আলহামদুলিল্লাহ। শোকর আলহামদুলিল্লাহ। মহান রবের কাছে গভীর কৃতজ্ঞতা যে, কুমিল্লার মতো একটি মফস্বল শহর থেকে ন্যূনতম প্রযুক্তি ছাড়াই স্বল্প মূল্যের একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন দিয়ে দেখতে দেখতে আজ আমাদের কুমিল্লা-কুমিল্লার জমিন এর টকশো দুইশতম পর্ব সম্পন্ন হবে। একই সাথে টকশো উপস্থাপক হিসেবেও আজ ডাবল সেঞ্চুরি সম্পন্ন হবে আমার।
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর কাতার বিশ্বকাপ-২০২২, রোড টু ফাইনাল শীর্ষক শিরোনামে এক বুক প্রত্যাশা ও আশাজাগানিয়া স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছিলাম এই টকশো। যে স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছিলাম নানা রকম সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির সামঞ্জস্য কিছুটা গড়মিল থাকলেও আমি মোটেই হতাশ নই। বরং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে একেবারেই সাদামাটা ধরণের জৌলুশহীন পরিবেশে সম্মানিত দর্শকগণ যে, এইভাবে আমাদের গ্রহণ করবে তা ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু এই ভেবে মনের অজান্তে পুলকিত বোধ করে মহান সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দেই যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে টেলিভিশনগুলোর বাইরে একমাত্র আমরাই নিয়মিতভাবে সরাসরি উপস্থিত রেখে এই টকশো করে আসছি। এটা নিঃসন্দেহে কুমিল্লাবাসীর জন্য তো গর্বই, একই সাথে দেশের গণমাধ্যমগুলোর জন্যও এটা একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে।
আমি যখন দেশের জনপ্রিয় ফেস দ্য পিপল এ টকশো করি ভার্চুয়ালভাবে , তখন থেকেই আমার মনে এক ধরনের স্বপ্ন জাগতে শুরু করে যে, টেলিভিশনের মতো সরাসরি বসে কুমিল্লায় টকশো করলে কেমন হয়। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার পাদপীঠ এই কুমিল্লা একটি অগ্রসরমান জেলা সেই আদিকাল থেকে। কুমিল্লার মানুষ আজ যা চিন্তা করে দেশের মানুষ তা চিন্তা করে একদিন পর। সুতরাং, কুমিল্লা থেকেই আমি যদি এটা শুরু করতে পারি তাহলে কুমিল্লার ইতিহাসের সাথে আরেকটি গর্বিত অধ্যায় সংযুক্ত হবে। আজ ২৩ জুন সোমবার রাত সোয়া ৮টায় সেই গর্বের,আনন্দের ও গৌরবের ২০০তম পর্ব শুরু হবে ইনশাআল্লাহ।
শুরুটা যেভাবে :
ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য প্রথমবারের মতো সহকর্মী রুবেল মজুমদারের সাথে আলাপ করলাম। জানতে চাইলাম কী কী প্রযুক্তি লাগবে, খরচই বা পড়বে কত। রুবেল আমাকে উৎসাহ দিয়ে যে পরিমাণ অর্থের কথা বলল, তা ছিল আমার জন্য অসাধ্য। কিন্তু আমি তো থেমে যাওয়ার পাত্র নই। এরপর আলাপ করলাম সহকর্মী জাহিদ হাসান নাইমের সাথে। যাকে আমি কুমিল্লার জমিনের ‘প্রাণভোমরা’ বলে থাকি। জাহিদকে বললাম, কষ্ট করে হলেও তোমার হাতের মোবাইলটা দিয়ে হবে কি না। বলল, হবে। তবে স্ট্যান্ড লাগবে, কমপক্ষে ২টি বয়া কিনতে হবে। রুবেল জানাল, স্যার, স্ট্যান্ড ও বয়া আমি দিব। সাথে সাথেই সিদ্ধান্ত নিলাম, আসন্ন কাতার বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২ এর ফাইনাল খেলা সামনে রেখে টকশো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করব। যেই কথা সেই কাজ।
প্রথম টকশো :
