের নাম বলল, যারা অফিস থেকে শুধু বুম এনেছে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে। কেউ কেউ আছে ৫০ হাজার এবং ১ লাখ টাকাও দিয়েছে। কিন্তু তারা নাকি ঠিকমতো কথাও বলতে পারে না শুদ্ধ করে।
মাঝে মাঝে অফিসকে টাকা পাঠাতে হয়। নইলে কার্ড না থাকার ঝুঁকির কথাও জানাল। কীভাবে উপজেলাগুলোতে সাংবাদিকতা করছে, আয় করছে, মানুষকে ব্ল্যাকমেইলিং করছে তার সহকর্মীরা , সে আমাকে খ্বু কম কথায় বুঝিয়ে দিল।

বললাম, ভাইরে অন্য পেশায় যাওয়া যায় না? কেন ৫০ হাজার টাকা দিয়ে কার্ড নিবে? সর্বশেষ, সে বলল, বড় ভাই, ভাবছি এবার বিদেশ চলে যাব। আমি তার ভাবনাকে সাধুবাদ জানালাম।

বুক ভরা কষ্ট নিয়ে তাকে বললাম, ব্যবসায় খারাপ করাতে সাংবাদিকতা পেশাটা বেছে নিয়েছ। যার কোনো সনদ লাগে না, পড়াশোনা করতে হয় না। মাথা নাড়ল ম্লান হাসি দিয়ে। আমার একমাত্র রুটি রুজির পেশাটার কথা ভেবে মনটা বেদনায় ভরে গেলো। হায়রে আমার সাংবাদিকতা পেশা। এখানে যে যখন ইচ্ছে করে চলে আসে। কোনে নিয়মনীতির তোয়াক্কা নেই। উঠানে উচ্ছিষ্ট ছিটালে বিভিন্ন পশুপাখি চলে আসে, ঠিক টাকা দিলেই সাংবাদিকতার কার্ড চলে আসে।

এই সাংবাদিক চলে যাওয়ার পরে চেয়ারে হেলান দিয়ে ভাবলাম, যে চিত্রনাট্য সে আমার সামনে প্রদর্শন করল, এটা কি শুধু তার উপজেলায় ? না-কি একই চিত্রনাট্য আরো ভয়াবহভাবে রয়েছে আমার জেলা সদর কুমিল্লা ও কুমিল্লার সবগুলো উপজেলা এমনকি গোটা বাংলাদেশেই?

মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীদের চেয়ে এদের সংখ্যা অনেক বেশি এবং তারা সমাজের একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কীভাবে এদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কে করবে এদের নিয়ন্ত্রণ তা ভেবে পাচ্ছি না।

ব্যক্তিগতভাবে যদি আমার কথা বলি, মাসের এমন সপ্তাহ আমার জীবনে খুব কম আসে, যেই সপ্তাহে জেলা সদরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে পরিচিত কিংবা অপরিচিতজনরা ফোন দিয়ে অভিযোগ করেন না। তাদের একটাই অভিযোগ, ভাই, অমুক পত্রিকা, তমুক টিভি, সমুক অনলাইন এগুলো আছে? এই নামের সাংবাদিকদের চিনেননি? এরাতো কয়েকজন এসেছে, বুম নিয়ে। আমার কাছে টাকা চায়। তারা অভিযোগের কোন সত্যতা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বলেছে, আচ্ছা আপনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ নিয়ে এসেছি সেটি সত্য নয়, মানলাম। কিন্তু আমরা যে খরচ করে এসেছি, খরচের টাকাটা দিয়ে দেন!

আজকাল এক শ্রেণির সাংবাদিকদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ব্রিক ফিল্ড, ড্রেজার, সীমান্ত, থানা, ফাঁড়ি, কারো জমিজমা নিয়ে সমস্যা হলে সেখানে যাওয়াসহ নানা ফন্দি ফিকির খুঁজে বের করা।
আমার অনুজপ্রতীম এক সহকর্মী একদিন আমাকে জানাল, ভাই, যারা নগরীতে বড় বড় কথা বলে, ফেসবুকে সুন্দর সুন্দর স্ট্যাটাস দেয়, খোঁজ নিয়ে দেখেন, এই এই অফিসে…পরিষ্কার বাংলায় তাদের নাম লেখা আছে মাসিক মাসোয়ারা নেওয়ার তালিকায়। অনেক সিনিয়র সাংবাদিক আছে, লোকাল বাসে উঠে ভাড়া চাইলে সাংবাদিক বলে কন্ট্রাকটারকে ধমক দেয়। নগরীর কোন এক বাসা বাড়ির এক কাজের মেয়েকে ধমক দেওয়ার ঘটনার অভিযোগ পেয়ে ১০ হাজার টাকা না দেওয়া পর্যন্ত তার হম্বিতম্বি থামেনি। অথচ, এদেরই কেউ কেউ আবার মূলধারার সাংবাদিকও। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সবার সামনে বসে। উত্তেজিত মনোভাব নিয়ে বিদ্রোহী কথাবার্তা বলে।

