তিতাসে নিম্মমানের বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন অকেজো, জলে গেছে সরকারি ১৮ লাখ টাকা

জুয়েল রানা, তিতাস ।।
প্রকাশ: ৬ মাস আগে

কুমিল্লার তিতাস উপজেলার ৯২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয় বায়োমেট্রিক ডিজিটাল হাজিরা মেশিন। তবে সফটওয়্যার বিহীন নিন্মমানের মেশিন ও ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় গত ৬ বছরেও একদিনও ব্যবহার হয়নি এসব যন্ত্র। এতে জলে গেছে সরকারের লাখ লাখ টাকা, ক্ষুব্ধ হয়েছেন শিক্ষকরা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার মাছিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪০৩ শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন ১৪শিক্ষক। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে বসানো হয় ডিজিটাল হাজিরা মেশিন। কিন্তু আজও তা ব্যবহার হয়নি। একই চিত্র কালাইগোবিন্দপুর, দক্ষিণ আকালিয়া, বাতাকান্দি, গাজীপুর, কড়িকান্দি, জিয়ারকান্দি, মজিদপুর পশ্চিম, জগতপুর পূর্ব, সাতানী, মানিককান্দি ও নারান্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ৯২টি প্রতিষ্ঠানে। ধুলাবালি আর তার ছাড়া কোথাও মেশিন টিনের বেড়ায় ঝুলছে, কোথাও দেওয়ালে। ডিভাইসগুলো বিকল হয়ে এখন পড়ে আছে অযত্ন আর অবহেলায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৯ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে স্থানীয় সাবেক আওয়ামী লীগের এমপি সেলিমা আহমেদ মেরী তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দিয়ে নিয়ম-নীতি কোন তোয়াক্কা না করে নিম্নমানের মেশিন ক্রয় করে তিতাস উপজেলার ৯২টি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হয় বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন। যার ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পরবর্তীতে সাবেক ঐ এমপি বিদ্যালয়ের উন্নয়নের বরাদ্দ থেকে শিক্ষকদের চাপের মুখে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ২০ হাজার টাকা করে নেয়। অথচ স্থাপনের পর কোম্পানি কোনো তদারকি করেনি। উপজেলার গাজীপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহবুব সরকার বলেন, “তৎকালীন এমপি সেলিমা আহমেদ মেরী ক্ষমতার অপব্যবহার করে আমাদের প্রধান শিক্ষকদের জিম্মি করে জোরপূর্বক প্রতিটি স্কুলে তার লোকজন দিয়ে এই মেশিন বসাতে বাধ্য করেছিলেন। প্রধান শিক্ষকরা তখন আপত্তি জানাতে গেলে সে তার লোকজন দিয়ে হুমকি-দমকি দেওয়াতো। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই মেশিন বসাতে হয়েছে। যেখানে মেশিনের প্রকৃত দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা, সেখানে আমাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ২০ হাজার টাকা” জিয়ারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আমরা শুরুতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যাচাই-বাছাই করে ভালো মানের মেশিন ও সার্ভার ক্রয় করবো, যাতে উপজেলা শিক্ষা অফিসার, ইউএনও এবং উপজেলা চেয়ারম্যান শিক্ষকদের উপস্থিতি সহজে মনিটর করতে পারেন। কিন্তু আমাদের সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। কোনো ধরনের আলোচনা বা অনুমতি ছাড়াই হঠাৎ করে মেশিনগুলো স্থাপন করে দেওয়া হয়েছে। কথা ছিল উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অফিসে সার্ভার স্থাপন করে ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে মনিটরিং করা হবে। কিন্তু বাস্তবে তা করা হয়নি। উল্টো আমাদের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। এখন সবগুলো মেশিনই অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক জানান, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ও সার্ভার না থাকায় স্থাপনের পর থেকেই মেশিনগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে। তারা আরও অভিযোগ করে বলেন, ২০১৯ সালে মেরী এমপি স্লিপ ফান্ডের টাকা থেকে প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে জোরপূর্বক ২০ হাজার টাকা করে নিয়েছিলেন। শিক্ষকদের দাবি, সরকারি অর্থ লুটপাটের উদ্দেশ্যেই এ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। তারা দ্রুত প্রদেয় অর্থ ফেরত দেওয়া ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ খাজা মাঈনউদ্দিন বলেন, “আমি নতুন এসেছি। তবে যতটুকু জেনেছি, সার্ভার না থাকা এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির যথাযথ তদারকি না থাকার কারণে মেশিনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে।”