সাত কারণে বাড়ছে তেলের দাম

অবৈধ মজুত রোধে চলছে অভিযান ও জরিমানা আদায়
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধিসহ সাত কারণে বেড়েছে ভোজ্যতেলের দাম। তাই গত ৫ মে আবারও তেলের দাম সমন্বয় করে নতুন দর নির্ধারণ করা হয়েছে। আর দাম বাড়বে এমন তথ্য পেয়ে অতি মুনাফা করতে খুচরা ও পাইকারি ডিলাররা তেলের অবৈধ মজুত করেছেন। লুকিয়ে রেখে তৈরি করেছেন কৃত্রিম সংকট। যে কারণে গত কয়েক দিন তেলশূন্য হয়ে পড়ে বাজার। পণ্যটি না পেয়ে ক্রেতাদের ফিরতে হয় খালি হাতে। আর যেখানে পাওয়া গেছে গুনতে হয়েছে বাড়তি টাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এদিকে গতকাল ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সয়াবিন তেল জব্দ ও জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশ অনুযায়ী গত পাঁচ মে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ভোজ্যতেলের দাম নতুন করে নির্ধারণ করে। সেই নির্ধারণ পদ্ধতি অনুযায়ী প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন এক হাজার ৭৯০ ডলার ও প্রতি টন পাম তেল এক হাজার ৭৫০ ডলার ভিত্তি মূল্য ধরে দেশের খুচরা বাজারে প্রতিলিটার খোলা সয়াবিন ১৮০ টাকা, বোতল সয়াবিন ১৯৮ টাকা ও পাঁচ লিটারের বোতল সয়াবিন ৯৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি প্রতিলিটার খোলা পাম অয়েল ১৭২ টাকা দরে নির্ধারণ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজারে ভোজ্যতেল সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য রেপসিড অয়েল/ক্যানোলা ও সানফ্লাওয়ার অয়েলের শুল্ক কমানোর জন্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শুল্ক কমানো হলে বাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের বিকল্প হিসাবে বাজারে সরবরাহ বাড়বে।

সূত্র জানায়, দেশে এখন পর্যাপ্ত তেলের সরবরাহ আছে। মিল থেকেও সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু দাম বৃদ্ধির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে খুচরা বিক্রেতা ও পাইকারি ডিলাররা বেশি মুনাফার লোভে তেল মজুত করেছেন। যে কারণে ঈদের আগ থেকে খুচরা বাজারে তেলের সংকট দেখা দেয়। ঈদের পর তা তীব্র আকার ধারণ করে। পরিস্থিতি এমন হয়, বাজারে তেল নেই। ক্রেতারা পণ্যটি কিনতে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। আর কিছু দোকানে পাওয়া গেলেও উচ্চ মূল্য দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

এমন পরিস্থিতিতে মাঠে নামে বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদ্যস্যরাও কঠোর ভূমিকা পালন করছে। তদারকিতে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলের খুচরা ও পাইকারি ডিলারের অবৈধভাবে মজুত করা তেল বের হতে শুরু করে। করা হয় জরিমানা। এমন পরিস্থিতিতে ভোক্তা পর্যায়ে তেল দৃশ্যমান হতে শুরু করে। পাশাপাশি মিল পর্যায়ে থেকে নতুন দামের তেল বাজারে ছাড়া হলে সরবরাহ আরও বাড়ে। তবে সরবরাহ বাড়লেও বাজারে সোমবার পর্যন্ত সীমিত পরিসরে তেল পাওয়া যাচ্ছে।

