প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করছে জামালপুরের জনজীবন। স্বস্তির জন্য ঘরে ফ্যান থাকলেও মিলছে না নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। দিনে কিংবা রাতে কোনো সময়ই ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই ঘণ্টা নেই এমন অভিযোগ এখন জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের।
বিদ্যুতের এই সংকটের মধ্যেই প্রতিদিন হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের ব্যাটারি চার্জে খরচ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ। সংশ্লিষ্টদের তথ্য বলছে, জামালপুরে শুধু অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জেই প্রতিদিন ১২-১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ একটি উপজেলার দৈনিক চাহিদার কাছাকাছি।
বিদ্যুতের চাহিদা যখন সবচেয়ে বেশি, ঠিক তখনই সন্ধ্যার পর জেলার বিভিন্ন গ্যারেজে সারি সারি অটোরিকশা চার্জে বসানো হয়। শত শত যান একসঙ্গে চার্জ দেওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। আর সেই চাপের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় জেলার সাতটি উপজেলা ছাড়াও শেরপুরের কিছু অংশ, কুড়িগ্রামের রাজীবপুর ও রৌমারী এবং সিরাজগঞ্জের কয়েকটি এলাকা রয়েছে। এই বিশাল অঞ্চলে মোট গ্রাহক সংখ্যা সাত লাখ ৭৫ হাজার। এসব এলাকায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ১৫০-১৬০ মেগাওয়াট। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে প্রয়োজনের তুলনায় গড়ে ৫৫-৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদা ও সরবরাহের এই বড় ব্যবধানের কারণে প্রতিদিন ৯০-৯৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
‘একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সাধারণত ১৫ অ্যাম্পিয়ারের চার থেকে পাঁচটি ব্যাটারিতে চলে। এসব ব্যাটারি চার্জ দিতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় এক থেকে দেড় ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। একটি অটোরিকশার ব্যাটারি পূর্ণ চার্জ করতে ছয় থেকে আট ইউনিট বা তারও বেশি বিদ্যুৎ লাগে। সে হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে ৭০-৯০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। মেগাওয়াটের হিসাবে যার পরিমাণ ১২ থেকে ১৫ মেগাওয়াট’
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অধীনে জামালপুর শহর, সরিষাবাড়ী, ইসলামপুর ও মেলান্দহ উপজেলার প্রায় ৭৮ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। এসব এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ৩০-৩২ মেগাওয়াট।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেই শহর ও আশপাশের এলাকায় চলাচল করা প্রায় ১২ হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক প্রতিদিন চার্জ দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও গ্যারেজ মালিকদের তথ্যমতে, একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সাধারণত ১৫ অ্যাম্পিয়ারের চার থেকে পাঁচটি ব্যাটারিতে চলে। এসব ব্যাটারি চার্জ দিতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় এক থেকে দেড় ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। একটি অটোরিকশার ব্যাটারি পূর্ণ চার্জ করতে ছয় থেকে আট ইউনিট বা তারও বেশি বিদ্যুৎ লাগে। সে হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে ৭০-৯০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। মেগাওয়াটের হিসাবে যার পরিমাণ ১২ থেকে ১৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, বিদ্যুতের তীব্র সংকটের মধ্যেও প্রতিদিন একটি উপজেলার চাহিদার কাছাকাছি বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে শুধু অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে।
দিনের অন্যান্য সময়ের তুলনায় সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। বাসাবাড়িতে ফ্যান, লাইট ও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ে। দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও তখন বিদ্যুতের ব্যবহার থাকে বেশি। ঠিক এইসময় থেকেই বিভিন্ন অটোরিকশা গ্যারেজে সারি সারি যান চার্জে বসানো হয়।
‘সারাদিন যা আয় হয়, তার বড় অংশই চার্জিংয়ে চলে যায়। প্রতিটি গাড়ি চার্জ দিতে গ্যারেজে ১০০-১২০ টাকা দিতে হয়। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই এভাবে চার্জ দিচ্ছি। সরকার যদি নির্ধারিত সময়ে বা আলাদা স্টেশনে চার্জিংয়ের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা সেই নিয়ম মেনে চলতে রাজি আছি’
সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একসঙ্গে শত শত অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। বেশিরভাগ অটোরিকশা গ্যারেজে চার্জ দেওয়া হলেও অনেক যান বাসাবাড়িতেও চার্জ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি অটোরিকশা চার্জ দিতে চালকদের গ্যারেজভেদে প্রতিদিন ১০০-১২০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
তবে অটোরিকশাচালকদের দাবি, জীবিকার তাগিদেই তারা এসব যান চালাচ্ছেন। সারাদিন গাড়ি চালিয়ে যে আয় হয়, তার একটি বড় অংশই ব্যাটারি চার্জের পেছনে ব্যয় হয়।
বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই গ্যারেজ ও বাসাবাড়িতে ব্যাটারি চার্জ দিতে হচ্ছে তাদের। সরকার নির্ধারিত সময়ে বা আলাদা চার্জিং স্টেশনের ব্যবস্থা করলে সেই নিয়ম মেনে চলতে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন চালকরা।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন জামালপুরের শহর ও গ্রামীণ এলাকার মানুষের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন মাধ্যম। একই সঙ্গে হাজারও মানুষের জীবিকারও উৎস। তবে নিয়ন্ত্রণহীন চার্জিং ব্যবস্থা বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসব যানকে নিবন্ধনের আওতায় আনা, অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন তৈরি এবং বিদ্যুতের পিক আওয়ারে চার্জিং সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জামালপুর শহরের পাথালিয়া এলাকার বাসিন্দা আকরাম হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘গরমে বাচ্চারা ঘুমাতে পারে না। যদি দেখা যায় এক ঘণ্টা কারেন্ট থাকে, তাহলে দুই ঘণ্টা থাকে না। অথচ বিদ্যুৎ যতটুকু সময় থাকে, ওই সময়েই গ্যারেজে সারি সারি অটোরিকশা চার্জ হচ্ছে।’
স্থানীয় শাহরিয়ার উল্লাস বলেন, ‘হিসাব ছাড়াই দিনরাত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকটের এই সময়ে, বিশেষ করে সন্ধ্যার পিক আওয়ারে চার্জিং নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে লোডশেডিং কমানো কঠিন হবে।’
আব্দুল কাদের ও সোহেল মিয়া পেশায় দুজনই অটোরিকশাচালক। তাদের ভাষ্য, ‘সারাদিন যা আয় হয়, তার বড় অংশই চার্জিংয়ে চলে যায়। প্রতিটি গাড়ি চার্জ দিতে গ্যারেজে ১০০-১২০ টাকা দিতে হয়। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই এভাবে চার্জ দিচ্ছি। সরকার যদি নির্ধারিত সময়ে বা আলাদা স্টেশনে চার্জিংয়ের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা সেই নিয়ম মেনে চলতে রাজি আছি।’
এ বিষয়ে জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. সাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যুতের চাহিদার একটি বড় অংশই ইজিবাইক চার্জে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ শুধু ইজিবাইকের ব্যাটারি চার্জ দিতেই খরচ হচ্ছে, যা প্রায় একটি উপজেলার বিদ্যুতের চাহিদার সমান। বিষয়টি নিয়ে সরকারও ভাবছে। এর ভালো কোনো সমাধানের চেষ্টা চলছে।’