কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্মরণ কালের সর্ববৃহৎ দূর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। আর এই দূর্নীতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্বয়ং হাসপাতালের পরিচালক। আর অভিযোগের তীরে বেকায়দায় ড্যাব কুমিল্লার সংশ্লিষ্ট তিনটি কমিটি। এদিকে, দূনীতির অভিযোগ উঠায় ড্যাব কুমিল্লা জেলা, মহানগর ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ কমিটি বাতিল করেছে কেন্দ্রীয় ড্যাব। সোমবার কেন্দ্রীয় ড্যাবের সভাপতি জানিয়েছেন, কেন্দ্র থেকে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পেলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা যায়, বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিদিন হাজারো রোগী চিকিৎসার আশায় এখানে আসেন। অথচ এই প্রতিষ্ঠানটিই বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে আলোচনায়। ওষুধ ক্রয়ে অতিরিক্ত দামের বিল দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা লোপাট এবং টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ এখন প্রকাশ্যে এসেছে।
সর্বশেষ অনুসন্ধানে জানা গেছে, জীবনরক্ষাকারী ইনজেকশন থায়োপেনটাল সোডিয়াম যার বাজারমূল্য মাত্র ১০১ টাকা প্রতি ভায়েল, সরকারি নথিতে সেটির দাম দেখানো হয়েছে ১ হাজার ২৯৯ টাকা। কেবল এই একটি ওষুধের মাধ্যমেই প্রায় ৪৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত চাহিদাপত্রে কুমেক হাসপাতালের পরিচালক ডা. মাসুদ পারভেজ সোহাগের স্বাক্ষর পাওয়া গেছে।
ওষুধ কেনার অনিয়ম এখানেই থেমে নেই। নথি অনুসারে হাসপাতালটি এরোভাসটাটিন ২০ মি.গ্রা. ট্যাবলেট ক্রয় করেছে প্রায় ৯ লাখ পিস। অথচ হাসপাতালের প্রয়োজন ছিল ১০ মি.গ্রা. ট্যাবলেট। চিকিৎসক সূত্রে জানা যায়, এই পরিমাণ ওষুধ খরচ করতে হাসপাতালের লেগে যাবে অন্তত ২০ বছর। অর্থাৎ প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধ সংগ্রহ করে অনিয়মের পথেই বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এছাড়া টেন্ডার প্রক্রিয়াতেও বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, হাসপাতালের পরিচালককে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী টেন্ডার সিন্ডিকেট। এতে জড়িত আছেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর একাধিক নেতা। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে অভিযোগগুলো এখন প্রকাশ্যে এসেছে।
সম্প্রতি কুমিল্লা মেডিকেলের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অভিযুক্ত ড্যাব নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। কুমিল্লা মহানগর ড্যাবের সাধারণ সম্পাদক ডা. আরিফ হায়দার অভিযোগ করে বলেন, আমাকে ব্যবহার করে সভাপতি প্রায় ৮০ লাখ টাকা কামিয়েছেন। আমি এক টাকাও নেইনি। কিন্তু এখন দায়ভার চাপানো হচ্ছে আমার ওপর। এই সবকিছুর মূল হোতা হলেন মেডিকেলের পরিচালক, যিনি আগেই নিজের ভাগ নিয়ে নিয়েছেন।
তবে ড্যাব কুমিল্লা জেলার সভাপতি এম এম হাসান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। আমি চাই কেন্দ্রীয় ড্যাব থেকে তদন্ত হোক এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হোক।
অন্যদিকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ড্যাবের সভাপতি ডা. মিনহাজুর রহমান তারেক বলেন, ড্যাবের নামে কেউ যদি অনিয়ম করে থাকে তবে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ফান্ড রাইজের নামে টাকা তোলা হলে কেন্দ্রীয় ড্যাবকে জানানো জরুরি।
তবে, অভিযুক্ত হাসপাতালের পরিচালক ডা. মাসুদ পারভেজ সোহাগ অভিযোগ নাকচ করে বলেন, এসব মিথ্যা। কেউ ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে বলেছে। আমি কোনো টাকা নিইনি। অধিক মূল্যে ইনজেকশন কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এটিকে “প্রিন্টিং মিস্টেক” বলে দায় এড়িয়ে যান।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবার মতো স্পর্শকাতর খাতে দুর্নীতি শুধু অর্থ অপচয়ের বিষয় নয়, এটি সরাসরি রোগীর জীবনের ওপর হুমকি সৃষ্টি করে। যখন জীবনরক্ষাকারী ইনজেকশন ওষুধের ক্ষেত্রেও কোটি কোটি টাকা লুটপাট হয়, তখন সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা ভেঙে পড়া স্বাভাবিক।