এ দিন অবৈধ মজুত করা তেল উদ্ধারে যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও র‌্যাব-৩। ভোক্তা অধিদপ্তরের পক্ষে অভিযান পরিচালনা করেন ঢাকা জেলা কার্যালয়ের অফিস প্রধান মো. আব্দুল জব্বার মন্ডল এবং ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মাগফুর রহমান। অভিযান পরিচালনাকালে রাজধানীর ডেমরা রোডের কাজলা ব্রিজ এলাকার মেসার্স অদ্বিতি ট্রেডিং, মেসার্স সিফাত ট্রেডিং এবং মেসার্স মিন্টু স্টোর থেকে পুরোনো রেটের সর্বমোট ২৯ হাজার ৫৮০ লিটার খোলা পাম ও সয়াবিন তেল উদ্ধার করা হয়। ক্রয়-বিক্রয়ে পাকা রসিদ সংরক্ষণ না করা, নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে (পুরোনো রেটের সয়াবিন ১৪৩ টাকার পরিবর্তে ১৮৩ থেকে ১৮৪ টাকা) খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি করা ইত্যাদি অপরাধে ৫০ হাজার টাকা করে ৩ প্রতিষ্ঠানকে সর্বমোট ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় উদ্ধারকৃত তেল সরকারি রেটে বিক্রির নির্দেশ প্রদান করা হয়।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামে দোকানে মিলছে না বোতলজাত ভোজ্যতেল। দোকান থেকে তেল উধাও হয়ে গেলেও আন্ডারগ্রাউন্ডে ও গুদামে মিলছে হাজার হাজার লিটার ভোজ্যতেল। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে আরও বেশি দামে বিক্রির আশায় অসাধু বিক্রেতারা তেল মজুত করে রেখেছে। এমন চিত্র মিলেছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে গত কয়েক দিনে প্রশাসনের অভিযানে। সোমবার চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী বাজার থেকে অবৈধভাবে মজুত করে রাখা ১৫ হাজার লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল উদ্ধার করেছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের কর্মকর্তারা। এদিন দুপুরে বাজারের বিল্লি লেইনে সিরাজ সওদাগরের দোকান ও তিনটি গুদামে অভিযান চালিয়ে এসব সয়াবিন তেল উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভোক্তা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজউল্লাহ। অবৈধভাবে তেল মজুত করার দায়ে ওই ব্যবসায়ীকে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ নিয়ে গত দুদিনে চট্টগ্রামে অবৈধভাবে মজুত করা প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার লিটার সয়াবিন তেল উদ্ধার করা হয়েছে। যেগুলো বাজারে বিক্রি না করে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সোমবার নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জের পাইকারি মোকামে অভিযান পরিচালনা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ সময় ভোজ্যতেলের পাইকারি মোকাম মুন ট্রেডার্সসহ একাধিক গুদামে অভিযান পরিচালনা করা হয়। নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. সেলিমুজ্জামানের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় সেলিমুজ্জামান জানান, যদি কেউ আগের দরে তেল কিনে আগের দরে বিক্রি না করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমান বাজারে কোনো তেলের সংকট নেই।

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহীর বাগমারার তাহেরপুর বাজারের একটি গুদাম থেকে ২০ হাজার ৪০০ লিটার ভোজ্যতেল জব্দ করেছে পুলিশ। রাজশাহী জেলা পুলিশের একটি দল সোমবার রাত ৮টার দিকে তাহেরপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাজারপাড়া গোডাউন মোড়ে এ অভিযান চালায়।

অভিযানে গুদামের মালিক শহিদুল ইসলাম স্বপনকে আটক করা হয়েছে। তার বাড়ি বাগমারার গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের চৌখালী গ্রামে।

তেল উদ্ধারের এ অভিযানে রাজশাহী জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম ও বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাক আহমেদ অংশ নেন। জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম জানান, গুদামে ১০০ ব্যারেল তেল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কিছু সরিষার তেল আছে। বাকিগুলো সয়াবিন তেল। অসৎ উদ্দেশ্যে তেল মজুত করে রাখায় গুদামের মালিক শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে বাগমারা থানায় একটি মামলা করা হবে বলেও জানান পুলিশ কর্মকর্তা ইফতেখায়ের আলম।