অপ্রতিম হত্যা: সামনে এলো ৫ হাজার টাকার বিরোধ

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১৪ ঘন্টা আগে

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়ে বিরোধের তথ্যও উঠে এসেছে। টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে অপ্রতিমের সঙ্গে এক কিশোরের বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এই বিরোধ হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

পুলিশের ভাষ্য, অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। এ ঘটনায় অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের করা মামলায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শনিবার সকাল ৯টার দিকে তুহিনকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। তখন অপ্রতিমের মৃত্যুর বিষয়টি তদন্তকারীদের জানা ছিল না। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অপ্রতিমের লাশ উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়। শুরুতে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করলেও দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর শনিবার রাত ৮টার দিকে তুহিন নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তবে অন্যদের নাম বলতে তিনি অনীহা দেখান।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় তুহিনের মোবাইলে একাধিকবার কল আসে। কলগুলো করছিল অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা এক কিশোর। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে তাকেও হেফাজতে নেয় পুলিশ। আটকের সময় তার গায়ে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট ছিল বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। পরে তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরেক কিশোরকেও হেফাজতে নেওয়া হয়।

পুলিশ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, গ্রেফতার হওয়া কিশোরদের একজন অপ্রতিমের বাবার মোবাইল সরঞ্জাম বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে গত ২ সেপ্টেম্বর ডেলিভারিম্যান হিসেবে যোগ দেয়। মাসিক ১৪ হাজার টাকা বেতনে তাকে নিয়োগ দেওয়া হলেও তার সঙ্গে তখনো লিখিত চুক্তি হয়নি। অপর এক কিশোরও প্রতিষ্ঠানটিতে বিনা বেতনে কাজ করত বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা।

তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, অপ্রতিম ওই কিশোরদের একজনকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল। সম্প্রতি টাকা ফেরত চাইলে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, টাকা ফেরত দেওয়ার চাপ থেকে ওই কিশোরের মধ্যে অপ্রতিমের প্রতি বিরক্তি তৈরি হয়। এমনকি অপ্রতিম বেঁচে না থাকলে টাকা ফেরত দিতে হবে না—এমন চিন্তাও তার মধ্যে তৈরি হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তবে পাঁচ হাজার টাকার এই বিরোধ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ ছিল কিনা, তা এখনো তদন্তাধীন।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা গেছে, শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন বনে অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে অপ্রতিম বাধা দিলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে তুহিন বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন। পরে ফাহাদ ও মো. কামরুল হাসান (১৬) তাকে আঘাত করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তুহিন তার ব্যবহৃত আইফোন নিয়ে অন্যদের সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে চলে যান বলে পুলিশের ভাষ্য।

অপ্রতিমের বাবা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পরও ছেলে বাসায় না ফেরায় ফাহাদকে ফোন করে ডেকে আনা হয়। অপ্রতিম কোথায় গেছে, সে বিষয়ে খোঁজ নিতে বলা হয়। পরে পরিবারের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা এক যুবককে দেখে ফাহাদ তাকে তুহিন হিসেবে শনাক্ত করেন। এরপর ফাহাদকে দিয়ে তুহিনকে ফোন করানো হলে তিনি অপ্রতিম তার কাছে আসেনি বলে জানান। তখন রাত প্রায় ১০টা।

শনিবার দুপুরে অপ্রতিমের লাশ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে ঘটনাস্থলে যেতে ফাহাদকে বলা হলে তিনি শরীর খারাপের কথা বলে সেখান থেকে চলে যান বলেও জানান অপ্রতিমের বাবা।

এদিকে অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কয়েকজন কিশোর গ্যাং সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন ড. কামরুন নাহাত শীলা। এর সঙ্গে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিনা, সেটিও তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন নাহিদা বেগম।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতির আয়োজিত মানববন্ধনে বিষয়টি তুলে ধরেন ড. কামরুন নাহাত শীলা। তিনি বলেন, নাহিদা বেগম চান পুলিশ তদন্ত করে দেখুক, আগের কোনো ঘটনার প্রতিশোধের জের ধরে অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে কিনা।

নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার বেলা ১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর তার আর সন্ধান পাওয়া যায়নি।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা, পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধ কিংবা আগের কোনো ঘটনার জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কিনা—সবগুলো বিষয়ই খতিয়ে দেখছে পুলিশ।