সরকারের সূত্রগুলো জানিয়েছে, জামায়াতসহ কয়েকটি দল নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি করলেও উপদেষ্টা পরিষদ একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদে পিআর পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ এবং নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধান থাকতে পারে আদেশে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ মেনে আদেশের ওপর গণভোট হবে। উচ্চকক্ষে পিআর, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের বিষয়ে পৃথক প্রশ্ন থাকতে পারে। ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কারের মধ্যে যে ৩০টিতে বিএনপি ও জামায়াতসহ অধিকাংশ দলের ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলো নিয়েও প্রশ্ন থাকতে পারে। ভোটাররা হ্যাঁ-না ভোটে মতামত জানাবেন।
এই সূত্রটি জানায়, গণভোটে এভাবেও প্রশ্ন করা হতে পারে, ‘আপনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, সনদে বর্ণিত উপায়ে পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ সমর্থন করেন কিনা?’
গণভোটে একাধিক প্রশ্ন রাখার সম্ভাবনার বিষয়ে বিএনপি মন্তব্য করেনি। তবে জামায়াত জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানাবে। তবে দলটির একাধিক নেতা সমকালকে বলেছেন, গণভোট হতে হবে একটি প্রশ্নে, একাধিক প্রশ্নে নয়।
সদ্য বিলুপ্ত ঐকমত্য কমিশনের একাধিক সদস্য সমকালকে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোকে খুশি করতে গিয়ে সমস্যা তৈরি করছে। গণভোট একটি প্রশ্নে হওয়া উচিত।
শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত হতে পারে তা নিয়ে কোনো উপদেষ্টা নিশ্চিত কিছু বলেননি। তারা এ বিষয়ে নাম প্রকাশ করে কথা বলতেও রাজি হননি। তবে উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সমকালকে বলেন, যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেগুলোর কোনোটি চূড়ান্ত নয়। উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে চূড়ান্ত করার পর অনুমোদন করা হবে। এরপর প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে ভাষণে তা জানাবেন, অর্থাৎ বৃহস্পতিবারের মধ্যেই সংস্কার, গণভোটের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
আজই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা
গত ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদে সংস্কারের ৮৪টি প্রস্তাব রয়েছে। ১৫টি প্রস্তাবে বিএনপির, সাতটিতে জামায়াতের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। তবে মূল বিরোধ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন পদ্ধতি, পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ, সরকারি কর্ম কমিশন, ন্যায়পাল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুদকের নিয়োগ নিয়ে। এ তিন বিষয়ে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর ভিন্নমত রয়েছে।
বিএনপি পিআর নয়, আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ চায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইলেও সনদে বর্ণিত উপায়ে রাজি নয়। সংসদীয় দল এবং বিচার বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত বাছাই কমিটিতে র্যাঙ্ক চয়েজ ভোটের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনেও রাজি নয়। দলটি বলছে, আগামী সংসদে বাছাই পদ্ধতি ঠিক করা হবে। কমিটির মাধ্যমে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগেও নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বিএনপি। সনদ স্বাক্ষরের আগের দিন বিএনপির দাবিতে সনদে নোট অব ডিসেন্ট যুক্ত করা হয়। বিএনপি আগেই জানিয়েছে, নির্বাচনে জয়ী হলে সনদ নয়, নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী তারা সংস্কার করবে।
নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে অনড় জামায়াত গণভোটে নোট অব ডিসেন্ট রাখার বিরোধী। এনসিপিরও একই অবস্থান।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, আজকের বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আদেশ বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই। তবে অনির্ধারিত আলোচনায় বা বৈঠকের পরে জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কারণ, এর আগে উপদেষ্টা পরিষদের পরপর তিনটি বৈঠকে আলোচ্যসূচিতে যুক্ত না করেই এ বিষয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে তিন-চার দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাবে সরকার। তিনি বলেন, ‘সব দলের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করেছি। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে ভালো কিছু হবে। আশা করি, সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত সব দল মেনে নেবে।’
গণভোটের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই গত ৩০ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষ হয়। এরপর ৩ নভেম্বর গণভোটের দিন, জুলাই জাতীয় সনদ ও আরপিওসহ রাজনৈতিক দলগুলোর সমসাময়িক বিতর্ক নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি সভা হয়। ওই বৈঠক থেকে আলোচনা করে এক সপ্তাহের মধ্যে সমঝোতার আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু দলগুলো আলোচনায় বসতে পারেনি, সমঝোতা হয়নি।
কী আদেশ হতে পারে, কে জারি করবে
গত ২৮ অক্টোবর কমিশন সুপারিশে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫-এর যে খসড়া দিয়েছে, তাতে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত ৪৮ সংস্কার প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট রাখা হয়নি। বিএনপি একে প্রতারণা বলছে।
কমিশনের তৈরি আদেশের প্রথম খসড়ায় বলা হয়েছে, ২৭০ দিনের সংস্কারের বাধ্যবাধকতার সুপারিশ থাকলেও একাধিক উপদেষ্টা সমকালকে জানিয়েছেন, আদেশে এ রকম কিছু থাকবে না। আগামী সংসদের সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’কে বাধ্য করা যাবে না।
জামায়াত এবং এনসিপির দাবি, আওয়ামী লীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতি নয়, গণঅভ্যুত্থানে গঠিত সরকারকে সাংবিধানিক আদেশ জারি করতে হবে। বিএনপি সাংবিধানিক আদেশ জারির বিপক্ষে। দলটি বলছে, সংবিধান অনুযায়ী আদেশ জারির এখতিয়ার নেই রাষ্ট্রপতি বা সরকারের। সরকার চাইলে প্রজ্ঞাপন বা অধ্যাদেশ জারি করতে পারে।
একাধিক উপদেষ্টা সমকালকে জানিয়েছেন, আদেশই জারি হবে। তা রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে জারি করা হতে পারে।
গতকাল জামায়াতসহ আট দল হুঁশিয়ার করেছে, নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের আদেশ জারি করা না হলে ১৬ নভেম্বর থেকে যমুনার সামনে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ গতকাল বুধবার সাংবাদিকদের বলেছেন, নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া গণভোট আয়োজনে ঐকমত্য কমিশনে আলোচনা হয়নি। নির্বাচন ও গণভোট এক দিনে হওয়া উচিত, যাতে ছোট্ট একটি ব্যালটে গণসম্মতি নেওয়া যায়।