ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং মূল মাস্টারমাইন্ডদের আড়াল করার অভিযোগ তুলে আদালতে অধিকতর তদন্তের আবেদন (নারাজি দরখাস্ত) দাখিল করা হয়েছে। আবেদনে মামলার বর্তমান তদন্তকে ‘ভাসা ভাসা’ ও ‘দায়সারা’ বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে দেশি-বিদেশি গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন নিহতের পরিবার ও সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) এ হত্যা মামলায় দাখিল করা চার্জশিট গ্রহণের বিষয়ে বাদীপক্ষ নারাজি দেওয়ায় এ বিষয়ে আদেশ অপেক্ষমাণ রেখেছেন আদালত। এদিন মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী মুস্তাফিজুর রহমান মুকুল অধিকতর তদন্তের আবেদন (নারাজি দরখাস্ত) নিয়ে আদালতে শুনানি করেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশীতা ইসলামের আদালতে মামলার চার্জশিট পর্যালোচনার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষ চার্জশিট গ্রহণের পক্ষে মত দিলেও মামলার বাদী ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে নারাজি আবেদন করেন।
বাদীপক্ষের নারাজি আবেদন বিবেচনায় নিয়ে আদালত চার্জশিট গ্রহণের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আদেশ না দিয়ে সিদ্ধান্ত অপেক্ষমাণ রাখেন।
এর আগে চার্জশিট গভীরভাবে পর্যালোচনার জন্য রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা দুইদিনের সময় চাইলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। সেই অনুযায়ী আজ চার্জশিট সংক্রান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
আদালতে দাখিল করা আবেদনে বলা হয়, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে যখন সারাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছিল, তখন রাজধানীর পল্টন বিজয় নগর বক্স-কালভার্ট রোডে এ নৃশংস ঘটনা ঘটে। জনাকীর্ণ এ এলাকায় মোটরসাইকেলে এসে চলন্ত অবস্থায় রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও সেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ নামে এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে, যে বেশ কিছুদিন ধরেই নির্বাচনী প্রচারণার আড়ালে হাদির সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে ছিল।
তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ
আদালতে দেওয়া আবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা মাত্র ২২ দিনের মধ্যে একটি দায়সারা অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। এতে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মোটিভ এবং মূল পরিকল্পনাকারীদের বাদ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ করা হয়েছে যে হত্যাকারী দলকে পালিয়ে যেতে সাহায্যকারী পৃথক টিমের সঙ্গে মূল ঘাতকদের সম্পর্কের বিষয়টি তদন্তে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। শহীদ হাদি জীবদ্দশায় উচ্চ মহলের যে হুমকির কথা বলেছিলেন, সেগুলোর কোনো তদন্ত করা হয়নি।
বাদীপক্ষের আবেদনে বলা হয়, জনাকীর্ণ স্থানে দিবালোকে এমন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কোনো একক ব্যক্তি বা নিম্নস্তরের কর্মীর পক্ষে সংঘটন করা সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী মুস্তাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ওসমান হাদি ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ ও একটি কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন এক আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। তার এ উদ্যোগে আতঙ্কিত হয়ে পতিত রাজনৈতিক শক্তি ও তাদের দেশি-বিদেশি পৃষ্ঠপোষকরা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তি সৃষ্টিই ছিল এ ষড়যন্ত্রের অন্যতম উদ্দেশ্য।
অধিকতর তদন্তের দাবি
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে মামলার অধিকতর তদন্ত এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। আবেদনে বলা হয়, শহীদ ওসমান হাদি ছিলেন বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ, তার জীবন উৎসর্গের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এ হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য।
বর্তমানে আদালত বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করেছে এবং মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য পল্টন থানার মামলা নম্বর-১৯(১২)২০২৫-এর অধীনে অধিকতর তদন্তের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।