সবশেষে, অনুজপ্রতীম ওই সহকর্মীর শেষ বক্তব্য, ভাই, সব মাছই বাথরুমের ময়লা খায়, শুধু নাম পড়ে উগোল মাছের। আপনারা হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া কে কোন অফিস থেকে টাকা আনে, আমরা সব জানি। কিন্তু বললে মাইর খাইতে হবে। কারণ, কুমিল্লার সমাজ আবার তাদেরকে প্রকৃত সাংবাদিক হিসেবেও জানে এবং তাদের মূল ধারার গণমাধ্যমও রয়েছে। এমনকি তারা আবার জুনিয়রদের ধমকায় ভালো সাংবাদিকতা করার জন্য।

আরেকটি বিষয় বলি, শিক্ষক,আইনজীবী কিংবা চিকিৎসকদের মধ্যে যারা জুনিয়র , তারা সিনিয়রদেরর স্যার বলে, দেখলে ঘোর শত্রু হলেও দাঁড়িয়ে সম্মান করে। আর আমার সাংবাদিকতা পেশায় স্যার বলার রেওয়াজ নেই। ভাই বলতেও জুনিয়রদের দ্বিধা কাজ করে। কোনো অনুষ্ঠানে চেয়ার ছাড়বে তো দূরের কথা সিনিয়রকে দেখিয়ে পা নাড়তেও ভুল করে না তারা। নিজেকে বড় নেতা মনে করে। আন্ডার এইট পাশ এক সাংবাদিক নেতা(!), মাস্টার্স পাশ এক সাংবাদিককে ক্রিয়াশীল সাংবাদিকতা ও প্রতিক্রিয়াশীল সাংবাদিকতার জ্ঞান দেওয়ার অপচেষ্টা করার দু:সাহস দেখাতেও তার কথিত হৃদয় কেঁপে উঠে না।

বাইরের কথা কি বলব, আমার প্রিয় কুমিল্লা নগরীতেই এমন অনেক সাংবাদিক রয়েছে, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কারো আন্ডার মেট্রিক, কারো আন্ডার এইট আবার কারো আন্ডার ফাইভ। কেউ রাজনৈতিক যোগ্যতায় ,কেউ মামু কিংবা ভাই কিংবা দুলাভাইয়ের যোগ্যতায় ,কেউবা কালো টাকার প্রভাবে সাংবাদিক বনে গেছেন এবং কার্ড পেয়েছেন। আবার শতকরা মাত্র একজন কিংবা দুইজন রয়েছে, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকলেও পরিশ্রম করে এ পেশায় টিকে আছে।

লেখাটি শেষ করতে চাই, বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠকদের নিয়ে দুটি কথা বলে। ঢাকায় বসে কিছু কিছু ব্যক্তি আছেন, যারা জীবনে ভালো কোনো গণমাধ্যমে কাজও করেননি, ভালো সাংবাদিকতাতো পরের কথা। তারা ঢাকায় বসে সাংবাদিক সংগঠন করেন। জেলা উপজেলাগুলোতে শাখা বিস্তার করেন, জাতীয়ভাবে সাংবাদিক নেতা সাজার জন্য। কিন্তু তারা একবারের জন্যও চিন্তা করেন না, আমি যে জেলা কিংবা উপজেলার কমিটি দিলাম , এই কমিটিতে প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিক রয়েছে কি না। আচ্ছা মানলাম, তারা ঢাকা থেকে কে সাংবাদিক আর কে সাংবাদিক না, তা চিনার কথা না। কিন্তু এটা তো তাদের জানার কথা ওই সাংবাদিক যে গণমাধ্যমের কথা বলেছে , সেটা নিয়মিত বের হয় কি না ? ওই গণমাধ্যম আন্ডারওয়ার্ল্ডের গণমাধ্যম না কি প্রকৃত গণমাধ্যম। এটা কি তারা জানে না।
আমি মনে করি, ওদের মতো কথিত জাতীয় সাংবাদিক নেতাদের কারণেই জেলা কিংবা উপজেলায় কথিত সাংবাদিক সংগঠন বাড়ছে এবং সৃষ্টি হচ্ছে তথা কথিত সাংবাদিক নেতাও। তারা এক বছরে দুই একটা নিউজ না লিখলেও মাসে মাসে অনুষ্ঠান করতে মোটেই দ্বিধা করে না।
সত্যি কথা বলতে কি লেখাটি শুরু করেছিলাম ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ার জন্য। কিন্তু লিখতে লিখতে হয়ে গেল একটি নিবন্ধ। যাদের উদ্দেশ্যে লেখা তারা যদি কিছুটাও লেখাটি পড়ে আমলে না নিক, আমলে নেওয়ার কথাও ভাবেন তাহলেও নিজের পরিশ্রমকে সার্থক মনে করব।

লেখক : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের কুমিল্লা ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, কুমিল্লা জেলা।০১৭১১-৩৮৮৩০৮।