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর রোববার বেলা ১১টা। স্টুডিও দৈনিক আমাদের কুমিল্লা অফিসের আমার রুম। বিষয় : কাতার বিশ্বকাপ-২০২২, রোড টু ফাইনাল। অতিথি ছিলেন, কুমিল্লার সাবেক সিভিল সার্জন ডা. মজিবুর রহমান, কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল হাসনাত বাবুল এবং বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক ম্যানেজার বদরুল হুদা জেনু। জীবনে অনেক অনুষ্ঠান উপস্থাপনার অভিজ্ঞতা থাকলেও টকশো উপস্থাপক হিসেবে এটাই ছিল আমার জীবনে প্রথম। তাই নার্ভাস নাইটিন কাজ করছিল প্রতিনিয়ত। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে, প্রথম টকশোটি প্রথম এক ঘণ্টায়ই প্রায় দুই হাজারের উপর মানুষ দেখেছিল যা আমাকে আশ্বস্ত করতে সহায়তা করেছিল।
এরপর শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা :
এরপর নির্দিষ্ট করে প্রতি সোমবার রাত ৮টায় নির্ধারণ করলাম টকশোর সময়। কিন্তু সপ্তাহ হিসেবে সোমবার নির্ধারিত সাপ্তাহিক টকশো ঠিক রাখতে পারলেও একটা সময় প্রতি সপ্তাহে একটা টকশো করব এই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারিনি। কারণ, ঘটনা, সময় এবং দর্শকদের ব্যাপক চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে এমনও গেছে সপ্তাহে ৩/৪টা টকশোও আমাকে করতে হয়েছে। আমাদের টকশো গুলোতে আলোচক হিসেবে সর্বনিম্ন একজন থেকে শুরু করে ১০/১২ জনও ছিল ক্ষেত্রবিশেষ।
সব বিষয়ই ছিল আলোচনায় :
খেলাধুলা দিয়ে শুরু করলেও পরবর্তী পর্যায়ে রাজনীতি, সমাজ, দর্শন, ধর্ম, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, ইতিহাস, বিজ্ঞান, স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এমন কোনো বিষয় নেই যা নিয়ে এই টকশো গুলোতে আমরা আলোচনা করিনি।
আলোচক যারা ছিলেন :
জাতীয় গণমাধ্যম টেলিভিশনে যারা টকশো করে থাকেন এমন আলোচক থেকে শুরু করে একজন হাই স্কুলের ছাত্র পর্যন্ত আমাদের এই টকশোতে অতিথি ছিলেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পর্যায়ের বিষয় ভিত্তিক আলোচনার জন্য আলোচক তো ছিলেনই।
টকশো প্রচার :
অনলাইন নিউজ পোর্টাল কুমিল্লার জমিন ফেসবুক পেজে নিয়মিত, কখনো সখনো ইউটিউব চ্যানেল কুমিল্লার জমিন-এও সরাসরি প্রচার হয় হয়ে থাকে। আর দৈনিক আমাদের কুমিল্লা পত্রিকায় পরদিন প্রথম পাতায় গুরুত্ব দিয়ে সেই আলোচনাগুলো আবার প্রকাশিত হয়।
টকশো স্পন্সরে যারা ছিলেন আছেন :
স্পন্সর শুধু টাকার জন্যই না। এটা একটা প্রতিষ্ঠান কিংবা আয়োজনের মর্যাদাও বৃদ্ধি করে। আলহামদুলিল্লাহ। শুরুতে কয়েকটা পর্ব শেষ করার পরই আমরা স্পন্সর পেয়ে যাই। প্রথমেই আমরা শুরু করি ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ দিয়ে। এরপর মিডল্যান্ড হাসপাতাল, সান মেডিকেল সার্ভিসেস, আল নূর হাসপাতাল, হরমোন সেন্টার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল। বর্তমানে রয়েছেন মিশন হাসপাতাল, শাসনগাছা, কুমিল্লা। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের প্রচারে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। আজকের এই দিনে আমি তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
ক্যামেরার পেছনে যারা :
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর থেকে আজকের ডাবল সেঞ্চুরি পর্ব পর্যন্ত ক্যামেরা পেছনে দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন কুমিল্লার জমিন এর চিফ রিপোর্টার এবং এই টকশোর মূল চালিকা শক্তি জাহিদ হাসান নাইম। গত দুই বছর ধরে জাহিদকে যোগ্য সঙ্গ দিয়ে আসছেন স্টাফ রিপোর্টার হৃদয় হাসান। হৃদয় হাসান বর্তমানে ক্যামেরার পেছনে মূল চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছে। কারণ, টকশো চলাকালীন সময়ে অন্যদের ছুটি থাকলেও তার ছুটি সবসময়ই বাতিলের খাতায় থেকে যায়। এছাড়াও বিভিন্ন সময় টকশো চলাকালীন ক্যামেরার পেছনে থেকে সহায়তা করে আমাকে ঋদ্ধ করে রেখেছেন রুবেল মজুমদার, আবু সুফিয়ান রাসেল, সোহাইবুল ইসলাম সোহাগ ও বিল্লাল হোসেন।
