নানা নাটকীয়তা, বিতর্কের পর শেষ হলো কুমিল্লার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলা ‘কুমিল্লা কুটিরশিল্প ও বাণিজ্যমেলা’র। প্রায় দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই মেলাকে ঘিরে যেমন ছিলো মানুষের উন্মাদনা, তেমনি ছিলো সমালোচনার ঝড়। শেষ পর্যন্ত তোপের মুখে সোমবার (৩০ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা সমাপ্তির ঘোষণা দেয় আয়োজক কমিটি। আয়োজকসূত্রে জানায়, মেলার সূচনা হয় গত ২৪ এপ্রিল কুমিল্লা নগরীর জাঙ্গালিয়া ডিওএইচ চত্বরে। শুরু থেকেই মেলাটি ঘিরে ছিলো ব্যাপক প্রস্তুতি ও আকর্ষণ।
আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী মেলার নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ১৪ জুন পর্যন্ত। কিন্তু দর্শনার্থীদের ব্যাপক সাড়ায় আয়োজকরা সময় বাড়িয়ে মেলাকে চালিয়ে যান আরও ১৫ দিন। এভাবে টানা ৬৮ দিন চালানোর পর অবশেষে সমাপ্তি টানা হয় এই বাণিজ্য মেলার।
তবে, এই মেলার সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত দিক ছিল ২০ টাকার লটারি টিকিট। প্রতিদিনের আকর্ষণ হিসেবে ৬১ টি করে পুরস্কার ঘোষণা করা হতো, যা সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ধীরে ধীরে পুরষ্কারের সংখ্যা বাড়তে থাকে যা মানুষের আরো আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছায়। সকাল থেকেই টিকিট কাটার জন্য দীর্ঘ লাইন, ভিড়, সেলফি তোলার হিড়িক—সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছিল মেলা প্রাঙ্গণে। শুধু কুমিল্লা নয়, আশেপাশের জেলা থেকেও মানুষ ছুটে এসেছিলেন ভাগ্য যাচাই করতে। কেউ এসেছিলেন সস্তায় পণ্য কিনতে, কেউ এসেছিলেন শিশুদের নিয়ে আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠতে। কেউবা লটারির টিকেটে নিজের ভাগ্য খুলতে।
তবে মেলার একমাস পেরোতেই শুরু হয় বিতর্ক। অনেকেই এই লটারি টিকিটকে প্রকাশ্য জুয়া আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। নাগরিক সমাজ, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল মেলা বন্ধের দাবি জানাতে শুরু করেন। কেউ কেউ একে ‘দুঃস্থ মানুষের অর্থ লুটের উৎসব’ বলেও অভিহিত করেন। বিষয়টি রাজনৈতিক মোড় নেয় তখন, যখন কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপু তার ফেসবুক পেজে একাধিক পোস্ট দিয়ে মেলার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ দাবি করেন। এরই ধারাবাহিকতায় কুমিল্লার বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন মেলা বন্ধের দাবিতে স্মারকলিপি জমা দেয়, মানববন্ধন করে এবং সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে।
মেলার শেষ দিনেও নাটকীয়তা ছিলো চরমে। ২৯ জুন রাতে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে—মেলার সময়সীমা ১২ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কেউ বলছিলেন ৪ জুলাই পর্যন্ত চলবে। আবার কেউ কেউ বলছিলেন—মেলা বন্ধের কোনো লিখিত ঘোষণা নেই, শুধুই গুজব।
এই বিভ্রান্তির মাঝেই ৩০ জুন বিকেলে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম ও মহানগর বিএনপির সভাপতি উদবাতুল বারী আবুসহ বিএনপি’র বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ মেলা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। এরপর এক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে মেলার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির ঘোষণা দেন মেলা আয়োজকরা। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপি নেতারা। তারা জানান, টিকিটের পুরস্কারের লোভে প্রতিদিন হাজারো সাধারণ মানুষ অর্থ হারাচ্ছেন, অনেক খেটে খাওয়া মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে মেলাকে ঘিরে কুমিল্লা-লাকসাম সড়কে প্রতিনিয়ত যানজট লেগে থাকায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। এসব কারণেই তারা মেলা বন্ধে সক্রিয় ভূমিকা নেন।
এদিকে, মেলায় ছিল প্রায় ৪০০ স্টল। দেশি-বিদেশি পোশাক, ইলেকট্রনিকস, হস্তশিল্প, কসমেটিকস থেকে শুরু করে খাবারের নানা আইটেম স্থান পেয়েছিল। ছিল সার্কাস, নাগরদোলা, শিশুদের জন্য খেলার আয়োজন। অর্থনৈতিক কার্যক্রমের দিক থেকে এটি সফল হলেও সামাজিক ও নৈতিক বিতর্কের মুখে পড়তে হয়েছে আয়োজকদের। অবশেষে নাগরিক চাপে, সামাজিক প্রতিরোধে এবং রাজনৈতিক উদ্যোগে থেমে গেল কুমিল্লার আলোচিত বাণিজ্যমেলার যাত্রা। শেষ হলো এক দীর্ঘ বিতর্কের, এক ব্যতিক্রমী উৎসবের, যা হয়তো স্মরণীয় হয়ে থাকবে কুমিল্লাবাসীর কাছে।