আনন্দ-বেদনার শত স্মৃতি : গত দুইশতম পর্ব করতে গিয়ে কত যে আনন্দ বেদনার স্মৃতি মনের গহিনে জমা হয়ে আছে, তা লিখতে গেলে ছোটখাট একটি গ্রন্থ রচনা হয়ে যাবে। গত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে টকশো’র আলোচনা ক্ষমতাসীন দলের নেতৃবৃন্দদের বিরুদ্ধে যাওয়ার কারণে টকশোর বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়েছিল স্থানীয় এমপির নির্দেশ পেয়ে। কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ের দূর্নীতি ও অনিয়মের টকশো বন্ধ করার জন্য তৎকালীন উপাচার্য ড. মঈন মোটা অঙ্কের উৎকোচ অফার করেছে। সেই উৎকোচ ফেরত দেওয়ার কারণে কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ে দৈনিক আমাদের কুমিল্লা প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয় একই সাথে বন্ধ করে দেয় বিজ্ঞাপনও। তারপরও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করিনি আমরা। সত্য ও সুন্দরকে তুলে ধরেছি দর্শকদের মানসপটে। এছাড়া আরো অনেক আনন্দ বেদনার কাব্য রয়েছে যা সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে বলার ইচ্ছে রইলো।
বর্তমান স্বপ্ন :
আজ ২৩ জুন ২০২৫ সোমবার রাত সোয়া ৮টায় প্রচারিত হবে আমাদের স্বপ্নের ২০০তম পর্ব। এই দুইশতম পর্বকে সামনে রেখে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ‘জীবন কাহিনী’ নামের একটি বিভাগ আমরা আগামী জুলাই মাস থেকে প্রচার শুরু করব। মানুষের জীবনে নানা ঘটনা ও দুর্ঘটনা এবং আনন্দ-বেদনার বিষয় থাকবে এখানে। কিভাবে একজন মানুষ আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে তাই জানাতে চাই দেশের মানুষকে।
টকশো নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা :
টকশোকে আমি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচালনা করতে চাই। রূপ দিতে চাই পেশাদারিত্বের । দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই টকশো একদিন পেশা হিসেবে বেছে নেবেন অনেকে। ১৯৯৪ সালে যখন কুমিল্লায় বিতর্ক আন্দোলন শুরু করেছিলাম, তখন অনেকেই এটাকে নেতিবাচকভাবে দেখে বলেছিল, আবৃত্তি, সংগীত ও নাটক বাদ দিয়ে বিতর্ক কেন বেছে নিলাম। আল্লাহর রহমতে আজ জোর দিয়ে বলতে পারি, শুধু কুমিল্লা নয়, বৃহত্তর কুমিল্লা ও বৃহত্তর নোয়াখালির ৬ জেলার প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রসপেক্টাসে বিতর্ক একটি অপরিহার্য সহশিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে এখন।
টকশো আমার পরে কুমিল্লায়ও অনেকে শুরু করেছিল। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে হয়তো কনটিনিউ করতে পারেনি। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এমন একদিন আসবে এই কুমিল্লাসহ প্রতিটি জেলা শহরেই টকশোর একাধিক হাউজ গড়ে উঠবে। আমি সেই সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখি। ঈশর্^াপরায়নতা নয়, সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে টকশোকে একটি শিল্পের মর্যাদা দেওয়ার জন্য আরো এগিয়ে আসবে অনেক স্বাপ্নিক তরুণ। আমি সেই দিনেরই প্রত্যাশায় রইলাম।